গত বিশ বছর ধরে বাংলাদেশে আর্সেনিকোসিস নামক একটি প্রাকৃতিক দূর্যোগ আবির্ভূত হয়েছে। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ জেলাতেই এটি ভয়াবহ আকার ধারন করেছে। সরকারি হিসাব মতে ৬৪ টি জেলার মধ্যে ৪১ টি জেলাই মারাত্বকভাবে আক্রান্ত। ভূ-গর্ভস্থ আর্সেনিক যুক্ত পানি পান করার ফলে এটি দ্রুত ছড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞের মতে, বাংলাদেশের মতো বিশ্বের অন্য কোনো দেশে এত বেশি লোক আর্সেনিক ঝুঁকির মধ্যে নেই৷ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে প্রতি লিটার পানিতে .০৫ মিলি গ্রামের বেশি আর্সেনিক থাকলে তা মানুষের শরীরে জন্য ক্ষতিকর ৷ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যে এটিকে মহা প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলে ঘোষনা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতার মাধ্যমে এই রোগ প্রতিরোধযোগ্য।
১৯৮০ সালের দিকে বিজ্ঞাণীগন আর্সেনিক দূষণের কারণ খোজার চেষ্টা করলেও ১৯৯০ সালের মাঝামাঝি সময়ে এ সমস্যাটি ব্যপক গণসচেতনতার বিষয় হিসেবে আবির্ভুত হয়। জরিপে বাংলাদেশে শতভাগ আর্সেনিক মুক্ত কোন জেলা পাওয়া যায় নি এবং ৬৪ টি জেলার মধ্যে ৪১ টি জেলাতে এটি ব্যপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশের হিসাব অনুযায়ী দেশের প্রায় ২৬% নলকুপ আর্সেনিক আক্রান্ত এবং ৫০%-৬০% গভীর নলকুপ বিপজ্জনক মাত্রায় অবস্থান করছে। ২০-৩০ মিলিয়ন জনগন আর্সেনিক যুক্ত পানি পান করছে। আর্সেনিকোসিসে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন অনেকে। আসেনিকের ভয়াবহতা সত্বেও এখনো সংক্রমিত এলাকার মানুষগুলো এর চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকি সম্পর্কে অবহিত নন। অন্যদিকে এ ভয়াবহ নিরব ঘাতকটি সম্পর্কে সরকারও জোরালোভাবে কোন গনসচেতনতামূলক কর্মসূচীর উদ্যোগ নিচ্ছে না। যদিও কিছু সরকারী ও বেসরকাররি সংগঠন আর্সেনিক মুক্ত বাংলাদেশের জন্য কাজ করছে, কিন্তু বাস্তবে এই দানব আকারের সমস্যার বিপরীতে এটি খুবই ছোট একটি প্রয়াশ। এতে করে দেশের সার্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বিশেষ করে আর্সেনিক আক্রান্ত গ্রামাঞ্চল গুলো মহা স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে। আর্সেনিক হচ্ছে এক ধরনের ধূসর বর্ণের ইস্পাত জাতীয় ধাতব পর্দাথ যা ভু-ত্বকে বিস্তিৃত থাকে। এর কোন গন্ধ বা বিশেষ স্বাদ নেই। টিউবওয়েলের পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা প্রতিলিটারে ১০-৫০ মাইক্রোগ্রাম নিরাপদ। