দেশের সব খবর আমার পরিবেশ হেলথ পলিটিক্স ফার্মাসিউটিক্যালস আমার বিনোদন বিউটি এন্ড ফিটনেস আমার ডাক্তার

এইডস ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

এইডস প্রতিরোধে করণীয়:

ব্যক্তিগত পদক্ষেপ, স্বামী বা স্ত্রী ছাড়া অন্য কোন নারী বা পুরুষের সঙ্গে দৈহিক মিলন অনুচিত।

সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ মেনে চলা উচিত ।

বিবাহ বহির্ভূত যৌনমিলনে কনডম ব্যবহার করা উচিত।

সাবধাণতার অংশ হিসেবে অপরের দাড়ি কামানোর ব্লেড, ক্ষুর ব্যবহার করা উচিত নয়। এইডস আক্রান- মহিলাদের গর্ভধারণ করা অনুচিত।

রক্ত গ্রহণ করার পূর্বে এইচআইভি পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত।

ছাড়া প্রত্যেকের জন্য আলাদা সুঁচ ও সিরিঞ্জ ব্যবহার করা উচিত।

বিশ্বে এইচআইভি বহনকারীর সংখ্যা ৬০ মিলিয়ন:

পৃথিবীতে এইডসের জীবাণু বহনকারী লোকের সংখ্যা বেড়েই চলছে। প্রতিদিন নতুন করে ১৪হাজার লোক নতুন করে এইডসে আক্রান্ত হচ্ছে। তার মধ্যে শতকরা ৯৫ভাগ উন্নয়নশীল বিশ্বে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা সারা পৃথিবীতে প্রায় চার কোটির বেশি মানুষ এইডসের জীবাণু বহন করছে। সমপ্রতি জাতিসংঘের এইডস বিষয়ক প্রতিবেদনে জানানো হয় যে, বিশ্বে প্রায় ৪ কোটি ৩ লাখ লোক তাদের দেহে এইচআইভি ভাইরাস বহন করছে। প্রতিবেদনে দেখা যায় আফ্রিকা ও সাব সাহারা দেশসমুহে এখনো এইডসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি। বিশ্বের এইচআইভি বহনকারী মানুষের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশই বসবাস করছে সাব সাহারার দেশসমুহে।

বাংলাদেশে এইডস:

