জলবায়ু হুমকি মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রীর হিমালয় পরিষদ গঠনের প্রস্তাব আইলা দুর্গতদের সাহায্যের আহ্বান জাতিসংঘের মাত্রাতিরিক্ত নদী দূষণের শিকার ঢাকার অন্তত চারটি নদী

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম শিকার বাংলাদেশ

জাফর সাদেক শিবলী

বতর্মান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে দাড়িয়েছে। আর বাংলাদেশের মত কতকগুলো উন্নয়নশীল দেশ এই ক্ষতির প্রত্যক্ষ সাক্ষী। মালদ্বীপ সরকার সহ উন্নয়নশীল বিশ্বের সরকারদের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলা হলেও উন্নত বিশ্বের নেতৃবৃন্দ এ ব্যাপরে কান দিচ্ছেনা। তবে ইদানিং এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক মাতামাতি চলছে। তার কারন গোটা বিশ্ব আজ এই জলবায়ু পরিবতর্নের হুমকির সম্মুখীন। ওজোন স্তর ক্ষয়ে যেয়ে সূর্যের উত্তাপ সরাসরি ভূ-মন্ডল ও তার জীব বৈচিত্র্যের বেঁচে থাকাকে কঠিন করে তুলছে। যেসব কারণে বিশ্বের তাপমাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, এ সমস্যা নিরসনে শিল্পোন্নত দেশগুলোকেই নিয়মনীতি অনুসরণ করতে হবে। বিশষেজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ুর এই পরিবর্তনের ফলে এক চতুর্থাংশ বিশ্ব ব্যাপক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। যদিও জলবায়ুর এই বিপর্যয়ের জন্য সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো কোনভাবেই দায়ী নয়। দেখা যাচ্ছে, জলবায়ু পরবির্তনের ফলে যেসব দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তার শীর্ষ তালিকায় বাংলাদেশের নাম রয়েছে। নদী-সাগর সংলগ্ন ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যাবার আশংকা দীর্ঘদিনের। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে অন্যান্য যে কোন দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থা খুবই খারাপ। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার মানুষ যুগ যুগ ধরে নদী ভাংগন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। নতুন করে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় এলাকায় বিপর্যয়ের যে আশংকা দেখা দিয়েছে, তা প্রতিরোধ ও প্রতিকারের ব্যবস্থা না হলে বাংলাদেশের অস্তত্বি হুমকির সম্মুখীন হবে। বিজ্ঞানীদের মতে, আবহাওয়ার উষ্ণতা স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে অসহনীয় উষ্ণতা, দাবানল বৃদ্ধি, হিমালয়সহ বরফাচ্ছাদিত পৃথবিীর প্রান্তিক এলাকাসমূহের বরফ গলে যাওয়া, অনাবৃষ্টি, খরা, প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীন নানা ধরনের দুর্যোগের মুখে গোটাবিশ্ব এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। এমন পটভূমিতে কোপেনহেগেন বিশ্ব জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলন হয়ে গেল। গোটাবিশ্বের ভবিষ্যত রক্ষা তথা প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য এই বিশ্ব সম্মেলনে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্প্রতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন দুই বৃটিশ মন্ত্রী। বাংলাদশে সফরে এলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদেরকে বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ ক্ষতগ্রিস্ত হচ্ছে অনেক বেশি। আর এ কারণেই বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সাহায্যের ও আনুকূল্যের দাবিদার। কেননা জলবায়ু পরবির্তনে বাংলাদেশের নিজের কোন নেতিবাচক ভূমিকা নেই। তৃতীয় বিশ্বের আরও অনেক দেশের মতো বাংলাদেশ বৈশ্বিক আবহাওয়া পরিবর্তনের শিকার। এ জন্যই জলবায়ু পরবির্তনজনতি কারণ বাংলাদশে তার অভিযোজন ও প্রশমন কর্মসূচিতে উচ্চ পর্যায়ের অর্থবহ ও কার্যকর আন্তর্জাতিক আনুকূল্য ও আর্থিক সহযোগিতা পাওয়ার দাবি রাখে। প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন,  বাংলাদেশ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে সরকারী পর্যায়ে সচতেন।
