জাফর সাদেক শিবলী
সারাদেশের আর্সেনিক পরিস্থিতি অবনতির দিকে। প্রায় প্রতিনিয়তই বিশ্বের বিভিন্ন জার্নাল ও ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের আর্সেনিক পরিস্থিতির ঝুঁকির দিকগুলো তুলে ধরা হচ্ছে।
গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে মার্কিন গবেষকরা এ তথ্য জানান যে, আর্সেনিক দূষিত পানি পানের ফলে বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি মানুষ মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছে।
তারা বলেন, আর্সেনিকযুক্ত পানি পরিশোধিত করে ব্যবহার করা উত্তমপন্থা হলেও এসব প্রযুক্তি বেশ ব্যয়বহুল। আর্সেনিকে আক্রান্তের সংখ্যা দিনদিন বাড়লেও এখন পর্যন্ত অন্য কোন পন্থায় এই জটিল সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়নি। যার কারনে বাংলাদেশে আর্সেনিক আক্রান্তের সংখ্যা স্থিতিশীল রাখা যাচ্ছে না।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর গবেষকদের তথ্যকে অমূলক বলছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ফিরোজ আহমেদ। তিনি বলেন, আর্সেনিক ঝুঁকির শিকার মানুষের সংখ্যা দুই কোটি পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু তাদের সবার মৃত্যুর আশঙ্কা নেই।
মার্কিন গবেষক দলের আর্সেনিকবিষয়ক গবেষণা প্রতিবেদনটি শনিবার বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় স্বাস্থ্য ও রোগবিষয়ক জার্নালের অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত হয়।
গবেষকদলের নেতা ও শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল সেন্টারের ড. হাবিবুল আহসান সাংবাদিকদের জানান, উচ্চ মাত্রার আর্সেনিক দূষণের কারণে বাংলাদেশের এক কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। আর্সেনিক দূষণের শিকার মানুষের আগাম মৃত্যু ঠেকাতে হলে শিগগিরই বিকল্প উপায়ে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করতে হবে।
গবেষণা প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয় যে, বাংলাদেশে ১০ বছরে আর্সেনিক দূষণের ফলে মৃত্যুহার ২০ শতাংশ বেড়েছে।
এদিকে গত বছর ইউনিসেফ পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, সারাদেশে এখনও ১৩ শতাংশ মানুষ দূষণযুক্ত পানি ব্যবহার করছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ তৈরি করতে গিয়ে যে অসংখ্য পুকুর ও ডোবা সৃষ্টি হয় তা থেকে পানি এসে টিউবওয়েলের পানির সরবরাহে মেশার কারণে টিউবওয়েলের পানি আর্সেনিক-দূষিত হচ্ছে। যে কারনে এ প্রবণতাটা কমানো সম্ভব হচ্ছে না।
ওয়াটার এইডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ আর্সেনিকযুক্ত পানি ব্যবহারের কারনে হুমকির মুখে। এবং ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৯টি আর্সেনিকের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত।
বাংলাদেশের বিভিন্ন গবেষণার ফল পর্যবেক্ষনে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি লোক আর্সেনিক ঝুঁকির মুখে।
বাংলাদেশের আর্সেনিক দূষণ সম্পর্কে আর্সেনিক বিশেষজ্ঞ ও পশ্চিমবঙ্গের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দীপঙ্কর চক্রবর্তী মনে করেন, বাংলাদেশে আর্সেনিক দূষণের মাত্রা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এ ব্যাপারে তাদের ভূমিকার কথা স্বীকার করেনি। এটিকে একটা বড় সমস্যা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যেসব আর্সেনিক আক্রান্তের সাক্ষাৎকার তারা গ্রহণ করেছিলেন ১৫ বছর পর দেখা গেছে তাদের মধ্যে ৩০ শতাংশের ত্বকে ক্যান্সার দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশে জাতিসংঘ প্রধান রেনাটা লক ডেসালিয়েন মনে করেন, আর্সেনিকমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতি এখানকার মানুষের আবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। আর্সেনিক মনিটরিং ও নিবৃত্তি চেষ্টাকে জোরদার করা এবং বর্ধমান হুমকি মোকাবেলায় সমন্বিত গবেষণা চালানোয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত চেষ্টা নেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
|