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক মানুষের জন্য মারাত্বক ক্ষতিকর। আর্সেনিক বিষক্রিয়া একটি নীরব ঘাতক, যন্ত্রণাদায়ক প্রক্রিয়া যা দিনে দিনে ভয়ানক রূপ নিয়ে থাকে। এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটায়। আর্সেনিকের কবলে পড়ে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রাণ হারিয়ছে অসংখ্য মানুষ। বাংলাদেশের ৫০% মানুষ আর্সেনিকোসিসের ঝুঁকিতে রয়েছে। এর উৎস ভু-গর্ভস্থ পানি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একে মহাপ্রাকৃতিক বিপর্যয় বলে ঘোষনা দেয়।
আর্সেনিকে আক্রান্ত হলে প্রাথমিক পর্যায়ে হাতে ও পায়ের তলাতে বাদামী রংয়ের ছোপ এবং কালো ক্ষত চিহ্ন দেখা দেয়। চামড়ার উপরেও একই ধরনের দাগ পড়ে। শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হয়। কিডনির কার্যকারিতা প্রভাবিত হয়। জন্ডিস দেখা দেয়। নার্ভাস সিস্টেম ও হরমোন আক্রান্ত হয়। ধীরে ধীরে জীবনী শক্তি লোপ পায়। একই সাথে বহুমুখী জটিলতা দেখা দেয় এবং পরিশেষে ক্যান্সার ও মৃত্যু অবধারিত। উচ্চ মাত্রার আর্সেনিক (খাদ্য ও পানিতে ৬০০০০ পি.পি.বি. মাত্রার বেশি) মৃত্যু ঘটায়। যদি কেউ নিম্ন মাত্রার আর্সেনিক (খাদ্য ও পানিতে ৩০০-৩০০০০ পি.পি.বি. মাত্রার) ভক্ষণ করে, তাহলে পাকস্থলিতে ব্যাথা, অরুচি, বমি এবং ডায়রিয়া সহ পাকস্থলি ও অন্ত্রে অস্বস্থিকর অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। আর্সেনিক ভক্ষনের ফলে অন্যান্য রোগের মধ্যে রয়েছে শারিরীক ক্লান্তি, অস্বাভাবিক হৃদকম্পন, রক্ত কনিকার চুর্ণ-বিচুর্ণের দ্বারা ধমনি ধ্বংস, দূর্বল স্নায়ু কার্যকারিতা। আর্সেনিকোসিসের ফলে চামড়া পরিবর্তন যেমন হাতের তালু বা পায়ের তলায় কালোবর্ণের ছোট ছোট গুটি বা টিউমার বের হবে। ছোট ছোট এই গুটিগুলো পরিশেষে ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে। আর্সেনিক খাওয়ার ফলে লিভার, মুত্রথলি, কিডনী, জরায়ু ফুসফুসে ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।
আর্সেনিকোসিস সম্পর্কে কিছু ভ্রান্ত ধারণা: গ্রামের সাধারন মানুষগুলো আর্সেনিক সম্পর্কে সঠিক ধারনা না থাকায় তারা চরম ভুলের মধ্যে হাবুডুবু খায়। অনেকেই এখনো মনে করে এটি সৃষ্টিকর্তার অভিশাপ, কেউ বলে এটা তার অতীত কর্মফলের শাস্তি, কেউ বলে শয়তানের আত্না, কারো কারো ধারণা আর্সেনিক
ছোঁয়াছে রোগ, আর্সেনিকোসিসকে কুষ্ঠ রোগ বলার মত অলীক ধারণা এখনো অনেককে গ্রাস করে বসে আছে।
আর্সেনিকোসিসের সামাজিক প্রভাব : আর্সেনিকোসিস রোগের কারনে সামাজিক বৈষম্য বাড়ছে। নারীদের নির্বাসিত করা হয় অথবা একা বিচ্ছিন্নভাবে রাখা হয়। প্রতিবেশিরা আক্রান-দের এড়িয়ে চলে। আক্রান-রা মানষিক যন্ত্রনায় বিদ্ধ হন। মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রে কঠিন সমস্যার সম্মুখিন হতে হয়। পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। স্বামীরা আর্সেনিক আক্রান্ত স্ত্রীদের ঘৃনা করে, এমনকি তালাক দেয়। আক্রান্ত শিশুর শারীরিক ও মানসিক বেড়ে ওঠা বাধাগ্রস্থ হয়।
অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারাকাত’র গবেষনা তত্ত্বে বলা হয়, আর্সেনিক আক্রান্তের ফলে কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ায় ঐ পরিবারের আয় হ্রাস পায়। কৃষি কাজে দিন মুজর হিসেবে না নেবার ফলে অথবা মুজুরী কম দেবার ফলে অথবা ছোঁয়াছে রোগ সংক্রান্ত ভ্রান্ত ধারণার ফলে আর্সেনিক আক্রান্ত মানুষের পেশার পরিবর্তন ঘটে। শ্রম বাজারে চরম বৈষম্য দেখা দেয়। আক্রান্ত বয়োবৃদ্ধদের বঞ্চনা বেড়ে যায়। দরিদ্র আক্রান্ত মানুষের স্বাস্থ্যখাতে পারিবারিক ব্যয় বৃদ্ধি পায়। ফলে খাদ্য গ্রহণ হ্রাস পায়। এভাবে মানুষ নতুন এক দারিদ্রের কবলে পড়ে। যা থেকে বেরিয়ে আসার অন্যতম প্রধান উপায় হচ্ছে আর্সেনিকমুক্ত খাবার পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। এ জন্য ব্যপকভাবে সনো-ফিল্টার বিতরন জরুরী।
আর্সেনিকোসিসের ক্লিনিকেল ফিচারগুলো : কোন ব্যক্তির চুল, নখ ও চামড়ার পরীক্ষার দ্বারা আর্সেনিকোসিস নির্ণয় করা হয়। তবে একজনের শরীরে আর্সেনিকের লক্ষন প্রকাশ পেতে ৬ মাস থেকে ২০ বছর পর্যন্ত সময় লাগে। হাতের তালু ও পায়ের তলার চামড়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পিন্ড দ্বারা বা ক্ষুদ্র ক্ষ্রদ্র পিন্ড ছাড়াই মোটা ও খসখসে হয়ে যায় এবং ছোট ছোট শক্ত গুটি দেখা দিতে পারে ও পরে কালো দাগ হয়, রোগীর গায়ে (যেমন বুকে, পিঠে, পেটে) কালো কালো দাগ দেখা দেয় ও চামড়া মোটা ও খসখসে হয়ে যায়, চামড়ার বিভিন্ন জায়গায় সাদা, কালো বা লাল দাগ দেখা দেয়, খাওয়া-দাওয়ায় অরুচি, মুখের ভিতরের বিভিন্ন অংশে ঘা, হাত ও পায়ের তালু ফেটে যায় ও শক্ত গুটি বের হয়, হাত-পা ফুলে যায়, রক্ত আমাশয়, রক্ত বমি হয়, পেটে ব্যাথা ও মাথাব্যাথা হয়, শারিরীক দূর্বলতা, রক্তশূন্যতা, লিভার বেড়ে যাওয়া, ক্রনিক ফুসফুসিয় রোগ এবং রক্তনালীতে রোগ। এই উপসর্গগুলো বিভিন্নধরনের জনগনের মধ্যে সুস্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা গেছে।
দীর্ঘস্থায়ী আর্সেনিক বিষক্রিয়ার চিকিৎসা : এই মারাত্মক আর্সেনিক বিষক্রিয়ার বিস্তৃতি সত্ত্বেও এই রোগের জন্য কোনো কার্যকরী থেরাপী নেই, অন্যদিকে আর্সেনিক দুষিত পানি পরিশোধনের পরও রোগী আরোগ্য লাভ করতে নাও পারে। দীর্ঘস্থায়ী আর্সেনিক আক্রান্ত রোগীদের দেহে আর্সেনিকের ভান্ডার হ্রাস করা এবং পরবর্তী ক্যান্সার ঝুকি কমানোর ”চিলেশন থেরাপি” একটি সুনির্দিষ্ট থেরাপী হিসেবে বিচেনা করা হয়।
