বিগত জোট সরকারের আমলে ভারতের টিপাইমুখ প্রকল্পটি তেমন আলোচিত না হলেও বর্তমান সময়ে এটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে এবং একটি জাতীয় ইস্যু হিসেবে পরিণত হয়েছে। বিগত তত্ত্ববধায়ক সরকারের আমলেও এ বিষয়টি ব্যাপক আলোচিত হলেও তারাও কোনো গঠনমূলক পদক্ষেপ নিতে পারেনি। দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোসহ বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন ও সংস্থা এবং গণমাধ্যমগুলো এ ব্যাপারে এখন যথেষ্ঠ সরব।
টিপাইমুখ বাঁধ হলে বাংলাদেশে বিশেষ করে সুনামগঞ্জসহ বৃহত্তর সিলেট ও কিশোরগঞ্জ এলাকায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অদূর ভবিষ্যতে শুকিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে সুরমা ও কুশিয়ারা নদী। ক্ষতিগ্রস্ত হবে কৃষি। মৎস প্রজনন এবং সর্বোপরি পরিবেশ ও স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়বে বাংলাদেশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বাংলাদেশের পরিবেশ ও স্বাস্থ্য খাতে চরম বিপর্যয় নিয়ে আসবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি দল এটিকে নিয়ে রাজনীতি করার চেষ্টা চালাচ্ছে, অন্যদিকে এ ব্যাপারে সরকারের গতিও মন্থর। ভারত টিপাইমুখ বাঁধ বিষয়ে সব তথ্য বাংলাদেশে দিয়েছে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মণি মন্তব্য করলেও তা এখনো সরকারের পক্ষ থেকে জনগণ বা গণমাধ্যমে পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করা হয়নি। বাংলাদেশের সিলেট থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার উজানে মনিপুরে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র করার পরিকল্পনা নিয়ে অনেকদূর এগিয়েছে ভারত। সেদেশের নর্থ-ইস্টার্ন ইলেকট্রিক পাওয়ার করপোরেশন (নিপকো) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। এর নাম রাখা হয়েছে টিপাইমুখ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। সাধারণভাবে এটি টিপাইমুখ বাঁধ নামে পরিচিত। ২০০৩ সালে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ভারত সরকারের কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি এ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। এখনো প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি। ১০ জুন ২০০৯ মিজোরাম সরকারের সাথে বৈঠক করেছে নিপকো। ভারতের মনিপুর সরকার ইতিমধ্যে প্রকল্পটি অনুমোদন করেছে এবং এপ্রকল্পের পাঁচ শতাংশ মালিকানা এখন মনিপুর সরকারের হাতে। মনিপুর মিজোরাম সীমান্তে মনিপুরের চুরাচন্তর জেলার টুইভাই ও বরাক নদের মিলনস্থলে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। কাজ শুরুর ১২ বছরের মধ্যে এটি নির্মাণ করতে চায় নিপকো। এতে ছয়টি ইউনিটে দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। টিপাইমুখ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পানি ধারণক্ষমতা সাড়ে ১৫ বিলিয়ন ঘনমিটার। প্রায় ৩০০ বর্গকিলোমিটারের একটি জলধার তৈরি করে এই পানি রাখা হবে। মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৩৫১ কোটি রুপি (প্রায় ১৩৫ মোটি ডলার)। এতে ৫৩০ ফুট উঁচু ও এক হাজার ৬০০ ফুট প্রশস্ত একটি ড্যাম নির্মাণ করে পানি ধরে রাখা হবে।
