জলবায়ু হুমকি মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রীর হিমালয় পরিষদ গঠনের প্রস্তাব আইলা দুর্গতদের সাহায্যের আহ্বান জাতিসংঘের মাত্রাতিরিক্ত নদী দূষণের শিকার ঢাকার অন্তত চারটি নদী

পরিবেশ রক্ষায় পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে

নাজমুস সাদাত

পরিবেশের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নিবিড়। অনুকূল পরিবেশ ছাড়া মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। আলো, বাতাস, পানি, গাছপালা, অরণ্য, বায়ুমন্ডল প্রকৃতির কোথাও কোন সমস্যা দেখা দিলে তার যে প্রতিক্রিয়া হয় তার অভিঘাত সবচেয়ে বেশি এসে পড়ে প্রাণীজগতের ওপর। গত আড়াইশ তিনশ বছরে পৃথিবীতে যে বিপুল শিল্পায়ন ও নগরায়ন হয়েছে তাতে মানুষের জীবন হয়েছে সহজ, আরামদায়ক ও উপভোগ্য। নানা আয়োজনে জীবনকে সাজাতে গিয়ে আমরা প্রকৃতির ওপর যে অত্যাচার করেছি, প্রকৃতিকে যেভাবে দূষিত করেছি তার ফলাফল হচ্ছে বৈশ্বিক উঞ্চায়ন, ওজন স্তর পাতলা হয়ে যাওয়া, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অত্যধিক ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ও জীব বৈবিত্র্য হারিয়ে যাওয়া। ঢাকাসহ বাংলাদেশের নাগরিক জীবন আজ পানি, বায়ু, ও শব্দদূষণসহ নানারকম দূষণে বিপন্ন। সম্প্রতি নাগরিক জীবনে সবচেয়ে দূষণ ও শংকা তৈরি করছে পলিথিন ব্যাগ। পলিইথিলিন, যা জনপ্রিয়ভাবে পলিথিন নামে পরিচিত, হচ্ছে এক ধরনের পলিমার। বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার যোগ্য পলিথিন প্রথম আবিস্কৃত হয় ১৯৩৩ সালে। ইম্পেরিয়াল কেমিক্যাল ইন্ডাষ্ট্রিজ (আই সি আই) এর ইংল্যান্ডের গবেষণাগারে এটির আবিস্কার করেন এরিক ফসেট্‌ ও রেজিনাল্ড গিবসন। বর্তমানে বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৬০ মিলিয়ন টন পলিথিন সামগ্রী উৎপাদিত হয়। আদিতে পলিমার একটি শক্ত, সাদা, স্বচ্ছ বস্তু। এর বহুবিধ ব্যবহারের মধ্যে পণ্যের মোড়ক, বোতল, খেলনা, বৈদ্যুতিক কেবল, পাইপ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে দুই ধরনের পলিথিন উৎপাদিত হয়- কম ঘনত্বের কোমল পলিথিন এবং উচ্চ ঘনত্বের পলিথিন। পলিথিন তৈরি হয় অপরিশোধিত খনিজ তেল হতে। আবিস্কৃত হবার পর দ্রুত পলিথিন মানব সভ্যতার জন্য এক আশির্বাদ রূপে দেখা দেয়। বৈদ্যুতিক ও টেলিফোনের কেবল প্রস্তুতিতে এবং খাদ্যদ্রব্যের স্বাস্থ্যসম্মত বিপণনে পলিথিন এক নতুন যুগের সূচনা করে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে শীঘ্রই, বিশেষত পরিবেশের উপর পলিথিনের মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পরিলক্ষিত হতে শুরু করে। বর্তমানে তাই মানব সভ্যতায় পলিথিনের অবদান আর অবিমিশ্র নয়। একদিকে যেমন সহজলভ্যতা ও স্বল্পমূল্যের কারণে এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে, অন্যদিকে তেমনি পরিবেশ ও মানব স্বাস্থের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে এটি এক নতুন অভিশাপ হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বে প্রতি মিনিটে ১ মিলিয়ন পলিথিন ব্যাগ ব্যবহূত হচ্ছে। বৈজ্ঞানিক হিসাব অনুযায়ী একটি পলিথিন ব্যাগ প্রকৃতিতে মিশে যেতে সময় নেয় এক হাজার বছর।
এক সমীক্ষা অনুযায়ী ঢাকা শহরে একটি পরিবার প্রতিদিন গড়ে চারটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে এবং এ শহরের বাসিন্দারাই প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি পলিথিনব্যাগ ফেলে দেয় (বিবিসি ডট কম, ১ জানুয়ারী ২০০২)। পরিবেশের ওপর পলিথিনের ক্ষতিকর প্রভাবের কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকার ২০০২ সালে চূড়ান্তভাবে প্রথমে ঢাকা নগরীতে ও পরে সারাদেশে পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। এ নিষেধাজ্ঞা বর্তমানে কার্যকর থাকলেও গত ২-৩ বছর ধরে পলিথিনের অত্যধিক উৎপাদন ও ব্যবহার আমাদেরকে আবারো শংকিত করে তুলেছে। নিষেধাজ্ঞা জারির পূর্বে বাংলাদেশে চারশত পলিথিন কারখানা প্রতিদিন ১৩০ মিলিয়ন পলিব্যাগ উৎপাদন করছিল (দি নিউ এজ ৯ জুন ২০০৫)। এতে পানি দূষণ, জলাবদ্ধতা, মাটি দূষণ, বায়ু দূষণ এবং স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি হত, এখনও হচ্ছে। পণ্যের সাথে বিনামূল্যে দেয়া পলিথিন ব্যাগগুলো দ্রুত সারাদেশের ড্রেন, নালা, খাল, ডোবা ইত্যাদি ভরাট করে ফেলে এবং পানির প্রবাহ থামিয়ে দেয়। এর ফলে দেখা দেয় দুই প্রকারের সমস্যা: জলাবদ্ধতা ও বন্যা এবং জনগণের স্বাস্থ্য সমস্যা। এক হিসেব অনুযায়ী ঢাকা শহরের শতকরা আশিভাগ বন্ধ ড্রেনের কারণ হচ্ছে পলিথিন ব্যাগ। প্রতিদিনের শত শত পলিথিন ব্যাগ পড়ে বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীর নাব্যতা ব্যাপক হারে হ্রাস পাচ্ছে। পানিরোধি গুনের কারণে মাছ ও সবজির বাজারে পলিথিনের ব্যবহার বেশি। মাছ এবং সবজি বাজারের বিপুল চাহিদার সুযোগ নিয়ে কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন ও বিপণন করে যাচ্ছে। পলিথিনের বিষাক্ত প্রভাব থেকে পরিবেশ ও নাগরিক জীবনকে রক্ষা করতে নিচের উদ্যোগগুলো গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মত দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও এনভায়রনমেন্টাল ল’ বিশেষজ্ঞ শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন : এক. পলিথিন ব্যাগের বিকল্প হিসেবে পাট, কাগজ ও কাপড়ের ব্যাগ উদ্ভাবনের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহকে কার্যকরভাবে এগিয়ে আসতে হবে। দুই. আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরকে ঘন ঘন মোবাইল কোর্টের আয়োজন করতে হবে। তিন. সরকারের পক্ষ থেকে বাজারগুলোতে নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা করতে হবে। চার. পলিথিনের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে নিজেরা সচেতন হতে হবে এবং অন্যদেরও সচেতন করে তুলতে হবে।