১০, মে জাফর সাদেক শিবলী:
মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে মোটেও গুরুত্ব পায় না। বাংলাদেশের অবস্থা এর চেয়েও করুণ। সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি বরাবরের মত উপেক্ষিত হয়ে আসছে। যে কারনে মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে যথাযথ পরিসংখ্যান পাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব।
মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের(এনআইএমএইচ) প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০০৫ সালে সরকারের সাথে যৌথভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একটি জাতীয় পর্যায়ের জরিপ চালায়। সেই জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ বছরের ওপরের জনসংখ্যার ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ মৃদু থেকে গুরুতর মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত।
সর্বশেষ গত ২০০৭ সালে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অন্য এক গবেষণায় দেখা যায় যে, বাংলাদেশে প্রতি লাখে ০·৪৯ জন করে মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছে। তার মানে প্রতি এক লাখ জনগোষ্ঠীর জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছে মাত্র ০·০৭৩ জন, এবং গড়ে এই সংখ্যা ১৫ লাখ মানুষের জন্য একজনেরও কিছু কম।
এনআইএমএইচ এর পরিসংখ্যান মতে, সারা দেশে বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে মানসিকরোগীদের জন্য প্রতি লাখে ০·৫৮টি করে শয্যা আছে। এর মানে, প্রতি এক লাখ ৭২ হাজার মানুষের জন্য রয়েছে একটি মনোরোগশয্যা।
সারা বিশ্বের প্রেক্ষাপটে মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্ধেগজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি রিপোর্ট দেখা যায়, জাতিসংঘের ১৯২টি সদস্য রাষ্ট্র ও ১১টি সহযোগী-সদস্য রাষ্ট্রের এক-তৃতীয়াংশ দেশেই মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক উপযুক্ত নীতি ও আইন নেই। যার কারনে যথাসময়ে মানসিক রোগী চিকিৎসকের সান্নিধ্যে আসতে পারছেনা। ফলে মানসিক সমস্যা প্রতিরোধের আওতার বাহিরে চলে যাচ্ছে। তৃতীয় বিশ্বের প্রায় সব দেশে একই ধরনের অবস্থা। আর অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্ধেক দেশেই এ-সংক্রান্ত নীতিমালা নেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একই গবেষণায় দেখা যায়, ৩০ শতাংশ রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য-বাজেটে মানসিক স্বাস্থ্যের কোনো স্থান নেই, ২৫ শতাংশ রাষ্ট্র তাদের স্বাস্থ্য-বাজেটের মাত্র এক শতাংশ খরচ করে মানসিক স্বাস্থ্য খাতে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে মানসিক স্বাস্থ্যকে আনুপাতিক গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি আলাদা মানসিক স্বাস্থ্যনীতি তৈরি করা দরকার। এছাড়া বাংলাদেশে যে অল্পসংখ্যক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন, তার ঘাটতি মোকাবিলায় আরও দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং পাশাপাশি বিদ্যমান জনশক্তির মানোন্নয়নে প্রয়োজন উপযুক্ত প্রশিক্ষণ।
বিশেষায়িত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম ঢাকায় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে, পাবনায় একটি মানসিক হাসপাতালে, ঢাকায় একটি মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে এবং মেডিকেল কলেজগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। তার ওপর সব মেডিকেল কলেজে নেই অন্তর্বিভাগে ভর্তির সুবিধা এবং কোনো কোনোটিতে নেই প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ ও জনবল।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. আহমেদ হেলাল আহমেদ মানসিক রোগের প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে আমারহেলথ’কে বলেন, আমরা অন্যসব রোগের মত মানসিক সমস্যাকে তত গুরুত্ব দিই না। আবার অনেক সময় কোনটি যে মানসিক সমস্যা, সেটি বোঝাও আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এ ধরনের উপেক্ষা আর অবজ্ঞার ফলে মৃদু মানসিকরোগ পরিণত হয় গুরুতর মানসিক রোগে।
তিনি আরো বলেন, কেবল সাধারণ মানুষ নয়, বরং চিকিৎসকদের একাংশের মধ্যেও রয়েছে মানসিক রোগ নিয়ে অসচেতনতা। কারন তারাও তো এ সমাজের কেউ।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ডেপুটি পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. ফারুক হোসেন বলেন, বিগত দশকের তুলনায় এ অবস্থার অনেক উন্নতি ঘটেছে, বেড়েছে মানুষের সচেতনতা, বাড়ছে চিকিৎসার সুযোগ। পাশাপাশি আগের চেয়ে অনেক বেশি মেধাবী তরুণ চিকিৎসক আকৃষ্ট হচ্ছেন মানসিক রোগ বিষয়ে উচ্চতর পড়ালেখা ও গবেষণায়।
|