দেশের সব খবর আমার পরিবেশ হেলথ পলিটিক্স ফার্মাসিউটিক্যালস আমার বিনোদন বিউটি এন্ড ফিটনেস আমার ডাক্তার

বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস: ২ এপ্রিল

অটিস্টিক শিশুদের কল্যানে বেসরকারী সংস্থা এগিয়ে, ধীরেচলা নীতিতে সরকার

জাফর সাদেক শিবলী
অটিজম হলো বিশেষ ধরনের বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা। শিশুরাই মূলত এ রোগের প্রধান শিকার। বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। অস্ট্রেলিয়া, বৃটেন, আমেরিকা সহ কয়েকটি দেশে অটিস্টিক শিশুর ব্যাপারে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান থাকলেও বাংলাদেশ সহ অন্যান্য অনুন্নত এমনকি উন্নত দেশেও এর যথার্থ পরিসংখ্যান নেই।
চট্টগ্রামের অটিস্টিক চিলড্রেন ডেভেলপমেন্ট স্কুল এন্ড রিহাবিলিটেশন সেন্টারের  উন্নয়ন ও গবেষণা বিভাগের পরিচালক  ড.কামরুল ইসলাম বলেন,, বাংলাদেশে অটিস্টিক শিশুর হার মারাত্নক পরিমানে বাড়ছে। কিন্তু শতকরা মাত্র ৪ ভাগ এ ব্যাপরে সচেতন এবং ৯৬ ভাগ অটিস্টিক সম্বন্ধে কোন ধারনাই রাখেনা।
অটিস্টিক চিলড্রেন ডেভেলপমেন্ট স্কুল এন্ড রিহাবিলিটেশন সেন্টারের চেয়ারম্যান মান্নান চৌধুরী টেলিফোনে আমারহেলথকে জানান, দেশে মানসিক অনগ্রসর শিশুদের জন্য সরকারিভাবে বিশেষায়িত কোনো প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। ফলে অটিজমে আক্রান্ত সন্তানদের নিয়ে তাদের অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। নব্বইয়ের দশকে অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা প্রতি ১০ হাজারে একজন ছিল, অথচ ২০০৯সাল পর্যন্ত এ সংখ্যা এসে পৌছেঁ ৫৯ জনে।
ঢাকায় মূলত অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে কাজ করে থাকে অটিজম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন। তাদের পরিচালিত স্কুলের নাম ‘কানন’। এছাড়া এসডব্লিউএসি/সোয়াক, কেয়ারিং গ্লোরি, বিউটি ফুলমাইন্ডসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে কাজ করছে।
ঢাকা ব্যতীত চট্টগ্রামের মির্জাপুল, মুরাদপুরে ২০০৯ সাল থেকে অটিস্টিক চিলড্রেনস ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন স্কুলে অটিস্টিক শিশুদের প্রশিক্ষণ এবং অভিভাবকদের জন্য প্রেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মান্নান চৌধুরী আমারহেলথকে জানান, ‘এখানকার সকল অটিস্টিক শিশুদের আমাদের স্কুলে ভর্তি করানো সম্ভব হয়ে উঠেনা, তারপরও অভিবাবকদের জন্য আমরা বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। যাতে করে তারা শিশুর দেখ-ভাল ভালোভাবে করতে পারেন।’
এদিকে ‘অটিজম দুর্ভোগের বিরুদ্ধে আপনার হাতকে প্রসারিত করুন’ শ্লোগানকে সামনে রেখে ১ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে র‌্যালী অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আয়োজন করে অটিস্টিক শিশু উন্নয়ন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। দিনব্যাপী সাধারণ জনগনের মধ্যে অটিজম সম্বন্ধে সচেতনতা তৈরীতে কাজ করেছে সংস্থাটি। সকাল সাড়ে ৯টায় অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচীতে প্রায় ৩০০জন অংশ নিয়েছে। টি-শার্ট বেলুন এবং পেস্টুনে ছেয়ে গেছে চিটাগাং প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণ। অটিস্টিক শিশুদের স্কুল অটিস্টিক চিলড্রেন ডেভেলপমেন্ট স্কুল এন্ড রিহাবিলিটেশন সেন্টার মানসিক বাধাগ্রস্থা শিশুদের পিতামাতার সঙ্গে শিশুদের মানসিক উন্নয়নে বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করে।