বাংলাদেশের উপর প্রভাব: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাঁধের নকশা, কী পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে, এ জন্য কী পরিমাণ পানি ভারত ছাড়বে এবং বর্ষা মৌসুমে কী পরিমাণ পানি আটকে রাখতে প্রভৃতি সম্পর্কে সব উপাত্ত না জেনে বাংলাদেশের ক্ষতির পরিমাণ যাচাই করা সম্ভব নয়। তারা বলেন, টিপাইমুখ বাঁধ লবণাক্ততা বাড়ার আশঙ্কা না থাকলেও কৃষি, মৎস্য প্রজনন ও পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক জহির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প করলে ভারত ভরা জলাধারে পানি আটকে রাখবে এবং স্বাভাবিক পানি প্রবাহ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। ফলে বর্ষা মৌসুমে সুনামগঞ্জসহ বৃহত্তর সিলেট, কিশোরগঞ্জের হাওড়াঞ্চল আগের মত প্লাবিত হবে না। পানি কম এলে মাছের প্রজনন কম হবে। স্বাভাবিক বন্যা বন্ধ হলে হাওড়ের জীববৈচিত্রও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। আবার, শুকনো মৌসুমে পানি কমে আসার পর বৃহত্তর সিলেট, কিশোরগঞ্জ নেত্রকোকাণার বিস্তীর্ণ হাওড়াঞ্চলে বোরো চাষ হয়। ভারত বর্ষার শেষের দিকে পানি ছাড়বে। এ সময়ে পানি প্রবাহ বেড়ে গেলে চাষের জায়গা কমে যাবে। কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তিনি বলেন, টিপাইমুখ ড্যাম করা হলে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীতে পানিপ্রবাহ অনেক কমে যাবে। অন্যদিকে, গবেষণায় জানা যায়, টিপাইমুখ ড্যাম নির্মাণের স্থানটি ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। এর প্রভাব বাংলাদেশের উপর পড়বে।
এ প্রসংগে বাংলাদেশ ভূমিকম্প সমিতির সাধারন সম্পাদক মেহেদি আহমেদ আনসারী বলেন, বড় ড্যাম করলে ভূমিকম্পের আশংকা থাকে। শুকনো এলাকায় দীর্ঘ সময় পানি ধরে রাখলে মাটির উপর চাপ তৈরী হয়। এতে মাটির নিচের ঘুমন্ত ফাটলগুলো সক্রিয় হয়ে ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা তৈরী হয়। তিনি বলেন, টিপাইমুখ ড্যাম নির্মানের স্থানটি ভূমিকম্প প্রবন এলাকা। সরকারের উচিৎ বিষয়টি যথাযথভাবে অনুসন্ধান করে ভারতের কাছে তুলে ধরা।
রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা : ২০০৩ সালে ভারত সরকার যখন প্রকল্পটি অনুমোদন দেয় এবং ২০০৫ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক দরপত্রের আহ্বান করে, তখন চার দলীয় জোট সরকার এর জোরালো প্রতিবাদ করেনি। জোটের শরিক বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে তখন এ বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচী বা আলোচনা সভা আয়োজনের কথাও শোনা যায়নি। আবার জোট সরকারের আমলে ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় যৌথ নদী কমিশনের ৩৬ তম বৈঠকেও বাংলাদেশ টিপাইমুখ বাঁধ বিষয়টি জোড়ালোভাবে তুলে ধরেনি। এর দুই মাস পর ভারত এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করার পরও সরকার কোনো প্রতিবাদ করেনি। সে সময় ভারতের পানি সম্পদ মন্ত্রী প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা না করে কোনো বাঁধ তারা নির্মাণ করবে না। বর্তমান সময়ে, প্রধান বিরোধীদল বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধীদলীয় দলগুলো এ বিষয়ে