দেশের সব খবর আমার পরিবেশ হেলথ পলিটিক্স ফার্মাসিউটিক্যালস আমার বিনোদন বিউটি এন্ড ফিটনেস আমার ডাক্তার

টিকা উৎপাদন ও বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট

আদিম যুগে বেশির ভাগ শিশুরা জন্মের পরপরই বিভিন্ন রোগে মারা যেত। যার কারণে তাদের পিতা-মাতা সন্তান লালন-পালনের সুখ থেকে বঞ্চিত হতেন। সেসময় পিতা-মাতা জানতেন না কেন তাদের সন্তান অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। কালক্রমে বিজ্ঞানের আশীর্বাদে বিভিন্ন ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়। টিকাদানের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সর্বপ্রথম খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ সালে চীনে বসন্তের টিকার প্রচলন ঘটে। এরপর ১৭১৮ সালে ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় টিকার প্রচলন হয়।

টিকা কী?

মৌলিক ভাবে টিকাদান হলো অতি অল্প পরিমাণে সজীব বা নির্জীব জীবানু
শরীরে প্রবেশ করিয়ে নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতা উজ্জীবিত করা এবং জীবন
বিপন্নকারী বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। যার মাধ্যমে
শিশুদের হুপিং কাশি,হাম,ডিপথেরিয়া,গুটিবসন্ত,জলবসন্ত,পোলিও,ইয়েলো ফিভার
সহ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করা হয়। এদের কোনটা ইঞ্জেকশানের মাধ্যমে
শরীরে পুশ করা হয় আবার কখনোবা মুখে খাওয়ানো হয়। টিকা প্রদান
করলে টিকা গ্রহণকারীর শরীরে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এতে করে
নির্দিষ্ট কোনো রোগের ভাইরাস টিকা নেয়া শিশুর শরীরে রোগজীবানু আক্রমণ
করতে গেলে শক্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থার মুখোমুখি হয়।

টিকার প্রয়োজনীয়তা:

বিশ্বজুড়ে টিকাদান বা ভ্যাকসিনেশন নাটকীয়ভাবে শিশুমৃত্যুহার কমিয়েছে। গত দু’দশক আগেও যথাযথভাবে টিকা না দেওয়ার কারণে অনেক শিশু মৃত্যুবরণ করতো। ইপিআই সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও টিকাদান কর্মসূচি শিশুদের ডিপথেরিয়া, হাম, পোলিও ও ধনুষ্টংকার রোগ নির্মূলের ক্ষেত্রে শতকরা ৯৫ থেকে ৯৮ ভাগ আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে শতভাগ সাফল্য এনে দিয়েছে। এ সম্পর্কে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI)-এর উপ-পরিচালক ডা. এ. কে. এফ মুজিবুর রহমান বলেন, দু’দশক আগে আমাদের দেশে লাখ লাখ শিশু ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, পোলিওসহ জন্মের পরপর হাজারো রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হতো। বর্তমান প্রেক্ষিতে এ রোগগুলোর তেমন কোনো অস্তিত্বই নেই। তিনি আরো বলেন, টিকাদানের সবচেয়ে বড় প্রয়োজনীয়তা হলো শিশুদের সুস্থ রাখা এবং আমরা সে বিষয়ে পুরোপুরি সফল হয়েছি।

টিকার প্রকারভেদ:

বিজ্ঞানীদের মতে টিকা দু প্রকারের। এর মধ্যে প্রথমটি হল Active Immunization এবং দ্বিতীয়টি হলো Passive Immunization । প্রথম প্রকারের টিকা মানুষের শরীরে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। আর দ্বিতীয় প্রকারের টিকা অস্থায়ীভাবে কিছুদিনের জন্য রোগ প্রতিরোধ করে।

বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি:

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশে দুই ধরনের টিকাদান কর্মসূচি চালু আছে। এগুলো হলো শিশুদের জন্য টিকাদান ও মহিলাদের জন্য টিকাদান। শিশুদের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে সর্বপ্রথম বিসিজি (BCG), ডিপিটি (DPT), ওপিভি (Oral Polio Vaccine), হাম (Measles)সহ ৬ প্রকারের টিকাদান শুরু হয়। এরপর ২০০৩ সালে এর সাথে যোগ হয় হেপ-বি (Hep-b)। সবশেষে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে যুক্ত হয় হিব (Hib) প্রতিষেধক।

শিশুদের জন্য ৮টি টিকা:

শিশুকে সব টিকা দেয়ার জন্য জন্মের এক বছর বয়সের মধ্যে মোট চারবার সরকারি বা বেসরকারি টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও এর অঙ্গসংগঠনের মাধ্যমে শিশুদের জন্য মোট ৮টি টিকা সরবরাহ করে থাকে। তার মধ্যে রয়েছে বিসিজি (BCG)। এটা জন্মের পর ১১ মাসের মধ্যে যত দ্রুত সম্ভব শিশুর শরীরে ইঞ্জেকশানের মাধ্যমে পুশ করতে হবে।
 জন্মের ৬ সপ্তাহ বা ৪২ দিন পূর্ণ হলে পেন্টাভেলেন্ট (D+P+T+Hep-b+Hib)- এই পাঁচটি টিকার প্রথম ডোজ পুশ করতে হবে। একই সাথে পোলিও (Oral Polio Vaccine)প্রথম ডোজ মুখে খাওয়াতে হবে। ১ম ডোজের ৪ সপ্তাহ বা ২৮ দিন পর ২য় ডোজ দিতে হবে এবং ২য় ডোজের ৪ সপ্তাহ বা ২৮ দিন পর ৩য় ডোজ দিতে হবে।
শিশুর নয় মাস অথবা ২৭০ দিন পূর্ণ হলে হামের (Measles) টিকা পুশ করতে হবে এবং পোলিও টিকার চতুর্থ ডোজ ও ভিটামিন-এ মুখে খাওয়াতে হবে।
শিশুদের ক্ষেত্রে জন্মের প্রথম বছরেই ৪ বারে সবকটি টিকা দিতে হয়।

মহিলাদের টিকাদান:

১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী সকল সান্তানধারণক্ষম (Reproductive age) মহিলাদের পাঁচ ধাপে টিটি টিকা দেয়ার মাধ্যমে মা ও নবজাতককে ধনুষ্টংকারের হাত থেকে রক্ষা করা যায়। নিয়মানুযায়ী, ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে মেয়েদের টিটি১ নিতে হয়। ১ম ডোজের ৪ সপ্তাহ বা ২৮ দিন পূর্ণ হলে টিটি২ নিতে হয়। ২য় ডোজের ৬ মাস বা ১৮০দিন পূর্ণ হলে টিটি৩ নিতে হয়। ৩য় ডোজের ১ বছর বা ৩৬০দিন পূর্ণ হলে টিটি৪ এবং ৪র্থ ডোজের ১ বছর বা ৩৬০দিন পূর্ণ হলে টিটি৫ নিতে হয়।
মহিলাদের টিটি টিকার পূর্ণ ডোজ সম্পূর্ণ করতে মোট ২ বছর ৭ মাস সময় লাগে।
পরের পাতা