জাফর সাদেক শিবলী: আমারহেলথ (০৭ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার): সারাদেশের ৪৫ ভাগের বেশি দম্পতি এখনো জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের বাইরে রয়ে গেছেন। ফলে শিশুজন্মের হার বাড়ছে হু হু করে। জন্মনিয়ন্ত্রণে ষাট, সত্তর ও আশির দশকে চলা সরকারের কার্যক্রম এখন ঝিমিয়ে পড়েছে।
জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (নিপোর্ট) হিসাব মতে, দেশে প্রতি ১১ সেকেন্ডে একটি শিশুর জন্ম হচ্ছে। আর প্রতি মিনিটে জন্মাচ্ছে গড়ে ৮টি শিশু।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, প্রতি মিনিটে সারা পৃথিবীতে জন্মায় ২৫০ শিশু। এর মধ্যে বাংলাদেশে জন্মাচ্ছে ৯ জন।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের প্রতিবেদন মতে, দেশে সন্তান জন্ম দিতে সক্ষম দম্পতির সংখ্যা ২ কোটি ৫১ লাখ ৫৬ হাজার ১২৩ জন। ৬টি সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকায় বাসরত দম্পতিদের বাদ দিয়ে এ হিসাব করা হয়। তালিকাভুক্ত দম্পতিদের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহারকারীর হার মাত্র ৫৫ দশমিক ৮ শতাংশ। বাকিরা অপরিকল্পিতভাবে সন্তান জন্ম দিচ্ছেন। চলতি বছরের এপ্রিলে অধিদফতর ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
সরকারের আরেক হিসাবে দেশে প্রতিবছর ৩০ লাখ শিশু জন্মাচ্ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব মতে, গত তিন বছর ধরে বছরে ৩২ লাখের বেশি শিশু জন্ম নিচ্ছে।
অবশ্য জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) প্রকাশিত ২০০৮ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিবছর বাংলাদেশে ৩১ লাখ শিশু জন্মাচ্ছে। ইউনিসেফ ২০০৭ সালে জন্ম নেয়া শিশুদের তালিকা অনুযায়ী ওই প্রতিবেদন তৈরি করে।
সরকারের এক হিসাবে বলা হচ্ছে, লক্ষ্য অনুযায়ী ২০১০ সালের মধ্যে নিট প্রজনন হার ১ অর্জন সম্ভব হলেও ২০২০ সালের মধ্যে দেশের জনসংখ্যা হবে ১৭ কোটি ২০ লাখ। আর ২০৬০ সালে ২১ কোটিতে দাঁড়াবে।
যুক্তরাষ্ট্রের জনগণনা ব্যুরোর প্রকাশিত ২০১০ সালের প্রতিবেদনেও বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে এ আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে।
নিপোর্ট প্রকাশিত প্রতিবেদন মতে, কম বয়সে বিয়ে, প্রজননে সক্ষম নারীর সংখ্যা বাড়তে থাকা, অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঘটনা গত কয়েক বছরে বেশি ঘটায় জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের জরিপে দেখা যায়, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর অভাব, নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারকারীর হার কমে যাওয়া, সরকারের প্রচার না থাকা এবং এক্ষেত্রে লোকবল সঙ্কটের কারণে শিশু জন্ম বাড়ছে।
২০০৬ সালের পর থেকে জন্মনিয়ন্ত্রণের ধারায় স্থবিরতা আসে। অপরিকল্পিতভাবে জনসংখ্যা বাড়তে থাকায় চাপে পড়ে দেশের অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবাসহ অন্যান্য কার্যক্রম।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর থেকে এ বছরের এপ্রিলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে প্রতিবছর ১০ লাখ নারী অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণে বাধ্য হচ্ছেন।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জন্মনিয়ন্ত্রণে স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি গ্রহণের হার এখনও আশঙ্কাজনক হারে কম। শতকরা মাত্র ৫ দশমিক ৭ জন স্থায়ী। আর শতকরা ৮ দশমিক ৬ জন দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। পুরুষদের পদ্ধতি গ্রহণের হার অনেক কম। শতকরা মাত্র ৫ দশমিক ২ জন স্থায়ী, আর ৪ দশমিক ৫ ভাগ অস্থায়ী পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। অন্যদিকে জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ২৩ ভাগ হচ্ছে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী। এক-তৃতীয়াংশ নারী ২০ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মা হচ্ছেন।
পৃথিবীর সব দেশের তুলনায় এ হার এগিয়ে আছে। তাদের মধ্যে শতকরা ৩৮ ভাগ পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ করছেন। বাকিরা থেকে যাচ্ছেন পদ্ধতির বাহিরে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের মহাপরিচালক বেগম দিলরুবার দাবি, ‘লোকবল সঙ্কট, নিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর অভাবে সব কার্যক্রম যথাযথভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।
নিপোর্টের কর্মকর্তারা জানান, ১৯৯৬ সালে মাঠকর্মীরা মাসে শতকরা ৩৮ ভাগ বাড়ি পরিদর্শন করতেন। ১৯৯৭ সালে এ হার ছিল শতকরা ৩৫ ভাগ। ১৯৯৯ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত মাঠকর্মীরা মাসে শতকরা ১৮ ভাগ বাড়ি পরিদর্শন করেন। এর পর থেকে সংখ্যাটা আরও নিচে নামছে।
অন্যদিকে দেশের জনসংখ্যা এখন কত, এ বিষয়ে সঠিক পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান নিয়ে চলছে নানা বিতর্ক। সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০০৯ সালের হিসাব অনুযায়ী জনসংখ্যা ১৪ কোটি ৬৬ লাখ।
কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী সম্প্রতি বলেন, পরিসংখ্যান ব্যুরোর সব তথ্য ঠিক নয়। ইউনিসেফের ২০০৮ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, ২০০৭ সালে এদেশের জনসংখ্যা ছিল ১৫ কোটি ৬০ লাখ। এ প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনসংখ্যা ১৬ কোটি ছাড়িয়ে গেছে।
|