জাফর সাদেক শিবলী
‘সবাই মিলে কাজ করি, কুষ্ঠমুক্ত দেশ গড়ি’ শ্লোগানকে সামনে রেখে এবারের কুষ্ঠদিবস পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে যক্ষাও কুষ্ঠ দিবস পালনের নিয়ম না থাকলেও প্রতি বছর বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন সভা-সেমিনারের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়।
কিন্তু সারা বছর এ বিষয়ে তেমন কোনো প্রচার-প্রচারণা না থাকায় কুষ্ঠ রোগ সম্পর্কে সমাজে বিদ্যমান ভ্রান্ত ধারণা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।
চিকিৎসকদের ভাষায়, এ রোগ দ্বারা মানুষের চর্ম ও স্নায়ু আক্রান্ত হয়। প্রধানত হাঁচি-কাশির মাধ্যমে কুষ্ঠ রোগ বাতাসে ছড়ায়। এছাড়া শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমেও এ রোগ মানবদেহে প্রবেশ করে। কুষ্ঠ জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার দুই থেকে কয়েক বছরের মধ্যে এর লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তবে প্রায় সব মানুষের মধ্যে এই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা আরো বলেন, যাদের দেহে প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি তাদের এরোগে আক্রান্তের ঝুঁকি কম। চিকিৎসকরা বলছেন, সময়মতো সঠিক চিকিৎসা নেওয়ার মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তি দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে চিকিৎসায় দেরি হলে আক্রান্ত ব্যক্তি বিকলাঙ্গ হতে পারে।
মহাখালীর কুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. শেখ আব্দুল হাদী জানান, গত বছরের প্রথম ও দ্বিতীয় কোয়ার্টারে সারা দেশে কুষ্ঠু রোগী শনাক্ত হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ জন। এদের মধ্যে ৮ শতাংশ শিশু। এবং বাকীরা বয়স্ক নারী পুরুষ। যার মধ্যে কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয়ে বিকলাঙ্গ হয়েছেন অনেকেই।
তিনি বলেন, সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয়ে কুষ্ঠ রোগীরা এখনো রোগের কথা গোপন রাখেন। যার ফলে বিকলাঙ্গতার হার বাড়ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
২০১০ সালের হেলথ বুলেটিন অনুযায়ী জানা গেছে, দেশে ঢাকা, সিলেট ও নিলফামারীতে তিনটি কুষ্ঠ হাসপাতালে মোট শয্যা রয়েছে ১৩০টি। এছাড়া বেসরকারিভাবে বেশ কয়েকটি হাসপাতালে কুষ্ঠ রোগের চিকিৎসা দেয়া হয়। সরকারি হাসপাতালগুলোতে ২০১০ সালে বহির্বিভাগে চিকিৎসার জন্য এসেছেন মোট ৬ হাজার ৯৬০ জন।
এদের মধ্যে মহিলা রোগীর সংখ্যা ৪৭১৮, পুরুষ ১৬৪ জন ও শিশু ২ হাজার ৭৮ জন। একই সময়ে এ তিন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে মোট ৬৪৬ জন রোগী। এদের মধ্যে পুরুষ ৫৩৯ ও মহিলা ১০৭ জন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৮ সালে সারা বিশ্বে ২ লাখ ১২ হাজার ৮০২ জন কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত করা গেছে। ২০০৭ সালে এই সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫৪ হাজার ৫২৫ জন। তুলনামূলকভাবে ২০০৭-এর চেয়ে ২০০৮-এ কুষ্ঠ রোগীর সংখ্যা কমে গিয়েছিল প্রায় ৪ শতাংশ। বহুমাত্রিক ওষুধ সরবরাহ ও ব্যবহার করায় এই অর্জন সম্ভব হয়েছে বলে মনে করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
উল্লেখ্য যে, নরওয়ের চিকিৎসাবিজ্ঞানী গেরহার্ড আরামোর হ্যানসেন ১৮৭৩ সালে বিশ্বে প্রথম আবিষ্কার করেন ‘মাইক্রো ব্যাকটেরিয়া লেপরি’ নামক জীবাণু। তিনি গবেষণা করে বের করেন- এ জীবাণু থেকেই মূলত কুষ্ঠ রোগের সৃষ্টি।
কুষ্ঠ রোগ সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করতে ১৯৫৮ সাল থেকে জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রতি বছর জানুয়ারি মাসের শেষ রোববার পালন করা হয় বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস। সেই হিসেবে এবার ৩০ জানুয়ারি বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস পালিত হচ্ছে। |