এইচআইভি এবং এইডস বাংলাদেশসহ বর্তমান বিশ্বে একটি মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। কোন কোন দেশে এটি মহামারি আকারে রূপ নিয়েছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত, মায়ানমার, থাইল্যান্ডসহ বেশকিছু দেশে এইচআইভি/এইডস-এর ব্যাপকতা বা বিস্তৃতি দেখা দিয়েছে ভয়াবহ আকারে। সেই দিক বিবেচনা করলে বাংলাদেশ কোনভাবেই বিপদমুক্ত নয়, বরং বলা যায় এইচআইভিতে উচ্চমাত্রার ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশ। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত এইচআইভি এইডসে আক্রান্তের সংখ্যা ১৩ হাজারের বেশি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ১৯৮৯ সালে একজন পুরুষের শরীরে এইচ.আই.ভি ভাইরাস পাওয়া যায়৷ ১৯৯১ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ জনে। এর মধ্যে দুজন ছিলেন নারী৷ তারপর থেকে প্রতি বছরই এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে৷ বর্তমান সময়ে এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের বয়স পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বেশির ভাগ আক্রান্ত ব্যক্তির বয়সই ১৯-২৪ বছরের মধ্যে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা পাশাপাশি বাংলাদেশে যে সকল বেসরকারী সংস্থা এইডস নিয়ে কাজ করে তাদের মধ্যে ইনজেন্ডার হেলথ ইউএসএইড প্রশিকা, ইউএনএফপিএ সহ বেশ কটি দেশী-বিদেশী এনজিও প্রধান। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ১০ থেকে ১৯ বছরের সবাই কিশোর-কিশোরী।বয়ঃসন্ধিকালবাকৈশোরকালেতাঁদেরশরীরওমনেঅনেকপরিবর্তনআসে।এ সময় তাদের অনেকে কী করবে বুঝে ওঠতে পারে না। নিজের খেয়াল খুশি মত চলতে চায় সবসময়। এ সময় কারো কারো অনেক বন্ধু-বান্ধব তৈরি হয় এবং তাদের সাথে মেলামেশাও বেড়ে যায় অস্বাভাবিকভাবে। বন্ধু-বান্ধবের চাপে পড়ে মাদকদ্রব্য গ্রহণ, বিয়ের আগে যৌনমিলন ইত্যাদি ঝুঁকিপূর্ণ আচরণে লিপ্ত হওয়ার ঘটনাও স্বাভাবিকতায় রূপ নেয় কারো কারো ক্ষেত্রে। এইচআইভি সংক্রমণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীরা অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর পেছনে যে কারণগুলো মূলত দায়ী সেগুলো হলো- দেশে বিরাজমান আর্থসামাজিক কাঠামোতে নারীর দুর্বল অবস্থান, প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষার অভাব, অল্প বয়সে বিয়ে, পুরুষের আধিপত্য, নারী পুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নারীদের গৌণ ভুমিকা, অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক স্থাপনে নারীদের বাধাদানের ক্ষমতার অভাব, যৌন কৌতূহল ও অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক, নারী ও শিশু পাচার ইত্যাদি। দেশের বড় শহরগুলো ছাড়া এইচ.আই.ভি ভাইরাস পরীক্ষার তেমন কোন সুযোগ সুবিধা না থাকায় বাংলাদেশের শহর থেকে বিছিন্ন তুলনামূলকভাবে বড় হাসপাতালগুলোতে অনেক সময় অনিরাপদ রক্ত সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি দারিদ্রক্লিষ্ট বাংলাদেশে প্রতিবন্ধিতা একটি প্রকট সমস্যা হিসেবে আবির্ভুত হচ্ছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে দেশে বর্তমানে মোট জনসংখ্যার মধ্যে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা ১০ ভাগ। বিভিন্ন সংস্থার জরিপ মতে, বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৫.৬ শতাংশ হিসেবে দেশে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা ৭০ লাখেরও
WHO এর মতে দেশে এইডস আক্রান্তের হিসাব বেশি। যার মধ্যে ১৪ শতাংশ ভূমিহীন এবং ৭০ শতাংশেরও বেশি নিরক্ষর। শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতাজনিত কারণে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের পক্ষে যে কোন তথ্য বোঝা সম্ভব হয় না। তাই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সামপ্রতিক তথ্য সম্পর্কে অবগত হওয়া সম্ভব হয় না তাদের পক্ষে।
সারা বাংলাদেশের মধ্যে চট্টগ্রাম ও সিলেটাঞ্চল সহ সীমান্তের জেলাসমূহে এইডস তুলনামূলকভাবে জটিল আকার ধারণ
WHOএর মতে দেশে এইডস আক্রান্ত মৃত্যুর হিসাব করেছে। চট্টগ্রামের বিদেশী পন্যবাহী কার্গোর শ্রমিকরা স্থানীয় পতিতাদের সাথে দৈহিক মিলনের মাধ্যমে এইচআইভি ভাইরাস ছড়াচ্ছে। তাছাড়া ট্রাক ড্রাইভার ও তাদেরর সাঙ্গপাঙ্গদের অনিরাপদ যৌনাচারের মাধ্যমে এইডস ছড়াচ্ছে। সবচেয়ে হুমকির মধ্যে থাকা অন্য একটি অঞ্চল হচ্ছে সিলেট। এইডস রোগী ধরা পড়ার পর এ পর্যন্ত সিলেটে ৯১ জন মারা গেছেন। সেখানে মুমূর্ষ আরো ২৮২জনের চিকিৎসা চলছে। এছাড়া স্থানীয় হোটেলে যৌন কর্মীরা এইডস ছড়িয়ে থাকে। যশোরের বেনাপোল সীমান্তেও ট্রাক ড্রাইভারদের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে এইডস ছড়াচ্ছে। অন্যান্য শহরের তুলনায় ঢাকা শহরের মাদকাসক্ত তরুণদের বিরাট অংশ ইঞ্জেকশানের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ করে। পাশাপাশি মদ কিনতে তারা রক্ত বিক্রি করে বলে রক্ত ও ইঞ্জেকশানের মাধ্যমে এইডস ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞদের মতে ১৫কোটির জনগনের এই দেশে অন্যান্য দেশের তুলনামূলকভাবে এইচআইভি কম ছড়াচ্ছে। তবে এইডস সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পেশাদার যৌন কর্মী, যৌন বাহিত বিভিন্ন রোগ ব্যাধী, কনডম ব্যবহার না করা, পেশাদার রক্তদাতাদের মাধ্যমে বর্তমানে এইডস ছড়াচ্ছে।
এইডস সংক্রমণ রোধের লক্ষ্যে গত ১২ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সহযোগীতায় 'মধুমিতা' নামে নতুন একটি স্বাস্থসেবা উদ্যোগের কথা ঘোষণা করেছে স্থানীয় মার্কিন দূতাবাস। ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার ব্যয়সাপেক্ষ এই কর্মসূচির অধীনে বাংলাদেশে এইডস ঝুঁকির সম্মুখীন ২০ লাখ মানুষকে এইচআইভি প্রতিরোধ সেবা দেওয়া হবে। সূত্রে জানা গেছে, ফ্যামিলি হেলথ ইন্টারন্যাশনাল-এর সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা 'ইউএসএআইডি' এই প্রকল্পটি বাস-বায়ন করবে। ৫০টি স্বাস্থ্য কেন্দ্রের একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে 'মধুমিতা' কাজ করবে। এসব কেন্দ্র থেকে যৌনবাহিত সংক্রমণের জন্য স্বেচ্ছা পরামর্শ, এইচআইভি পরীক্ষা, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ সেবা দেওয়া হবে। শিরায় মাদক গ্রহণকারী, যৌনকর্মী ও তাদের গ্রাহক এবং এইচআইভি পজিটিভরা এই লক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত। স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা দেওয়া ছাড়াও এই কেন্দ্রগুলি শিরায় মাদক গ্রহণকারীদের পুনর্বাসন, সুস্থ্য হয়ে উঠছে এমন মাদক গ্রহণকারীদের চাকরির জন্য প্রশিক্ষণ প্রদান এবং এইচআইভি সম্পর্কে সচেতনতা প্রচার করবে।
এইডস প্রতিরোধে সমাজের সবর্স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধুমাত্র সরকার নয়; সাধারণ মানুষ, প্রতিটি পরিবার, সুশীল সমাজ সহ সবাইকে এইডস মোকাবিলায় উদ্যোগী হতে হবে ও নেতৃত্ব দিতে হবে। সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করা ছাড়া এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন।
আসুন এইডস সমন্ধে জানি, সামাজিক মূল্যবোধ মেনে চলি ও এইডস থেকে দূরে থাকি ।-জাফর সাদেক শিবলী