আমাদের শরীরে অনেক সময়ে রক্তের ঘাটতি দেখা যায়। বিশেষ করে অতিরিক্ত ব্লিডিং হলে শরীরে রক্তস্বল্পতা দেখা যায়। এছাড়া জন্মগতভাবে এ্যানিমিয়া শরীরে রক্তস্বল্পতার অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়া সন্তান জন্মদানের সময় শরীরে রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে। যাদের কিডনী বা অন্য কোনো সমস্যার কারণে ডায়ালাইসিস করতে হয় তাদের শরীরেও রক্তস্বল্পতা দেখা যায়। শিশুদের দেহে বিশেষ করে কৃমির কারনে রক্ত স্বল্পতার সৃষ্টি হয়। সুষম খাবারের অভাবও অনেক ক্ষেত্রে রক্ত স্বল্পতা বা অ্যানিমিয়ার জন্য দায়ী। গর্ভবতী মহিলাদের সন্তান জন্মদানের সময় অতিরিক্ত ব্লিড়িং এর কারনে দেহে দেখা রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। এ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা হচ্ছে এমন একটি শারীরিক অবস্থা যে অবস্থায় লোহিত রক্ত কণিকার পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যায় অথবা হিমোগ্লোবিনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যায়। লোহিত রক্ত কণিকাই রক্তের প্রধান উপাদান যার কারনে রক্ত লাল হয় আর এটি রক্তে অক্সিজেন পরিবহন করে। শরীরে রক্ত স্বল্পতার দরুন সৃষ্টি হয় নানা জটিলতা এমনকি এ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। শরীরে রক্ত স্বল্পতার অন্য অর্থ হচ্ছে শরীরে রক্তে আয়রনের উপস্থিতি কমে যাওয়া। আমরা প্রায়ই শুনি শরীর ফ্যাকাশে হয়ে গেছে বা আয়রনের ঘাটতি হয়েছে। আর এর জন্য কার্যকরী ড্রাগ হচ্ছে হিমোফার। হিমোফার হচ্ছে শিরায় ব্যাবহার যোগ্য ইনজেকশন।
মানব দেহে হিমোগ্লোবিনের স্বাভাবিক মাত্রা হচ্ছে পুরুষ ১৩-১৮ গ্রাম/ডেসি লিটার,মহিলা ১২-১৬ গ্রাম/ডেসি লিটার এবং শিশু ১১-১২ গ্রাম/ডেসি লিটার। হিমোগ্লোবিনের পরিমান এর নিচে থাকলে তাকে আমরা বলি রক্ত স্বল্পতার রোগী।
যে সব লক্ষণ দেখে শরীরে রক্তস্বল্পতা বা এ্যানিমিয়া বুঝা যায় তা হল-
১. স্নায়ুবিক- অবসন্নতা, ঝিঁমুনি, সংজ্ঞা হারানো২. চোখ- হলুদ রং হওয়া
৩. রক্তনালী- নিম্ন রক্তচাপ
৪. ত্বক- ফ্যাকাশে, ঠাণ্ডা ও হলুদ রং হওয়া
৫. শ্বাসক্রিয়া- দম ছোট হয়ে যাওয়া
৬. মাংসপেশি- দুর্বল হয়ে যাওয়া
৭. পরিপাকতন্ত্র- মলের রং পরিবর্তন হওয়া
৮. হৃদযন্ত্র- বুক ধড়ফড় করা, দ্রুত হার্ট বিট, বুক ব্যথা ও হার্ট এ্যাটাক
৯. প্লিহা- আকার বড় হওয়া
এ্যানিমিয়ার কূফল সমূহ:
কর্মদক্ষতা হ্রাস পাওয়া
হৃদরোগ
অকালগর্ভপাত
কম ওজনের শিশু প্রসব করা
মৃতশিশু প্রসব করা
মাতৃমৃত্যু
শিশুমৃত্যু
প্রতিবন্ধিতা
এ্যানিমিয়ার প্রতিকার সাধারনত তিন ধরনের ব্যাবস্থা গ্রহণ করা যায়।
এগুলো হল-
১. সেবনযোগ্য আয়রন
২. শিরাপথে প্রয়োগযোগ্য আয়রন
৩. রক্তপরিসঞ্চালন
Iron Dextran অসুবিধাসমূহ:
আয়রন ডেক্সট্রান (ইমফেরন, কসমোফার) এর মারাত্মক অ্যানাফাইল্যাক্টিক (তীব্র এ্যালার্জিক রিয়াকশন) রয়েছে।
