আমারহেলথ (২৭ ডিসেম্বর, সোমবার): অপুষ্টিজনিত রোগে দেশে প্রতিবছর ৩ লাখেরও বেশি শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। এছাড়া প্রায় অর্ধেক শিশু ভুগছে চরম অপুষ্টিতে। অপুষ্টি রোধে সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কার্যক্রম গৃহীত হলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান (আইপিএইচএন) সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রায় অর্ধেক শিশু অপুষ্টির কারণে বিভিন্ন রোগব্যাধিতে ভোগে। এর মধ্যে মারা যায় প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার শিশু। এছাড়া আমাদের দেশের প্রায় ৪১ শতাংশ শিশুর বয়সের তুলনায় ওজন কম, ৪৩ শতাংশ শিশুর বুদ্ধির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং ১৭ শতাংশ শিশু উচ্চতা অনুযায়ী কম ওজন নিয়ে বেড়ে উঠছে। অপুষ্টিজনিত কারণে শিশুরা এ ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যার শিকার হচ্ছে।
বিপুল জনসংখ্যার এ দেশে চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করছে দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ১ চতুর্থাংশ পরিবার তিন বেলা খেতে পায় না। পুষ্টিকর খাবার গ্রহণে বঞ্চিতদের মধ্যে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ঝুঁকি দিনদিন বাড়ছে। গর্ভকালীন সময়ে মায়ের অপুষ্টিজনিত সমস্যা থেকেই মূলত শিশু পুষ্টিহীনতার শিকার হয়।
জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান (আইপিএইচএন)-র পরিচালক অধ্যাপক ডা. ফাতেমা পারভীন চৌধুরী বলেন, দেশে বিগত কয়েক দশকে মায়েরা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর গুরুত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন হয়েছে। এরপরও মাত্র ৪৩ শতাংশ মা তার শিশুকে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত বুকের দুধ দেন। অর্ধেকরও বেশি মা ২ মাস পরেই এটা বন্ধ করে দেন। অথচ তারা জানেন না এটা শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর।
আইপিএইচএন-এর ক্লিনিশিয়ান ডা. মো. আশরাফ হোসেন সরকার বলেন, শিশুর স্বাস্থ্য, মেধা ও প্রজনন ক্ষমতার বিকাশ জন্মের প্রথম দুই বছরের ওপর নির্ভরশীল। মস্তিষ্কের ৭৫-৮০ ভাগ বিকাশ ঘটে এ সময়ের মধ্যে। তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সে ১৫ ভাগ ও পাঁচ থেকে আঠারো বছরের মধ্যে অবশিষ্ট ৫ ভাগের বিকাশ ঘটে।
এদিকে মা ও শিশুর অপুষ্টি প্রতিরোধে সরকারি পর্যায়ে গৃহীত প্রকল্পসমূহে বিরাজ করছে টালমাটাল পরিস্থিতি। অনিয়ম ও দুর্নীতির ছোঁয়ায় এসব কর্মসূচির মুখ্য উদ্দেশ্য অর্জন ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় সেক্টর প্রোগ্রাম হেলথ, নিউট্রিশন ও পপুলেশন সেক্টর প্রোগ্রাম(এইচএনপিএসপি)-র আওতায় প্রায় ১১শ কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়ে ২০০৩ সাল থেকে ন্যাশনাল নিউট্রিশন প্রোগ্রাম (এনএনপি) চললেও এখনও ৩০২টি উপজেলাকে কার্যক্রমের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। অবশিষ্ট ১৭২টি উপজেলার গ্রাম পর্যায়ে কমিউনিটি নিউট্রিশন সেন্টার (সিএনসি)-র আওতায় মাঠ পর্যায়ে কমিউনিটি নিউট্রিশন প্রমোটররা (পুষ্টি আপা বলে পরিচিত) কাজ করছেন। ২০১১ সালের জুন মাসে প্রথম ধাপের বাস্তবায়নকাল শেষ হতে চললেও কার্যক্রম সমপ্রসারণ করতে না পারায় বরাদ্দকৃত অর্থের একটি অংশ অব্যবহৃত থেকে যাবে। সরকার স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা সেক্টর উন্নয়ন কার্যক্রম (এইচপিএসডিপি) নামে স্বাস্থ্য খাতে নতুন একটি কার্যক্রম চালু করবে বলে জানা গেছে। ২০১১ সালের জুলাই থেকে এ কার্যক্রমের যাত্রা শুরু করার কথা রয়েছে। চলতি বছরের নভেম্বরে এ সম্পর্কিত একটি জাতীয় কর্মশালায় এ তথ্য জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডা. আ ফ ম রুহুল হক।
পুষ্টি খাতে সরকারের গৃহীত কার্যক্রমগুলোর অনিয়মের বিষয়টি ওপেন সিক্রেট হলেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ব্যাপারে সরকার দ্রুত সোচ্চার না হলে লুটেরাদের আখড়ায় পরিণত হওয়া উন্নয়নমূলক প্রকল্পসমূহ অদূর ভবিষ্যতে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের।
|