সমাজকল্যান মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, সারাদেশে অটিস্টিক শিশুদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা হাতে নেয়া হচ্ছে। এজন্য দেশের ৭টি বিভাগীয় শহরে অটিস্টিক শিশুদের জন্য বিশেষায়িত স্কুল খোলা হবে। যথাযথভাবে অটিস্টিক শিশুদের চিকিসা প্রদানে এই বিভাগীয় শহরগুলোতে নির্মান করা হবে আধুনিক মানের ডায়াগনোসিস সেন্টার ও উন্নয়ন ফাউন্ডেশন। অটিস্টিক শিশুদের মানসিক বিকারের কমিয়ে আনতে থাকবে রিসার্স সেন্টার। তাছাড়া প্রতিটি ইউনিয়নে অটিস্টিক শিশুদের সংখ্যা নির্ধারনে ইতোমধ্যে কাজ অনেকদূর পর্যন্ত এগিয়ে গেছে।
অটিজম অয়েলফেয়ার ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের কারিগরি শাখা সূত্রে জানা গেছে, নিবিড় যত্ন ও পরিচর্যায়  অনেক শিশু চার থেকে ছয় বছর বয়সের মধ্যে তাদের সীমাবদ্ধতাগুলো একটু করে কমিয়ে আনতে পারে ও একসময় স্বাভাবিক শিশুদের সাথে পড়ালেখা করতে পারে। আরো ১০-২০% শিশু স্বাভাবিক শিশুদের সাথে পড়তে পারে না। এদের কারো জন্য প্রয়োজন হয় বিশেষায়িত স্কুল ও বিশেষ প্রশিক্ষণের। বিশেষায়িত স্কুলে পড়ে, ভাষা সহ বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ গ্রহন করে তাদের পক্ষে সমাজে মোটামুটি স্বনির্ভর একটা স্থান করে নেয়া সম্ভব হতে পারে। কিন্তু বাদবাকি প্রায় ৬০% অটিস্টিক শিশু, সব ধরণের সহায়তা পাওয়ার পরও স্বাধীন, স্বনির্ভর ও এককভাবে জীবন অতিবাহিত করতে পারে না।
ঢাকার শিশু হাসপাতালের অটিজম বিশেষজ্ঞ কয়েকজন ডাক্তারের সাথে কথা বলে জানা যায়, মানসম্পন্ন অকুপেশনাল থেরাপি মিউজিয়াম, আরলি ইন্টারভেনশনাল সেন্টার, কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও আবাসিক ব্যবস্থার মাধ্যমে অনেক সময় অটিস্টিক শিশুদের মানসিক অবস্থার উন্নয়ন সম্ভব হয়। অটিজমের সঙ্গে বিকাশগত অক্ষমতা ও নিউরো বায়োলজিকাল ডিজঅর্ডার জড়িত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অটিজম ওষুধে ভালো হয়ে যাবার মতো কোনা রোগ নয়। সাইকোথেরাপী বা অন্যকিছুও এই রোগ থেকে শিশুকে মুক্তি দিতে পারেনা। শিশুরা মাতৃগর্ভেই অটিজমে আক্রান্ত হয়। এর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা পরিবেশগত বিষক্রিয়া বা দূষণ এবং বংশগত প্রভাবের কথা বলছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের একদল বিশেষজ্ঞ এ বছরের ফেব্রুয়ারীতে এক সমীক্ষায় দেখেন যে, ৪০ বছর বয়সী মায়ের অটিস্টিক শিশু হওয়ার সম্ভাবনা ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী মায়ের তুলনায় ৫০ ভাগ। সমীক্ষায় তারা আরো দেখেন যে, প্রতি ১০,০০০ শিশুর মধ্যে ৫ জনের এমন রোগ হবার সম্ভাবনা রয়েছে। এ রোগে আক্রান্ত ছেলে শিশুর সংখ্যা মেয়ে শিশুর তুলনায় চার থেকে পাঁচ গুন বেশী।    সূত্র: বিবিসি হেলথ।