কিন্তু হিমোফার এই ধরনের সাইড ইফেক্ট থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত এবং নিরাপদ ।
Oral Iron অসুবিধাসমূহ:
মুখে গ্রহণ করা Iron এর ৮৮% শোষণ হয় না তা ছাড়াও Oral Iron এর বিভিন্ন মেজর সাইড ইফেক্ট রয়েছে যেমন:. কোষ্ঠকাঠিন্য, বুক জ্বালাপোড়া, বমিভাব, পেটে ব্যথা, ডায়রিয়া ও পায়ুপথের ক্যান্সার। রক্ত পরিসঞ্চালনে রয়েছে অনেক ঝুঁকি যেমন ভুল গ্রুপের রক্ত পরিসঞ্চালন হেমোলাইসিস ঘটাতে পারে।
পরিসঞ্চালন জনিত রিয়াকশন যেমন- তাপমাত্রা বৃদ্ধি, আর্টিকোরিয়া, অ্যানাফাইল্যাক্সিক (মারাত্মক এল্যার্জিক রিয়াকশন), কিডনী ফেইলোর। পরিসঞ্চালন জনিত ইনফেকশন যেমন- হেপাটাইটস বি, এইডস, যৌনরোগ। দ্রুত রক্ত পরিসঞ্চান শরীরের তাপমাত্রা কমিয়ে দিতে পারে। সর্বোপরি বিশুদ্ধ রক্ত পাওয়া দূষ্কর এবং ক্রসম্যাচিং ও অন্য সব টেস্ট করার পর এক ব্যাগ ব্লাডের মূল্য হয় ১৮০০-২০০০ টাকা। হিমোফারের ২ এ্যাম্পুল = এক ব্যাগ (৪০০ মি.লি.) ব্লাড । প্রতি এ্যাম্পুল হিমোফারে রয়েছে: আয়রন সুক্রোজ যা ১০০ মি:গ্রা: মৌলিক আয়রন এর সমতুল্য (২০ মি.গ্রা:/মি.লি.) । যে সমস্ত রোগীর ক্ষেত্রে রক্ত না দিয়েও শিরাপথে আয়রণ দিয়ে হিমোগ্লোবিন বাড়ানো যায় তাদের জন্য হেমোফার আর্দশ। কারণ এক ব্যাগ (৪০০ মি.লি.) রক্তে রয়েছে ২০০-২২০ মি.গ্রাম আয়রন। যে আয়রন ২ এ্যাম্পুল হেমোফার ব্যবহার করে সহজে পূরণ করা সম্ভব। তাছাড়া এক ব্যাগ রক্ত পরিসঞ্চালনে ১-১৫ গ্রাম/ডেসি লিটার হিমোগ্লোবিন বৃদ্ধি করা সম্ভব।
যাদের আয়রণের ঘাটতি রয়েছে।
যেমন-
গর্ভবতী মহিলা (৪ মাস থেকে ১০ মাস পর্যন্ত)
প্রসব পরবর্তী রক্তস্বল্পতায় ভুগছে এমন রোগী
অধিক রক্তস্রাব জনিত রক্তস্বল্পতায় ভুগছে এমন রোগী
আঘাত জনিত রক্তস্বল্পতায় ভুগছে এমন রোগী
দীর্ঘস্থায়ী কিডনী রোগী
কৃমিতে আক্রান্ত রোগী
হেমোরজিক পাইল্সে আক্রান্ত রোগী
পেপটিক আলসারে আক্রান্ত রোগী
রক্তদানকারী
সার্জারী হয়েছে এমন রোগী
হিমোগ্লোবিনের ঘাটতির কারণে দূর্বল ও অল্প পরিশ্রমে হাঁপিয়ে ওঠে
সেসব রোগীর কাছে ওরাল আয়রণ সহনশীল নয়
ক্যান্সার আক্রান্ত এবং রক্তস্বল্পতায় ভুগছে এমন রোগী
এমন রোগীর ক্ষেত্রে হেমোফার ব্যবহার করা যাবে ।
যে ক্ষেত্রে হিমোফার দেয়া যাবে না:
গর্ভাবস্থার প্রথম তিনমাস
থ্যালাসেমিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে
রোগীর ব্লাড পেশার যদি খুব কম থাকে
(একান্ত প্রয়োজন হলে স্যালাইনের সাথে ধীরে ধীরে সর্তকতার সাথে দিতে হবে।)
হেপাটাইটিস অথবা জন্ডিম তিনমাস
হাপানি রয়েছেন এমন রোগী
মারাত্মক ইনফেকশন রয়েছে এমন রোগী
মাত্রা:
প্রাপ্ত বয়স্কদের ক্ষেত্রে ১ থেকে ২ এ্যাম্পুল সর্বমোট হিমোফার সপ্তাহে ১ থেকে ৩ বার শিশুদের ক্ষেত্রে, প্রতি কেজি ওজনের জন্য সর্বোচ্চ ০.১৫ মি.লি. হিমোফার (৩ মি.গ্রা. আয়রন) সপ্তাহে ১ থেকে ৩ বার দেয়া যেতে পারে। |