জলবায়ু হুমকি মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রীর হিমালয় পরিষদ গঠনের প্রস্তাব আইলা দুর্গতদের সাহায্যের আহ্বান জাতিসংঘের মাত্রাতিরিক্ত নদী দূষণের শিকার ঢাকার অন্তত চারটি নদী

মাত্রাতিরিক্ত নদী দূষণের শিকার ঢাকার অন্তত চারটি নদী

জাহিদ হাসান

ভয়াবহ দূষণে আক্রান্ত ঢাকা শহরের চারপাশের নদীগুলো। সদরঘাটে বুড়িগঙ্গার পানি কুচকুচে কালো। হাজারীবাগে রক্তের মত লাল। তুরাগের পানি কোথাও কালো, কোথাও গাঢ় নীল বর্ণ। টঙ্গীতে বালু নদের পানি ধুসর। সরকারী কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা শাস্তির ব্যবস্থা না থাকায় অবাধে চলছে নদী দখল ও ভরাট, যার ফলে নদীগুলো এখন বিলীন হওয়ার পথে। একইসাথে ঐতিহ্যবাহী ঢাকা শহর হারাচ্ছে তার সৌন্দর্য্য এবং প্রায় সোয়া কোটি অধ্যুষিত এই শহরের মানুষগুলো রয়েছে মারাত্মক স্বাস্থ্য হুমকির মধ্যে।
রাজধানীর ভিতরে-বাইরে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ১৮টি ছোট-বড় নদী। এর সবই আজ বিপন্ন। সম্প্রতি ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক জরিপে বলা হয় ঢাকার অভ্যন্তরের ৪৩টি খালের সীমানা খাতা কলমে থাকলেও বাস্তবে এদের অস্তিত্ব নেই। সীমানা রেখা অনুযায়ী খালগুলোর অনুসন্ধানে গেলে সেখানে অবৈধ টিনসেড ঘর, দোকানপাট ও বহুতলভবনের চিত্র দেখা যায়। অন্যদিকে অস্তিত্ব বাঁচাতে লড়ছে বুড়িগঙ্গা, বালু, তুরাগ ও শীতলক্ষা। একদিকে অবৈধ স্থাপনা, অন্যদিকে কলকারখানার দূষিত উপাদান ও সোয়া কোটি নগরবাসীর বর্জ্য নদীর মৃত্যু ঘটাচ্ছে।
নদী বাঁচিয়ে ঢাকা বাঁচাতে কয়েকটি গণমাধ্যম বর্তমানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে অবস্থিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদসহ নদীদূষন রোধ ও নাব্যতা বৃদ্ধিতে সরকারও নানা উদ্যোগ নিয়েছে।

নদীর দূষণ : সদরঘাট এলাকার বাসিন্দা মো: আব্দুস ছোবহান বলেন, আগে বুড়িগঙ্গার তীর ছিল ঢাকার বিনোদনের একটি প্রাণ কেন্দ্র। বিকেলে পরিবারসহ অনেকে ঘুরতে আসত। এখন ঘুরতে আসাতো দূরের কথা নদীর তীর দিয়ে হাটাও যায় না পানির পঁচা দূর্গন্ধে। টঙ্গির তুরাগনদী এলাকার ব্যবসায়ী মনিরুজ্জামান খান বলেন, পুরো টঙ্গি এলাকার কলকারখানাসহ মানুষের বর্জ্য এই তুরাগে এসে পড়ছে। ফলে এর পানি এখন বিষে পরিণত হয়েছে। বিপুল জনসংখ্যা অধ্যুষিত ঢাকা শহরের পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকার কারণে প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ ঘনমিটরেরও বেশি পয়োবর্জ্যের প্রায় সবটাই উন্মোক্ত খাল, নদী, নর্দমা বেয়ে অপরিশোধিত অবস্থায় বুড়িগঙ্গায় এসে পড়ছে। অন্যদিকে টঙ্গী, বাড্ডা প্রভৃতি অঞ্চলের বর্জ্য চলে যাচ্ছে বালু ও তুরাগে। ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, পাগলায় অবস্থিত ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের পরিশোধন ক্ষমতা এক লাখ ২০ হাজার ঘনমিটার। কিন্তু লাইন আছে মাত্র সাড়ে ৬০০ কিলোমিটার এবং পাম্পিং স্টেশন আছে মাত্র ২৪টি। ফলে বর্তমানে ঐ প্ল্যান্টে মাত্র ৫০ হাজার ঘনমিটার পয়ঃশোধন করা যায়। বাকিটা অপরিশোধিত অবস্থায় বুড়িগঙ্গায় গিয়ে পড়ছে। ওয়াসাসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, রাজধানীর মাত্র ২০ শতাংশ বাসিন্দা এবং ৩০ শতাংশ পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার আওতায় এসেছে।
বুড়িগঙ্গার মরণদশার সবচেয়ে বড় কারণ হলো হাজারীবাগের ট্যানারী শিল্প কারখানা। বর্তমানে এখানে প্রায় আড়াইশ ট্যানারী কারখানা আছে। এগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ২২ হাজার ঘনমিটার তরল বর্জ্য ও ১০ মেট্রিক টন কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। যার প্রায় পুরোটাই নানাভাবে বুড়িগঙ্গায় পড়ছে। ফলে বুড়িগঙ্গার পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা শূণ্যের কোটায় এসে ঠেকেছে, যে কারণে কোনো জলজ প্রাণী এখন আর এখানে অবশিষ্ট নেই। অন্যদিকে প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক মদদপুষ্ট গোষ্ঠীর নদী দখল এবং দখল করা জায়গায় গড়ে তোলা শিল্প কারখানার বর্জ্য নদীতে গিয়ে পড়ছে। সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, বুড়িগঙ্গার তলদেশের ১০ ফুট পর্যন্ত পলিথিনের স্তর দ্বারা আবৃত। এভাবে বুড়িগঙ্গাসহ বালু, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা অন্তত এই চারটি নদীর অস্তিত্ব এখনই হুমকীর সম্মুখীন।