সহায়ক ও উপর্সগমূলক চিকিৎসা : স্কিন মেনিফেস্টেশন, দুর্বলতা, রক্তশূন্যতা এবং স্নায়ুদুর্বলতা উপশম করতে ডাক্তাররা প্রোটিন জাতীয় খাবার বেশি পরিমানে খাওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন যা প্রানীজ উৎস বা শব্জি যেমন মটর, সয়াবিন, গম প্রভৃতি থেকে পাওয়া যাবে। আর্সেনিক দূষিত পানি এবং আর্সেনিক আক্রান্ত অন্যান্য উৎস থেকে পানি পান না করা, আর্সেনিক আক্রান্ত যেসব রোগী ধুমপান করেন তাদেরকে সম্পূণ এবং স্থায়ীভাবে ধুমপান না করার পরামর্শ দিয়েছেন ডাক্তাররা। কারণ অনেক ক্ষেত্রে আর্সেনিকের বিষক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট ক্রনিক কাশি মৃত্যুর কারন হতে পারে। বিভিন্ন ধরনের ক্লিনিকেল মেনিফেস্টেসনগুলো উপসর্গ অনুযায়ী দেয়া উচিৎ। শ্বাসজনিত সমস্যা হলে দ্রত চিকিৎসা করানো উচিৎ। পুজযুক্ত থুতু বের হলে অক্রিটেট্রাসাইক্লিন অথবা এম্ফিসিলিন (২৫০-৫০০ গ্রাম) দিনে চারবার অথবা কো-ট্রিমোক্রাজল (৯৬০ গ্রাম) ৫-১০ দিন দিনে দুইবার সেবন করা যেতে পারে।
আর্সেনিক আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে অন্ত্রের অস্থায়ী রোগজনিত সমস্যা সৃষ্টি হয় এবং রক্তচাপ সম্পূর্ন নিচে নেমে যায়। আর্সেনিক থেকে সৃষ্ট মানসিক বিষন্নতার প্রতিক্রিয়া লাঘব করতে এমিট্রিপটিলিন নামক ওষধ বেশ কার্যকরী। হাত ও পায়ের তলার চামড়া মোটা হয়ে যাওয়ার চিকিৎসা হিসেবে ডেরেটোলাইটিক মলম ব্যবহার করার কথা বলেছেন ডাক্তাররা। ক্রনিক আর্সেনোকোসিসের কারনে সৃষ্ট চর্ম ও রক্তনালীতে ক্যান্সার প্রতিকারযোগ্য। এসব ক্যান্সারের বর্ধিত ক্ষেত্রে চিকিৎসাসেবা সুলভ নয়।
আর্সেনিক হলে করণীয় :
ক) আর্সনেকি রোগরে উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তার অথবা স্থানীয় স্থাস্থ্যকর্মীর নিকট থেকে পরামর্শ নিতে হবে;
খ) অবশ্যই আর্সনেকিমুক্ত পানি পান করতে হবে ;
গ) নদী, পুকুর, ইত্যাদির পানি ছেঁকে ২০ মিনিট ফুটিয়ে পান করতে হবে;
ঘ) বৃষ্টির পানি আর্সেনিক নিরাপদ, এজন্য বৃষ্টি শুরু হওয়ার ৫ মিনিট পর বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে হবে;
ঙ) আর্সনেকি আক্রান্ত রোগী সব ধরনের খাবার খতে পারনে ৷ তবে শাক-সবজি ও পুষ্টিকর খাবার বেশি করে খেতে হবে;
চ) আমষি, ভিটামিন যুক্ত (এ, ই, স) খাবার বেশি করে খেতে হবে; এতে তাড়াতাড়ি আরোগ্য লাভ করা যাবে;
কেবলমাত্র গনযোগাগের মত সচেতনতামূলক কর্মসূচী, পূনর্বাসন, আক্রান্তদের চিকিৎসা , আসেনিকমুক্ত পানি সরবরাহ এবং সার্বিক স্বাসথ্য সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যমে আর্সেনিকমুক্ত জীবন গড়া সম্ভব। |