জলবায়ু হুমকি মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রীর হিমালয় পরিষদ গঠনের প্রস্তাব আইলা দুর্গতদের সাহায্যের আহ্বান জাতিসংঘের মাত্রাতিরিক্ত নদী দূষণের শিকার ঢাকার অন্তত চারটি নদী

শেষ মুহুর্তে এসে সমঝোতা ও চুক্তির সম্ভাবনা

এইচ এম দিদার ( বি বি সি আবলম্বনে)

জাতিসংঘ কোপেনহেগেন জলবায়ু সম্মেলনের শেষাংশে এসে অচলাবস্থা এবং হতাশা কাটিয়ে একটি সমঝোতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার রাতভর আলোচনায় চীন ও ভারতের অনমনীয়তার জন্য চুক্তির বিষয়টি পুরোপুরি অনিশ্চয়তার পথে গেলেও শুক্রবার পরিস্খিতি পাল্টে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার উপস্থিতিতে শুক্রবার সকালে জাতিসংঘের ২০ সদস্যের কোর গ্রুপের আলোচনা শুরুর পর থেকেই সন্মেলনের মোড় ঘুরে দাড়িয়েছে।
দুই সপ্তাহ ধরে দরকষাকষির পর শেষ মুহূর্তে এসে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের আলোচনায় অচলাবস্থা দেখা দিলে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন সম্মেলনের সভাপতি ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে বিশেষ উদ্যোগ নেন।পুর্ব ঘোষিত সন্মেলন সময় অতিক্রম হয়ে যাওয়ার পর ও কোন ধরণের সমঝোতায় না আসায় জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন জলবায়ু সম্মেলন আরও একদিন বাড়িয়েছেন। আজ বর্ধিত দিনের সম্মেলনে সব রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানকে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। অবশেষে সকল অনিশ্চয়তা কাটিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছার জন্য ১১৬টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের শেষ দিনে প্লেনারি হলে মিলিত হন।

অচলাবস্থা কাটিয়ে সম্মেলন থেকে একটি ফল বের করে নেয়ার জন্যই প্রথমে আটটি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়ে উদ্যোগ শুরু করা হয়। ওই উদ্যোগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকেও রাখা হয়। শুরু হয় বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দফায় দফায় অনানুষ্ঠানিক আলোচনা।দায়িত্বপ্রাপ্তির পরপরই সকালে ওই আট দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা আলোচনায় মিলিত । ওই সভায় একটি খসড়া কার্যপত্র (টেক্সট) প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ওই সিদ্ধান্তর আলোকে আটটি দেশের পরিবেশমন্ত্রীরা সম্মেলনের খসড়া প্রণয়নের কাজে লেগে পড়েন। দুপুরে ওই আট দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা মধ্যাহ্নভোজ সভায় মিলিত হন। ওই সভায় পরিবেশমন্ত্রীরা তাদের প্রণীত খসড়াটি সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সভায় পেশ করেন। তারা এই খসড়ার ওপর আলোচনা করে কিছু সংশোধন আনেন। কর্মকর্তারা বলছেন, খসড়া টেক্সটের ভিত্তিতে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে কথা বলার জন্য আট দেশের মধ্য থেকে তিন দেশের প্রধানমন্ত্রীর সমন্বয়ে একটি কোর গ্রুপ গঠন করা হয়। ওই গ্রুপের সদস্যরা হলেন- বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী কেভিন রাড।

এই কোর গ্রুপকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ব্রাজিল, ভারত, চীন, জি-৭৭ গ্রুপ, এলডিসি ও ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর গ্রুপের সঙ্গে খসড়া টেক্সট নিয়ে আলোচনা করার দায়িত্ব দেয়া হয়। এই কোর গ্রুপ দুপুরের পর ওই দেশ ও গ্রুপগুলোর সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনায় বসে। আলোচনার ফল নিয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় জাতিসংঘ মহাসচিব ও ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী পুনরায় আট দেশের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয় কোর গ্রুপের সংখ্যা বৃদ্ধির। ২০টি দেশকে নিয়ে অপেক্ষাকৃত বড় আকারের একটি কোর গ্রুপ গঠন করা হয়। ওই কোর গ্রুপ রাত সোয়া ১টায় ফের আলোচনায় বসে। ওই বৈঠক চলে রাত ৩টা পর্যন্ত। ওই বৈঠকে চীন, ভারত ও ব্রাজিলের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা যোগ দেন। তাতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনও অংশগ্রহণ করেন। ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয় খসড়া টেক্সট আরও সংশোধন করে সকালে তা নিয়ে পুনরায় বৈঠক হবে। তারই আলোকে পরিবেশমন্ত্রীরা রাতভর কাজ করে সম্মেলনের জন্য নতুন করে খসড়া টেক্সট প্রণয়ন করেন। ২০ সদস্যের কোর কমিটি চীন, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও মেক্সিকোর সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দেশ গুলোর নেতৃবৃন্দ আলোচনা করেছেন। আলোচনায় কোন দেশ কত শতাংশ কার্বন নির্গমন করবে এবং কত পরিমাণ অর্থ তহবিলে জমা দেবে তা নিয়েই চুড়ান্ত পর্যায়ের দরকষাকষি হচ্ছে। তবে আলোচনা যেদিকে এগুচ্ছে তাতে এক বা একাধিক আইনগত চুক্তি স্বাক্ষর এক বছর পিছিয়ে যেতে পারে। ২০১০ সালে অনুষ্ঠিতব্য মেক্সিকো বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে ওই চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তাব করা হচ্ছে।

এছাডা ওই টেক্সট নিয়ে শুক্রবার সকাল সাড়ে আটটা থেকে পুনরায় মিটিং শুরু হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কোপেনহেগেন এসেই সকালে ২০ দেশের ওই কোর গ্রুপের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে যোগ দেন। তিনি বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন থেকে একটি ফলপ্রসূ সিদ্ধান্ত বের করে নেয়ার জন্য হস্তক্ষেপ করেন। তার হস্তক্ষেপেই অনিশ্চয়তা কাটিয়ে শুক্রবার শেষদিনে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন কোপেনহেগেন চুক্তির পথে এগুচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কার্বন নির্গমন হ্রাস এবং অর্থায়ন কিভাবে হবে তা নিশ্চিত করা না হলে বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো সম্মেলন থেকে কি নিয়ে ফিরে যাবে। কার্বন নির্গমন হ্রাস ও অর্থ ব্যবস্থাপনার ওপর কোন পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা না থাকলে করদাতাদের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। ওই বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশ ও দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর কার্বন নির্গমন হতে হবে স্বেচ্ছামূলক এবং তা কাটিয়ে উঠতে প্রযুক্তি সহায়তার বিষয়টি খসড়া টেক্সটে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করেন। তার প্রস্তাবের ব্যাপারে কোন দেশ আপত্তি জানায়নি। একই সঙ্গে তিনি জলবায়ু উদ্ভাস্তু  বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন এবং তাদের পুনর্বাসনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের প্রস্তাব করেন ।  তার এ প্রস্তাবের ব্যাপারে কেউ আপত্তি করেনি। আলোচনার এই পর্যায়ে চীন ও ভারত বৃহস্পতিবার রাতে ২০ দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের কোর গ্রুপের প্রস্তাবের ব্যাপারে আপত্তি জানালেও, সকালে তারা মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের পর অনড় অবস্থান থেকে সরে আসে।