স্বাস্থ্য বিপর্যয় : বুড়িগঙ্গার দূষণমাত্রা এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে, নদীর পাশ দিয়ে হাঁটা যায় না। মাত্রাতিরিক্ত এই দূষণের ফলে রাজধানীর সোয়াকোটি মানুষের স্বাস্থ্য এখন হুমকীর সম্মুখীন। দূষণের ফলে ভূ-উপরিভাগের পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ায় আমাদেরকে নির্ভর করতে হচ্ছে ভূ-গর্ভস্থ পানির উপর। বর্তমানে ঢাকা ওয়াসা যে পরিমাণ পানি সরবরাহ করছে, তার শতকরা ৮৬ ভাগই ভূ-গর্ভস্থ স্তর থেকে তোলা হচ্ছে। ফলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছর দুই থেকে তিন মিটার নিচে নেমে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় নগরবাসীর জন্য বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। অন্যদিকে নদীর তীর বা আশেপাশের বসবাসকারী লোকজন গোসল, রান্নাবান্নাসহ বিভিন্ন কাজে নদীর পানি ব্যবহার করায় ডায়রিয়া, কলেরাসহ নানাবিধ স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে।
ডেইলী ষ্টার এর সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে এ পযর্ন্ত কোন সরকার নদী ও পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ মনোযোগ দেয়নি। ফলে এক বিরাট বিপর্যয়ের মুখোমুখি পড়ে গেছি আমরা।

পরিবেশের উপর প্রভাব : ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার ফলে যে কোনো মুহূর্তে মাটি দেবে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। অন্যদিকে নদী ভরাটের ফলে নদী তার স্বাভাবিক গতিপথ হারাচ্ছে এবং নদীপথ সরু হয়ে যাওয়ায় অল্প বর্ষাতেই বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক আসাদুল্লাহ খান বলেন, পরিবেশ সংকটের কথা বিবেচনা না করে শহরের নোংরা আবর্জনার শেষ নিষ্কাশন হিসেবে আমরা নদীকে বেছে নিয়েছি। এক দিকে আবর্জনার ভার, অন্যদিকে ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ায় আমাদের ভূ-গর্ভস্থ পানির উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে করে ভূপৃষ্ঠের পানির স্তর ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
দখলদারদের শাস্তির বিধান নেই : অভিযোগ রয়েছে, বিআইডব্লিউটিয়ে বা জেলা প্রশাসন অভিযানেরসময় ছাড়া অন্য সময় কোন রকম পর্যবেক্ষন বা তদারকি করে না। আর নদীর জায়গা দখলের দায়ে দখলদারদের বিরুদ্ধে জেল বা জরিমানার কোন বিধান নেই। বুড়িগঙ্গা নদীবিষয়ক টাস্কফেসের সদস্য এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ এ প্রসঙ্গে বলেন, নদী দখলের অপরাধে কমপক্ষে ১০ বছরের দণ্ড এবং বড় অঙ্কের জরিমানা অনাদায়ে আরও দন্ডের বিধান রাখা উচিৎ। আমি মনে করি, দখলদা দের শাস্তির বিধান সংক্রান্ত আইন করার জন্য বিষয়টিকে সংসদে আনা উচিৎ। বিআইডব্লিউটিয়ে চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান হাওলাদার এ ক্ষেত্রে বিআইডব্লিউটিয়ের সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়ে বলেন, কোন আইনে দখলদারদের শাস্তির বিধান নেই।

