
এইচ এম দিদার: রাজধানী জুড়ে এখন শুধু পানির জন্য হাহাকার। গরম যতই বাড়ছে তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পানি সংকট। নগরীর প্রায় অর্ধেক এলাকায় পানি মিলছে না। অন্যত্র যেটুকু মিলছে তাও নোংরা ও দুর্গন্ধময়। পানির দাবিতে ক্ষোভে ফুঁসছে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার বাসিন্দারা। উপরন্তু সর্বশেষ সরকার নির্ধারিত নিত্যাকার এবং রুটিন মাফিক লোডশেডিংয়ের ফলে জনজীবনে অধিকতর ভোগান্তির আশংকা ঘনীভূত হচ্ছে।
প্রতিনিয়ত বিভিন্ন স্থানে পানির জন্য হাঁড়ি-পাতিলসহ অসংখ্য নারী-শিশুর দীর্ঘ লাইন দেখে রাজধানীতে পানি সংকট যে কতটা ভয়াবহ তা অনুধাবন করা যায় । তবে লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও এক কলস পানি পাওয়া দায় হয়ে পড়ছে। ওয়াসা কর্তৃপক্ষ জানান, গরমের সময় অন্যান্য সময়ের তুলনায় এমনিতেই পানির চাহিদা বেশি থাকে। এরসঙ্গে যোগ হয়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং আর পানির স্তর নেমে যাওয়ার সমস্যা। এবার গরমের আগেই ওয়াসা বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও তা এখন খুব একটা কাজে আসছে না।
ওয়াসা জানিয়েছে, নগরীতে প্রতিদিন ২২০ কোটি লিটারেরও বেশি পানির চাহিদা রয়েছে। কিন্তু ওয়াসার পানি সরবরাহ ক্ষমতা সর্বোচ্চ ১৯০ কোটি লিটার। তবে শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর নেমে যাওয়ায় এবং বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে স্বাভাবিক সরবরাহও করতে পারছে না ওয়াসা। ফলে পানির সংকট বৃদ্ধি পাচ্ছে।
রাজধানীর নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত এলাকা হিসেবে পরিচিত পূর্ব রামপুরা, শান্তিনগর, নয়া পল্টন, ফকিরাপুল, কদমতলা, আহমেদবাগ, রাজারবাগ, মাদারটেক, বাসাবো, কুসুমবাগ, গোরান, মুগদা, মানিকনগর, গোপীবাগ, জিয়ামাঠ, অভয়দাস লেন, কেএম দাস লেন, স্বামীবাগ, ওয়ারী, মৈশুণ্ডি, বনগ্রাম, নবাবপুর, ধোলাইখাল, মিটফোর্ড, বাবুবাজার, সিক্কাটুলী, ইসলামপুর, বংশাল, আরমানিটোলা, লক্ষীবাজার, বাংলা বাজার, শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে পানির তীব্র সংকট। রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলোতেও পানিসংকট জনগণের সহ্য সীমার বাইরে চলে গেছে।
ঢাকা ওয়াসার পানি সরবরাহ কার্যক্রমে সহায়তার জন্যসরকার ইতোমধ্যে সেনা মোতায়েন করেছে। সেনা সদস্যরা পানি সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি পাম্প স্টেশন ও শোধনাগারগুলো দেখাশুনা করবেন। তারা ওয়াসার বিভিন্ন জোন অফিসে সার্বক্ষণিক অবস্থান করবেন। ওয়াসা সুত্রে বলা হয় সেনাবাহিনী মূলত পানি সরবরাহের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং নিরাত্তার বিষয়টি দেখবে।
নদীর পানি মাত্রাতিরিক্ত দূষণের ফলে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন নগরীতে পানি সংকটের পাশাপাশি সায়দাবাদ প্লান্টের পানি ব্যবহারকারীরা পাচ্ছেন দুর্গন্ধযুক্ত পানি। একদিকে পানির সংকট অন্যদিকে দুর্গন্ধময় পানি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন এসব এলাকার বাসিন্দারা। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ রাজধানীর অনেক এলাকায় পুরোনো লাইন নষ্ট এবং লিকেজ হওয়ার কারণে পানির সাথে বিভিন্ন পদার্থ মিশে যাচ্ছে। এমনকি পয়নিষ্কাশন ড্রেনেজের সাথে ওয়াসার পাইপের মিশ্রণ রয়েছে বলেও রাজধানীবাসীর অনেকদিনের অভিযোগ। দুর্গন্ধ যুক্ত এসব পানি খাওয়া তো দূরের থাক সাংসারিক অন্যান্য কাজেও ব্যবহার করা যাচ্ছে না বলে জানান সাধারণ মানুষ। দুর্গন্ধযুক্ত এই পানি ফুটিয়েও পান করা যায় না।
ওয়াসা কর্তৃপক্ষও জনগণের এ অভিযোগ সম্পুর্ণ অস্বীকার করেনি। তারা জানান পানির পুরোনো লাইন সংস্কারে ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট এর আওতায় রাজধানীর আড়াই হাজার কিলোমিটার পুরোনো পাইপ বদলানো হবে। এছাড়া এ প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার কিলোমিটার নতুন পানির পাইপ বসানো হবে। অন্যদিকে ওয়াসা জানিয়েছে, সায়দাবাদ প্লান্টের পানিতে দুর্গন্ধের অন্যতম কারণ শীতলক্ষ্যার পানির স্তর নীচে নেমে যাওয়া এবং পানিতে অতিরিক্ত দূষণ। তবে এ পানি ক্ষতিকর নয় বলে ওয়াসা জানিয়েছে।
আর ক্রমাগত লোডশেডিংয়ের ফলে পানি উৎপাদন অনেক কমে যাচ্ছে। ওয়াসা সুত্র জানায় ১ ঘণ্টা লোডশেডিং হলে ৮৩ হাজার লিটার পানি কম উৎপাদন হয়। এমনিতেই রাজধানীর দৈনন্দিন পানির চাহিদা মেটাতে ওয়াসা ব্যর্থ হচ্ছে, উপরন্তু লোডশেডিংয়ের ফলে রাজধানীবাসীর জীবনে অধিকতর ভোগান্তির আশংকা ক্রমশ ঘনীভূত হয়ে উঠছে। |