ঢাকার চারপাশের নদীদূষণ রোধে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তর এবং ৩০ জুনের মধ্যে সব দূষণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানে বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন করতে হবে। তবে দূষণকারী শিল্পে বর্জ্য শোধনাগার স্থাপনের বিষয়টি সারা দেশের জন্য প্রযোজ্য হবে। নদী রক্ষায় এরকম ২৭ টি সুপারিশ অনুমোদন করেছে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন জাতীয় পরিবেশ কমিটি। ১২ বছরেরও বেশি সময় পর গত ১৬ই সেপ্টেম্বর বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে তাঁর কার্যালয়ে প্রায় ৪ ঘন্টাব্যাপী জাতীয় পরিবেশ কমিটির এই সভা হয়। সভায় প্রায় সব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-সচিব এবং সংশ্লিষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব মিহির কান্তি মজমুদার গণমাধ্যমকে বলেন, অনতিবিলম্বে এসব সুপারিশ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের কাজ শুরু করা হবে। উল্লেখ্য প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করে ১৯৯২ সালে জাতীয় পরিবেশ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রথম সভা হয় ১৯৯৩ সালের ২৭ জানুয়ারি। ১৯৯৭ সালের ১৫ই এপ্রিল কমিটি পুনর্গঠন করা হয় এবং দ্বিতীয় সভা হয় ঐ বছরের মে মাসে। চলতি বছরের ১৬ই সেপ্টেম্বর এই কমিটির তৃতীয় সভা হলো।

নদীদূষণ রোধে সুপারিশ: ঢাকার চারপাশের নদীদূষণ রোধে যে সুপারিশগুলো করা হয়েছে, তার মধ্যে ২২০ কিলোমিটার দীর্ঘ নদী তীরবর্তী কঠিন বর্জ্য অপসারণ ও নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা, হাট-বাজারসহ নদী তীরবর্তী এলাকায় ময়লা ফেলার পাত্রের (ডাস্টবিন) সংখ্যা বাড়ানো অন্যতম। এগুলো বাস্তবায়ন করবে ঢাকা সিটি করপোরেশন। মহানগরে শতভাগ পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, পাগলার পয়োশোধনাগারটির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য বিদ্যমান পয়োপ্রণালীগুলোর সংস্কার ও উন্নয়ন, নগরের বিভিন্ন স্থানে আরো পয়োশোধনাগার স্থাপন করার সিদ্ধান্ত হয় উক্ত সভায়। ঢাকা ওয়াসা এ সিদ্ধান্ত গুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে। নৌযানের বর্জ্য যানের ভিতরে শোধন করা বা বন্দরে শোধনের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা রাখা, হাইকোর্টের আদেশ অনুযায়ী আগামী বছরের ৩০ জুনের মধ্যে সব শিল্প প্রতিষ্ঠানকে শোধনাগার স্থাপনে বাধ্য করা, হাইকোর্টের আদেশ অনুযায়ী আগামী বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হাজারীবাগের ট্যানারি সাভারে স্থানান্তর, যেসব শিল্পে শোধনাগার বিদ্যমান সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়মিত পরীক্ষা করা, দূষণকারী শিল্পের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে আইনগত ব্যাবস্থা নেয়া, জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত কারখানা গুলো (ডক ইয়ার্ড) বুড়িগঙ্গার আরও ভাটিতে স্থানান্তর, কামরাঙ্গীর চরের কাছে মরা নদীতে ড্রেজিং, ড্রেজিং ও খননের মাধ্যমে নদীর তলদেশের বর্জ্য অপসারণ, বুড়িগঙ্গা ও সংযুক্ত নদীগুলোর সীমানা সিএস রেকর্ড অনুযায়ী চিহ্নিত করা। অবৈধ দখল উচ্ছেদের পর নদী তীরের ২২০ কিলোমিটার এলাকায় স্থায়ী রাস্তা নির্মাণ, উন্নয়ন সহোযোগীদের সহায়তায় ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির আওতায় টঙ্গী, সাভার, গাজীপুর, তেজগাঁও, ঘোড়াশাল, তারাব, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় কেন্দ্রীয় শোধনাগার স্থাপনের সুপারিশ অনুমোদন করেছে সভা। অর্থ মন্ত্রণালয়, শিল্প, বানিজ্য ও নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, পরিবেশ অধিদপ্তর, এফবিসিসিআই, বেপজা, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমইএ, ট্যানার্স এসোসিয়েশনসহ সংশ্লিষ্ঠ সংস্থা এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে। সংশ্লিষ্ঠ সরকারি ও বেসরকারি সূত্রগুলো জানায়, এসব সুপারিশের মধ্যে নদীর তলদেশের বর্জ্য অপসারণ , নদী তীরের ২২০ কিলোমিটার এলাকায় স্থায়ী রাস্তা নির্মাণ করা সহ ১০ টি সুপারিশ আগেও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধীন সংস্থা এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্নয়ে গঠিত টাস্কফোর্স ইতোপূর্বে এসব সুপারিশ করলেও এগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে পয়োব্যবস্থা আছে অর্ধেকেরও কম এলাকায়। এ অবস্থায় সমগ্র নগরে পয়োব্যবস্থা গড়ে তুলতে ঢাকা ওয়াসার যে পরিমাণ অর্থ ও সময়ের প্রয়োজন হবে তা বিবেচনায় এই সুপারিশকে প্রায় অবাস্তবায়নযোগ্যই বলা যায়।
এদিকে ট্যানারি শিল্প সাভারে স্থানান্তরের বিষয়টি ঝুলে আছে দীর্ঘ দুই দশক ধরে। বিগত জোট সরকারের আমলে এই কাজে বেশ কিছু অগ্রগতি হলেও কেন্দ্রীয় শোধনাগার স্থাপনের বিষয়টি দূর্নীতির দায়ে স্থবির হয়ে পড়ে। তৎকালীন শিল্প সচিবকে এজন্য দায়ী করা হয়েছিল; যদিও বিষয়টির এখনো ফয়সালা হয়নি। পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজের ব্যাক্তিবৃন্দ জানায় ২০১০ সালের ৩০ জুনের মধ্যে সব দূষণকারী শিল্পে শোধনাগার স্থাপনও একটি উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ যদিও সরকার এ ব্যাপারে আন্তরিক। তবে সময়, অর্থ ও পারিপার্শ্বিকতার কারণে কতটা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে।
ই-মেইল: news_amarhealth@yahoo.com
সূত্র: http://www.prothom-alo.com/newsite1/section/date/2009-09-17/category/2 |