গণমাধ্যমের ভূমিকা : ঢাকার আশেপাশের নদীগুলোর পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে এগিয়ে এসেছে কয়েকটি গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন ও সংস্থা। ডেইলী স্টার এবং চ্যানেল আই যৌথ উদ্যোগে চালু করেছে ঢাকা বাচাও, নদী বাচাও আন্দোলন। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এবং পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) নদী রক্ষায় বিভিন্ন কর্মসূচী ও প্রচারণা চালাচ্ছে।

সরকারের ভূমিকা : বর্তমান সরকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদীভাঙ্গন রোধ এবং খননের মাধ্যমে এর নাব্যতা বাড়াতে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। পানি সংরক্ষন, নদীকে দূষণ থেকে রক্ষা ও বৈশ্বিক উষ্ণতার নেতিবাচক প্রভাব থেকে পরিবেশ রক্ষায় এ প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় দেশের প্রতিটি নদী ড্রেইজিং করে নাব্যতা বৃদ্ধি করা হবে। সরকার ইতিমধ্যে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষা নদীর তীরবর্তী অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছে। অন্যদিকে হাজারী বাগের ট্যানারী শিল্পগুলো সাভারে সরানোর আদেশ দেয় সরকার। এছাড়া প্রতিটি শিল্পকারখানাকে নিজস্ব শোধনাগার নির্মান করতে হবে এবং নিজস্ব শোধনাগার ছাড়া নতুন কোন শিল্পকারখানা নির্মান করা যাবেনা এই মর্মে নির্দেশ দিয়েছে সরকার।

আদালতের ১২ দফা নির্দেশনা : ঢাকার চার নদী বাঁচাতে তীরবর্তী জায়গার অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদসহ ১২ দফা নির্দেশনা দিয়েছে আদালত। গত ২৫জুন বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ও বিচারপতি মো: মমতাজউদ্দিন আহমেদের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ নিদের্শ দেয়। নির্দশনায় বলা হয়, আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সিএস রেকর্ড অনুযায়ী চার নদীর সীমানা নির্ধারণ করতে হবে। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে নদী সীমানার মধ্যে জমে থাকা বালু, মাটি, ভাঙ্গা ইট বা সুরকি অপসারণ করতে হবে, ২০১১ সালের ৩১ মেরমধ্যে চারটি নদীর তীরে হাটার পথ নির্মাণ করতে হবে। একইসঙ্গে করতে হবে বনায়নও। ভূমি মন্ত্রণালয় নদীগুলো তীরবর্তী ৫০ গজ জায়গা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কাছে হস্তান্তর করবে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীতে প্রয়োজনীয় খনন কাজ করবে। সীমানা নির্ধারণী জরিপ শুরু হওয়ার পর জরিপ কাজে জড়িত কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা যাবে না। যমুনা নদী থেকে এই চার নদীতে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য আগামী পাঁচ বছর কর্ণপাড়া, পুংলি, ও টঙ্গী এলাকার খালগুলো নিয়মিত খনন করতে হবে। বংশী ও ধলেশ্বরী নদীকে নিয়মিত খনন করে রক্ষা করতে হবে। সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তর, ঢাকা সিটি কর্পোরেশন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরিন নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ, ভূমি জরিপ অধিদপ্তর এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবে।

এক হাজার একর জায়গা ফিরে পাবে নদীগুলো : সি এস জরিপ অনুসারে ঢাকার নদীগুলো সীমানা নির্ধারণ করা হলে দখল হওয়া প্রায় এক হাজার একর জায়গা উদ্ধার হবে। ভূমি জরিপ অধিদপ্তর, ঢাকা জেলা প্রশাসন ও অভ্যন্তরিন নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এর পূর্বেও বহুবার নদীর তীরবর্তী উচ্ছেদ অভিযান চললেও কোনো নীতিমালা বা শাস্তির ব্যবস্থা না থাকায় আবারও দখল হয়ে যায় নদীর তীরবর্তী অঞ্চল। বিশেষজ্ঞরা একটি শক্তিশালী নীতিমালা এবং অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে সুপারিশ করেন। এছাড়া একটি নদী কমিশন গঠনে এবং উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রাখার প্রস্তাব করেন তারা।