জলবায়ু হুমকি মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রীর হিমালয় পরিষদ গঠনের প্রস্তাব আইলা দুর্গতদের সাহায্যের আহ্বান জাতিসংঘের মাত্রাতিরিক্ত নদী দূষণের শিকার ঢাকার অন্তত চারটি নদী

বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণ

পরিবেশ দূষণ বাংলাদেশের প্রধান একটি সমস্যা। প্রতিনিয়ত এ সমস্যা বেড়েই চলেছে। এ ব্যপারে পরিবেশবিদরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাছাড়া পরিবেশ দূষণের কারণে বিভিন্ন ধরণের স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
নিম্নে বিভিন্ন ধরনের দূষণ ও স্বাস্থ্যের বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :
বায়ু দূষণ: বাংলাদেশের বায়ু দূষণমুক্ত নয়। এই সমস্যা বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে বায়ু দূষণে পিছনে প্রধানত দুইটি কারণ রয়েছে। প্রথমত: কলকারখানার ধোঁয়া এবং দ্বিতীয়ত: যানবাহনের ধোঁয়া। সার কারখানা, চিনি, কাগজ, পাট এবং টেক্সটাইল মিল, টেনারীজ, গার্মেন্টস, কেমিক্যাল ও ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে প্রচুর পরিমাণ ধোঁয়া নির্গত হয়। বাংলাদেশে কতিপয় শিল্প যেমন হাজারীবাগের ট্যানারী, এমিট হাইড্রোজেন সালফাইড, এ্যামোনিয়া প্রভৃতি কেমিক্যাল থেকে সৃষ্ট বিষক্রিয়া থেকে মাথা যন্ত্রণাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়।
দেশে ক্রবর্ধমান নগরায়ণ, অধিকহারে যানবাহন বৃদ্ধি বায়ু দূষণে ভূমিকা রাখছে। বেবি ট্যাক্সি, টেম্পু, মটর সাইকেল, ট্রলি প্রভৃতি টু-স্ট্রোক যাননবাহন থেকে অধিক ধোঁয়া নির্গত হয়। এছাড়া ঢাকা শহরের ৯০% যানবাহন ত্রুটিপূর্ণ যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। সম্প্রতি সরকার ২০ বছরের অধিক পুরাতন যানবাহন নিষিদ্ধের সিদ্ধন্ত নিয়েছে।

বায়ুতে বিভিন্ন গ্যাসের স্বাভাবিক উপাদান হচ্ছে:

নাইট্রোজেন

৭৮.০৮৪%

অক্সিজেন

২০.৯৪৬%

আর্গন

০.৯৩৪০%

কার্বন-ডাই-অক্সাইড

০.০৩৮৩%

নিয়ন

০.০০১৮১৮%

হিলিয়াম

০.০০০৫২৪%

মিথেন

০.০০০১৭৪৫%

ক্রিপ্টন

০.০০০১১৪%

হাইড্রোজেন

০.০০০০৫৫%

নাইট্রাস অক্সাইড

০.০০০০৩

বায়ু দূষণের স্বাস্থ্য সমস্যা : বায়ু দূষণ আমাদের স্বাস্থ্যের প্রতি স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী দুইভাবে আক্রান্ত করতে পারে। কেউ বায়ু দূষণ থেকে মুক্ত নয় তবে শিশু ও বৃদ্ধরা বেশি ক্ষতির শিকার। বায়ু দূষণের কারণে মানুষের এ্যাজমা, হার্ট ও ফুসফুসে সমস্যা দেখা দেয়।

 

 

 

 

 

 

স্বল্প মেয়াদে সমস্যা :

বায়ু দূষণের কারণে স্বল্প মেয়াদে চোখ ও নাকে ব্যাথা হয়। এছাড়া ব্রন্কাইটিস ও নিউমোনিয়ার মতো মারাত্নক রোগ হয়।
দীর্ঘ মেয়াদে সমস্যা : বায়ু দূষ ণের কারণে দীর্ঘ মেয়াদে শ্বাসকষ্ট, ফুসফুস ক্যান্সার, হার্টের সমস্যা এমনকি ব্রেইন, নার্ভ, লিভার ও কিডনী নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

পানি দূষণ: পানির অপর নাম জীবন। মানুষের শরীরের ৬৫% পানি। পৃথিবীর ৭১% পানি। কিন্তু প্রতিনিয়ত পানি  দূষণের কারণে খাবার পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। দূষিত পানি পান করার ফলে বিভিন্ন জটিল রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটছে।

