ওষুধ তৈরি, ওষুধের মান নিয়ন্ত্রন, ওষুধ আমদানি, ওষুধের কাঁচামাল আমদানির অনুমতি দেয় ওষুধ প্রশাসন পরিদপ্তর। কিন্তু প্রয়োজনীয় লোকবল , যানবাহন ও ওষুধের গুন ও মান নিয়ন্ত্রনের পরীক্ষাগারের অভাবে ঠিকমত কাজ করতে পারছেনা ওষুধ প্রশাসন পরিদপ্তর।ওষুধের গুন ও মান জানার জন্য ওষুধ প্রশাসন পরিদপ্তরের আওতাধীন পরীক্ষাগার আছে মাত্র দুটি। প্রতিষ্ঠান দুটিতে কাজ করছেন মাত্র ৫৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। এর বিপরীতে ওষুধের পরিমান অনেক বেশী। সব ওষুধের গুণ-মান জানতে চাইলে কত সময় লাগবে, এর সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। ওষুধ প্রশাসনের অবকাঠামোগত সমস্যা ও জনবলস্বল্পতার কারণে বাজারে নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ ছেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পরিস্থিতি বদলাতে প্রশাসনের কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না।
ওষুধ প্রশাসন সূত্র জানায়, সারা দেশে অ্যালোপ্যাথি ওষুধ কোম্পানি রয়েছে ২৪৬টি, ইউনানি ২৬১টি, আয়ুর্বেদিক ১৬১টি ও হোমিওপ্যাথি ওষুধ কোম্পানি ৭৭টি। একটি ওষুধ একাধিক কোম্পানির তৈরির অনুমতি আছে। যেমন- শুধু প্যারাসিটামল ট্যাবলেট তৈরি করে ১০৬টি কোম্পানি এবং প্যারাসিটামল সিরাপ তৈরি করে ২১টি কোম্পানি। সব মিলে বাংলাদেশের বাজারে প্রায় ২২ হাজার ওষুধ আছে। ওষুধের গুণ ও মান পরীক্ষার মূল দায়িত্বও এই প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ ওষুধের গুণ-মান পরীক্ষার জন্য যে অবকাঠামোগত সুবিধা ও জনবল দরকার, তা প্রশাসনের নেই। ওষুধশিল্প ও দেশীয় বাজারে ওষুধ বিক্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, দেশের বাজারে বিপুল পরিমাণ ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ আছে। এ ছাড়া চোরাই পথে অনেক বিদেশি ওষুধ আসে, যা বিক্রি ও ব্যবহারের অনুমতি বাংলাদেশে নেই। বাংলাদেশে ব্যবহারের বা বিক্রির অনুমতি নেই—এমন ওষুধের নাম বড় বড় হাসপাতালের চিকিত্সকদের ব্যবস্থাপত্রেও দেখা যায়। এসব অবৈধ ওষুধ রাজধানীর বড় বড় ওষুধের দোকানে কিনতেও পাওয়া যায়। কিন্তু নিয়মিত বাজার পরিদর্শন করার মতো জনবল ওষুধ প্রশাসনের নেই। ওষুধ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ওষুধ প্রশাসনে ৭৪৫ জন লোকবলের প্রয়োজন; কিন্তু আছে মাত্র ১২২ জন। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণীর ৫৯টির পদের মধ্যে শূন্য আছে ২২টি, দ্বিতীয় শ্রেণীর ১৩টির মধ্যে ছয়টি, তৃতীয় শ্রেণীর ৯১টির মধ্যে ৩০টি এবং চতুর্থ শ্রেণীর ৫৭টি পদের মধ্যে ১২টি পদ দীর্ঘর্দিন ধরে শূন্য পড়ে আছে। প্রশাসন সূত্র বলছে, দেশের ৬৪টি জেলায় একজন করে ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক (ড্রাগ সুপার) প্রয়োজন। কিন্তু ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক আছেন মাত্র ২৯ জন। এর মধ্যে শুধু ঢাকায় কর্মরত রয়েছেন ১৪ জন। বাকি ১৫ জন দিয়ে ৬৩টি জেলার ও গ্রামাঞ্চলের কার্যক্রম চলছে। ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর ও নেত্রকোনা এই চার জেলার জন্য রয়েছে একজন ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক। ওষুধ প্রশাসনের যানবাহন-সংকট দীর্ঘদিনের। কোনো কারখানা পরিদর্শনে বা বাজার পরিস্থিতি দেখার জন্য প্রশাসনের লোকজন গাড়ি ব্যবহার করতে পারেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, ঢাকা থেকে গাজীপুর কারখানা পরিদর্শনে যাওয়ার সময় আমাদের ওষুধ কোম্পানির গাড়ির ওপর নির্ভর করতে হয়। এ রকম আরও বেশ কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনের লোকেরা ওষুধ কোম্পানির সহায়তা নেন। এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের লোকেরা ওষুধ কোম্পানির অনেক বিষয় চেপে যান।
অন্য সংকটটি পরীক্ষাগারবিষয়ক। সরকারিভাবে ওষুধ পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিষ্ঠান দুটি। একটি ওষুধ প্রশাসনের অধীনে চট্টগ্রামে অবস্থিত এবং অপরটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের অধীনে ঢাকায় অবস্থিত। চট্রগ্রামের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজে নিয়োজিত রয়েছে মাত্র ১১ জন লোক এবং ঢাকায় ৪২ জন। ওষুধ প্রশাসন পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইসমাইল হোসেন বলেন, প্রতিটি ওষুধের গুণ ও মান পরীক্ষা করতে সময় লাগে। তিনি বলেন, জনবল ও পরীক্ষাগারের কাজের হিসাব নিয়ে দেখা গেছে, দেশের ওষুধ পরীক্ষা করে দেখতে আড়াই বছর সময় লেগে যাবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, প্রতিটি জেলায় না হলেও অন্তত বিভাগীয় পর্যায়ে একটি করে আধুনিক পরীক্ষাগার থাকা প্রয়োজন। অন্যদিকে ওষুধ পরীক্ষাগারের লোকবল বাড়াতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বহু আগে মন্ত্রণালয়ে লিখিত প্রস্তাব পাঠানো হলেও সেটি ফাইলবন্দী অবস্থায় দীর্ঘদিন পড়ে আছে। |