যথেষ্ঠ সোচ্চার এবং প্রধান রাজনৈতিক কর্মসূচীর ইস্যু হিসেবে পণিত হয়েছে। অন্যদিকে, এ বিষয়ে বর্তমান সরকারের মন্থর গতি লক্ষ্য করা গেছে। এ বিষয়টির প্রতিবাদ প্রসংগে তাদের মধ্যে এক প্রকার ভীত-সন্ত্রস্ত মনোভাব লক্ষ্য করা গেছে। টিপাইমুখ বাধ হলে বাংলাদেশের জন্য এটি উপকারও হতে পারে, পানিসম্পদ মন্ত্রির সম্প্রতি এমন একটি মন্তব্য তীব্র ভাবে সমালোচিত হয়। সরকারের পক্ষ থেকে গত ২৯ জুলাই সাবেক পানিসম্পদ মন্ত্রি আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে নয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল টিপাইমুখ প্রকল্প পরিদর্শনে পাঠানো হয়। উক্ত সফরে তারা ভারতের প্রতি যৌথ সমিক্ষার প্রস্তাব করেন। প্রতিনিধিদলের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন আ.লীগের এ বি এম আনুয়ারুল হক ও জহির হোসেন, জাতীয় পার্টির এ বি এম হাওলাদার, স্বতন্ত্র সাংসদ ফজলুল আজিম, পানিসম্পদ সচিব অহিদুজ্জামান, বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক মনোয়র হোসেন, ও যৌথ নদী কমিশনের সদস্য সাজ্জাত হোসেন। জানা যায় ভারতের পক্ষ থেকে লিখিত কোন তথ্যউপাত্ত দেয়া হয় নি প্রতিনিধিদলকে। এ সফর কতটুকু সফল এ ব্যাপারে প্রতিনিধি দলের প্রধান আব্দুর রাজ্জাক বলেন, তারা সেচ অবকাঠামো নির্মান না করার অঙ্গিকার করেছে। এটি একটি সফলতা। দলের অপর সদস্য রুহূল আমীন হাওলাদার বলেন, টিপাইমুখে কোন অবকাঠামো নির্মান হতে দেখা যায় নি। বরং যে পাথরের নামফলকটি দিয়ে প্রকল্পটির উন্মোচন করা হয়েছে, সেটি ভাঙ্গা অবস্থায় দেখা গেছে।
অন্যদিকে বিরোধীদল থেকেও পৃথক আরেকটি দল সেখানে পরিদর্শনের জন্য পাঠানোর কথা থাকলেও রাজনৈতিক জটিলতায় সেটি আটকে আছে।
এর আগে বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধিদল বাঁধ এলাকা পরিদর্শন না করা পর্যন্ত এবং পরিবেশের উপর বাঁধের প্রভাব সম্পর্কে সমন্বিত গবেষণা চালানো পর্যন্ত টিপাইমুখ বাঁধের নির্মাণকাজ এগিয়ে না নেওয়ার জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি।
টিপাইমুখ বাঁধের নেতিবাচক প্রভাব সুষ্পষ্ট, যার সাক্ষী ফারাক্কা বাঁধের শিকার পদ্মা। তাই এই জাতীয় ইস্যুটিকে নিয়ে রাজনীতি না করে সমন্বিতভাবে কুটনৈতিকভাবে এর সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। নতুবা ফারাক্কার মত টিপাইমুখও বাংলাদেশের জন্য মহাপ্রলয়ের বার্তা নিয়ে আসতে পারে। বাধেঁর কারনে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে সময়ে সময়ে সৃষ্টি হবে জলাবদ্ধতা ও মরুময়তা। নষ্ট হবে পরিবেশ ও প্রতিবেশগত ভারসাম্য। পানির অত্যধিক চাপে যে কোন সময় হতে পারে ভূমিকম্প। ফলে বসবাসের উপযোগিতা হারাবে এই অঞ্চল। জলা ভূমি কমে যাওয়ায় সংকট দেখা দিবে মাছের, ব্যাহত হবে কৃষি উৎপাদন। বাতাসে বাড়বে কার্বনের পরিমান, কমবে অক্সিজেন। ফলে প্রতিকুল পরিবেশে বেচে থাকা মানুষগুলোর স্বাস্থ্যহানী ঘটবে। সুরমা-কুশিয়ারা নদীর উপর নির্ভরশীল এলাকার মানুষের জীবন যাত্রার পরিবর্তন হবে। মাছের সংকটে আমিষের অভাবে ভুগবে নদী আববাহিকার মানুষরা। সুরমা ও কুশিয়ারা নদী শুকিয়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়বে দেশের অন্য নদীগুলোর উপরও। ফলে বসবাসের উপযোগীতা হারাবে সবুজ শ্যামল আমাদের এই বাংলাদেশ। |