যুক্তরাজ্যের এক গবেষণায় দেখা যায়, বেশীরভাগ অটিস্টিক শিশুরা অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হয়। প্রতি ১০টি অটিস্টিক শিশুর মধ্যে ১ জনের ভিতর প্রচন্ড দক্ষতা দেখা যায় ছবি আঁকা, গানে কিংবা গণিতে বা কমপিউটার পরিচালনায়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এক দল গবেষকের মতে, আমেরিকায় শিশুদের প্রতি ১৫০ জন একজন এবং অস্ট্রেলিয়ায় ১৬০ জনে একজন শিশু অটিজম আক্রান্ত। যাদের অধিকাংশই গণিত বা অন্য কোন ক্ষেত্রে জিনিয়াস হওয়া দূরে থাক, খুব সাধারণ দৈনন্দিন কাজকর্মেও অন্যের উপর নির্ভরশীল হতে হয়। তারা আরো বলেন, অটিস্টিকদের কেউ কেউ হয়তো বিশেষ পরিস্থিতিতে খুব ভাল আইকিউ স্কোর করতে পারে অথবা বিশেষ কোন কাজে দক্ষতা দেখাতে পারে, কিন্তু এটা নিছকই ব্যতিক্রম।
অটিজম অয়েলফেয়ার ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারপার্সন ড. রওনক হাফিজ অটিস্টিক শিশুদের সার্বিক অবস্থা সম্বন্ধে আমারহেলথকে জানান, অটিস্টিক শিশুদের জন্য আমাদের নিজস্ব উদ্যোগে ‘কানন’ নামে একটি বিশেষায়িত স্কুল খোলা হয়েছে। তবে সিট সংকুলানের অভাবে অনেকেই এখানে ভর্তি হতে পারেনা। এক্ষেত্রে কেউ কেউ সাধারন স্কুলগুলোতে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যায়।
তিনি আরো জানান, ৩-৮ এপ্রিল পর্যন্ত অটিজম অয়েলফেয়ার ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনে অটিস্টিক শিশুদের জন্য হস্তশিল্প প্রদর্শনী, চিত্র অংকন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ডেন্টাল চেকাআপের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সকল অটিস্টিক শিশু ইচ্ছা করলেই এখানে অংশ নিতে পারবে।
অটিস্টিক শিশুদের ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যান বিভাগের পরিচালক ড.কবির মোহাম্মদ সামাদ আমারহেলথক জানান, বিজ্ঞানসম্মত প্রশিক্ষণ ও উপযুক্ত পরিচর্যার মাধ্যমে মানসিক অনগ্রসর শিশুদের সমাজের মূলস্রোতধারায় একীভূত করা এসব শিশুদের একটি প্রয়োজনীয় মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। এজন্য শিশুদের জন্য দরকার প্রতিটি জেলা সদরে বিশেষ স্কুল, খেলাধুলার পাশাপাশি শরীরচর্চার যথেষ্ট সুযোগ সুবিধা। এসব শিশু সমাজেরই একটি অংশ, তাই এদেরকে সাথে নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই অটিস্টিক শিশুর জন্য ভাল মানের শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ‘অটিস্টিক শিশুর প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ দেয়ার মাধ্যমে শিশুর দুর্বলতা বা সীমাবদ্ধতা খুজে বের করে তা দূর করার ব্যবস্থা করা সেই প্রতিভা বিকাশে শিশুকে পূর্ন সহায়তা দেয়াই হবে প্রধান একটি কাজ।’