১১ এপ্রিল (আমার হেলথ): ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রয় প্রতিনিধিদের (মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ বা এমআর) দৌরাত্ম্যে দেশের হাসপাতালগুলোর সেবা কার্যক্রম দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। যখন-তখন চিকিৎসকের কক্ষে ঢুকে দীর্ঘ সময় অবস্থান করছেন তারা। এতে রোগীদের অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হচ্ছে। রোগী কক্ষের বাইরে এলেই চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র নিয়ে তারা টানাহেঁচড়া শুরু করেন। নিজেদের কোম্পানির ওষুধ না লিখলে চিকিৎসকের কাছে কৈফিয়ত চাইতেও অনেকে দ্বিধা করে না।
এমআরদের আগ্রাসী মনোভাব প্রকারান্তরে চিকিৎসাব্যবস্থাকে ঠেলে দিচ্ছে বিপর্যয়ের মুখে। অব্যাহত প্রলোভনের মুখে দুর্বলচিত্তের চিকিৎসকরা নিজেদের বিবেক পর্যন্ত বিক্রি করে ফেলছেন। এমআরদের চাপে পড়ে ব্যবস্থাপত্রে এন্টিবায়োটিকসহ প্রয়োজনের অতিরিক্ত ওষুধ লেখার প্রবণতা বাড়ছে। পাশের দেশ ভারতে ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে 'উপহার' নিলে শাস্তি হিসেবে চিকিৎসা সনদ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে চিকিৎসকদের সংগঠন মেডিকেল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া। গত ১৪ মার্চ এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে সর্বনিম্ন তিন মাস থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জন্য সনদ বাতিলের কথা বলা হয়েছে। তবে আমাদের দেশে অদ্যাবধি এ সংক্রান্ত কোনো নিয়ম তৈরি করা হয়নি।
বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ রিপোর্ট ২০০৯-এর সারসংক্ষেপে এমআরদের কার্যক্রমকে 'আগ্রাসী' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যবস্থাপত্রে অতিরিক্ত ওষুধ লেখার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। রিপোর্টে দেখা যায়, ১৯৯৪ সালে মোট ব্যবস্থাপত্রের পাঁচ শতাংশে একটির বেশি ওষুধ লেখা হয়েছিল, ২০০৯ সালে এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ শতাংশে। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, গত ১৫ বছরে এন্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধের ব্যবহার বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এতে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে চিকিৎসা ব্যয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র হতে জানা যায়, দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলোতে বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার এমআর কাজ করছেন। ওষুধের বিক্রি বাড়ানোর কাজে নিয়োজিত এসব প্রতিনিধির ওপর বিক্রয়-লক্ষ্য পূরণে নিজ নিজ কোম্পানির দিক থেকে প্রচণ্ড চাপ থাকে। লক্ষ্য পূরণের জন্য এমআরদের প্রণোদনা পুরস্কার দেওয়া হয়। এ কারণে ব্যবস্থাপত্রে বেশি ওষুধ লেখাতে তারা অনেক সময় আগ্রাসী ভূমিকাও নেয়। চিকিৎসকদের 'ম্যানেজ' করতে প্রয়োজনীয় উপঢৌকন কোম্পানির পক্ষ থেকেই সরবরাহ করা হয়। এক্ষেত্রে কনিষ্ঠ চিকিৎসকরাই এমআরদের প্রধান টার্গেট। অনেক সময় জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকরা তাদের পছন্দের কোম্পানির ওষুধ লিখতে কনিষ্ঠদের প্রভাবিত করেন।
রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সরেজমিন পরিদর্শনকালে নির্ধারিত সময়ের বাইরেও এমআরদের আনাগোনা দেখা গেছে। চিকিৎসকের কক্ষের সামনে দায়িত্বরত কর্মচারীরা জানান, নির্ধারিত সময়ের বাইরে চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করতে তারা কখনও সাদামাটা পোশাকে আবার কখনও রোগী সেজে চেম্বারে ঢুকে পড়ছেন। রোগী কক্ষ থেকে বের হলেই তারা ব্যবস্থাপত্র নিয়ে টানাহেঁচড়া শুরু করেন।
ঢাকা মেডিকেল প্রশাসন জানায়, নির্ধারিত সময়ের বাইরে এমআরদের সময় না দিতে প্রত্যেক চিকিৎসককে চিঠি দিয়েছে হাসপাতাল প্রশাসন। প্রবেশপথে নিরাপত্তারক্ষীদের সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে নির্দেশনা মেনে চলার ব্যাপারে সংশ্লিষ্টরা চরমভাবে উদাসীন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীর ব্যবস্থাপত্র লিখছেন এমআররা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ব্যাপারে নিয়ম চালু করতে পারলে চিকিৎসকদের মধ্যে এমআরদের আশকারা দেওয়ার প্রবণতা কমে আসত।
ঢামেক প্রশাসন জানায়, ঢামেক হাসপাতালে প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত, এমআরদের প্রবেশ করার নিয়ম রয়েছে। তবে শীর্ষস্থানীয় দু'একটি কোম্পানির এমআর ছাড়া এই নিয়মনীতির প্রতি কারোরই ভ্রুক্ষেপ নেই। সকাল ১০টা থেকেই নানা কৌশলে তারা ভেতরে ঢুকে পড়েন।
এদিকে ব্যবস্থাপত্রে এন্টিবায়োটিকসহ বেশি ওষুধ লেখানোর বিষয়ে ওষুধ কোম্পানি বা তাদের প্রতিনিধিদের চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন ওষুধ শিল্প সমিতির নেতারা। তারা বলেন, চিকিৎসকদের কাছে ওষুধগুলো পরিবর্তনের কাজ করেন এমআররা। সমিতির সভাপতি সালমান এফ রহমান বলেন, এমআরদের চাপে পড়ে বেশি ওষুধ লেখার অভিযোগ সঠিক নয়। চাপ বা প্রলোভনে পড়ে অপ্রয়োজনে ওষুধ লিখলে তো স্বাস্থ্যসেবা ধ্বসে পড়বে। তিনি বলেন, কোন ওষুধ রোগীর জন্য উপযুক্ত সেই সিদ্ধান্ত নিবেন চিকিৎসক।
এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. আ ফ ম রুহুল হক বলেন, এমআররা কেবল আমাদের দেশে নয়, সব দেশেই কাজ করছে। ছোট ছোট কোম্পানির বিরুদ্ধেই অনৈতিকতার অভিযোগ ওঠে। ভারতের আদলে কোনো নিয়মনীতি চালু হবে কি-না এ প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। |