সম্ভাব্য প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে ক্ষতিগ্রস্থ  জনগণকে রক্ষা করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী সুইজারল্যান্ড সরকারসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আর্থিক, প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোভিত্তিক সহায়তা কামনা করছেন। প্রধানমন্ত্রী একই ইস্যুত জনেভো সফররে সময় এ ব্যাপার কথা বলছেনে। প্রধানমন্ত্রী বলছেনে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাংলাদেশ বিপর্যয় প্রতিরোধে নদী খনন, জমি পুনরুদ্ধার, বাঁধ নির্মাণসহ উপকূলীয় এলাকায় সবুজ বেষ্টনী তৈরীর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। জেনেভাভিত্তিক বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার উদ্যোগে আয়োজিত সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলছেনে, অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব কৃষিনির্ভর স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অভিযোজন প্রয়োজনীয়তা মেটোতে ভবিষ্যত জলবায়ু চুক্তির আইনগত বাধ্যবাধকতার প্রতিশ্রুতি অন্তভূক্ত করা জরুরি। এদিকে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে তা মন্ত্রিসভায় অনুমোদনও করেছে। এ পরকিল্পনায় রয়েছে ৬টি থিম এবং ৪৪ টি কর্মপরিকল্পনা। এসবরে মধ্য রয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা, সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো, গবেষণা, মটিগিশেন এবং দক্ষতা উন্নয়ন। এতে জাতীয়ভাবে ৭০০ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি নিম্ন পর্যায়ে কমিয়ে আনতে এ অর্থ ব্যয় করা হবে। সফররত বৃটিশ মন্ত্রী মিলিব্যান্ড বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন রোধে নতুন একটি চুক্তি করতে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে চলতি বছরের ডিসেম্বরে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, এ সম্মেলন জলবায়ু পরবির্তন রোধে ও তার ক্ষয়-ক্ষতি মোকাবিলায় একটি ন্যায়সংগত ও টেকসই চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে। বাংলাদেশে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব ঠেকাতে কী করা হচ্ছে এবং কী করা যায়, তা প্রত্যক্ষ করত দুই বৃটিশ মন্ত্রীর সরেজমিন সফর এ প্রসঙ্গে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বৃটিশ মন্ত্রী মিলিব্যান্ড বলছেনে, ভারত ও বাংলাদশে বসবাসকারী বৃটিশ নাগরিকদের পরিবার বন্যা ও খরার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে ভালোভাবে ওয়াকিবহাল। তারা এও জানেন যে, অনিয়ন্ত্রিত জলবায়ু পরিবর্তন একে আরও নাজুক করে তুলেছে। এই পটভূমিতে সবারই প্রত্যাশা, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে এমন একটি চুক্তিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উপনীত হতে সক্ষম হবেন, যাতে করে বিশ্ব বিপন্ন অবস্থা থেকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলার সাহস পায়। জলবায়ু পরবির্তনজনিত কারণে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত দেশের অন্যতম শীর্ষ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সামনের কাতারে রয়েছে। প্রথমত শিল্পোন্নত দেশগুলো এতকাল যাবত বৈশ্বিক আবহাওয়াকে বিপন্ন করে আসছিল, তা থেকে তাদের নিবৃত্ত করা, বিশেষ করে, এমন উন্নয়ন-কৌশল প্রণয়ন করত হবে যা প্রকৃতির ভারসাম্য ও পরিবেশের সংরক্ষক এবং উষ্ণতাকে বৃদ্ধি করবে না। দ্বিতীয়ত ইতোমধ্যেই আবহাওয়া পরিবর্তন বৈশ্বিক যে ক্ষতি হয়েছে এবং যেসব দেশ এর শিকার হয়েছে তার প্রতিকারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন করা। তবে বাংলাদেশকে যদি বৈশ্বিক জলবায়ু পরবির্তনের বিরূপ প্রভাব নিরূপণ করতে ভারতকে বাদ দিয়ে তা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের সকল নদীর উৎসমুখ ভারতে। বাঁধ দিয়ে ভারত যেমন পানি আটকিয়ে বাংলাদেশকে মরুময় ও লবণাক্ততায় সিক্ত করে তুলছে, তেমনি বর্ষায় বন্যার পানি ছেড়ে দিয়ে প্রতি বছরই বাংলাদেশক ডুবাচ্ছে। গঙ্গায় ফারাক্কা বাঁধ, তিস্তা, টিপাইমুখবাঁধ সহ অসংখ্য বাঁধ ও গ্রোয়েন দিয়ে ভারত বাংলাদেশের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় বর্ষার খরস্রোতে বাংলাদশে নদী ভাংগন জনজীবনের এক নিত্যদিনের বিড়ম্বনা। ভারতের নদীমুখে অসংখ্য বাঁধ দেয়ায় পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ আর্সেনিকের শিকার।  আবহাওয়া বিপর্যয় রোধে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান বা এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা চাইলে, আর তাকে  অর্থবহ করতে হলে ভারতকে প্রতিবেশীর বিরু্দ্ধে পরিবেশ ও নদী আগ্রাসনের পথ থেকে সরে আসতে হবে। তবে সরকার এ ব্যাপারে কী পদক্ষপে নেবে, তার ওপরই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নির্ভর করছে। সময়ক্ষেপন না করে যথোপযুক্ত টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সামনে রেখে এখনই উন্নয়নশীল বিশ্বকে বাচিঁয়ে রাখার জন্য এগিয়ে আসতে হবে।