পানি দূষনের কারণ: বাংলাদেশে শহর ও গ্রামাঞ্চলে বিভিন্নভাবে পানি দূষিত হচ্ছে। নিম্নে পানি দূষণের কারণসমূহ উল্লেখ করা হলো :
শহরাঞ্চলে : শহরে পানির সর্বরাহ হয় মূলত পার্শ্ববর্তী নদীগুলো থেকে। নদীর পানি বিশুদ্ধ করে খাওয়া ও ব্যবহার উপযোগী করা হয়।  শহরে যেসকল কারণে পানি দূষিত হয় সেগুলি হচ্ছে-

  • কলকারখানার বর্জ্য নদীতে মিশে পানি দূষিত হয়।

  • ওয়াসার পানির লাইনের উপর অবৈধ পয়নিষ্কাষণের ব্যবস্থা এবং এগুলি পানিতে মিশে পানি দূষিত করে।

    অনেক সময় পানির লাইন ফেটে যেয়ে এর ভিতর ময়লা-আবর্জনা প্রবেশ করে। এর ফলে পানি দূষিত হয়।

গ্রামাঞ্চলে : গ্রামাঞ্চলে খাওয়া ও ব্যবহারের জন্য মানুষ নলকূপ, পুকুর ও জলাশয়ের পানি ব্যবহার করে। বিভিন্নভাবে এই পানি দূষিত হচেছ। কারণসমূহ নিম্নে দেওয়া হলো:

নলকূপের পানিতে আর্সেনিক গ্রামে পানি দূষণের প্রধান কারণ।
ফসলের ক্ষেতে কীটনাশকের ব্যবহার এবং বৃষ্টির পানিতে তা পুকুর, জলাশয়ের পানিতে মিশে পানি দূষিত হয়।
একই পুকুরে কাপড় পরিষ্কার, মানুষ ও গবাদী পশুর গোছল করালে পানি দূষিত হয়।

এভাবে শহর ও গ্রামে পানি দূষিত হয় এবং খাওয়া ও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে ওঠে।

পানি দূষণে স্বাস্থ্য ঝুঁকি: পানি দূষণের কারণে বিভিন্ন ধরণের পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। যেমন-

পানিবাহিত রোগ:

ডায়েরিয়া

ব্যাকটেরিয়াজনিত:

টাইফয়েড

সংক্রমন

কলেরা, প্যারাটাইফয়েডজ্বর ও বেসিলারী আমাশয়

ভাইরাল সংক্রমণ(জন্ডিস)

পোলিওমাইলিটিস হেপাটাইটিস সংক্রমণ

প্রোটোজল সংক্রমণ:

অ্যামোবিক আমাশয়

 

মাটি দূষণ : মাটি পরিবেশের অন্যতম অপরিহার্য উপাদান। কিন্তু মানুষ প্রতিনিয়ত বিভিন্নভাবে মাটি দূষণ করে চলেছে। ফলে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে এবং মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে।

মাটি দূষণের কারণ : মাটি দূষণের কারণসমূহ নিম্নরূপ-
ফ্যাক্টরীর দূষিত পানি মাটিতে মিশে
তেল ও দার্জ্য পদার্থ যানবাহন থেকে লিক হয়ে রাস্তায় পড়ার পর বৃষ্টির মাধ্যমে মাটিতে মিশে
কৃষি খামারে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার বৃষ্টির মাধ্যমে মাটিতে মিশে
এসিড বৃষ্টি

মাটি দূষণে স্বাস্থ্য ঝুঁকি: দূষিত মাটিতে খাদ্য উৎপাদন কম হয়। ফলে বিপুল জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয় না। ফলে খাদ্য ঘাটতি থেকে মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভোগে এবং মানুষের স্বাস্থ্যহানি ঘটে।
পরিবেশ দূষণ সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক (অব:) ড. বোরহান উদ্দীন বলেন, দেশে ক্রমবর্ধমান সরকারী ও বেসরকারী উন্নয়নের ফলে নতুন নতুন শিল্প কারখানা তৈরী হচ্ছে। এ সকল কারখানার ধোঁয়া, বর্জ্য, কেমিক্যালযুক্ত পানি পরিবেশের সাথে মিশে বায়ু, পানি,মাটি প্রভৃতি দূষিত করছে। তিনি পরিবেশ রক্ষায় পরিবেশ বান্ধব ইন্ডাস্ট্রি গড়ার পরামর্শ দেন এবং এ ব্যপারে যুগোপযোগী আইন করে পরিবেশ রক্ষায় সরকারের প্রতি দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। এছাড়া তিনি ব্যাপকহারে জনসচেতনতা সৃষ্টি ও বেশি করে গাছ লাগানোর কথা বলেন।
পরিশেষে বলা যায় যে, আমাদের সুস্থ জীবন-যাপনের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ অপরিহার্য। তাই আমাদের সকলের উচিত পরিবেশ দূষণ রোধে সচেষ্ট হওয়া।