এইচ এম দিদার: ২০১৫ সালের মধ্যে আমাদের কে পুর্বনির্ধারিত সহস্রাদ্ধের লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জন করতে হবে। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় বলা হয়েছে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিশু বা নবজাতকের মৃত্যুর (০-৫ বছর) হার প্রতি হাজারে ৫০ জনে কমিয়ে আনা হবে । তবে বর্তমান ২০১০ সালে এসে এ অর্জনটি আমাদের জন্য অনেক কঠিন হয়ে পড়ছে।
২০০৭ সালের ইউএনডিপি’ র এক প্রতিবেদনে প্রকাশ বাংলাদেশে গত দশকের তুলনায় শিশু মৃত্যুহার অনেক কমে তা হাজারে ৬৫ জনে পরিবর্তিত হয়েছিল। কিন্তু সর্বশেষ সেভ দা ছিলড্রেন নামক এনজিও প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে প্রকাশ বাংলাদেশে প্রতিহাজারে এই মৃত্যু হার ৭৩। তবে ইউনিসেপের মতে এ সংখ্যা প্রায় ৬০। সামগ্রিকভাবে বলা চলে আমরা এখনো শিশু মৃত্যুহার প্রত্যাশিতভাবে কমাতে পারিনি। ইউএনডিপি’র মতে বাংলাদেশে প্রতিবছর এক লাখ ২০ হাজার নবজাতকের মৃত্যু ঘটে। এর মধ্যে জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় ৫০ শতাংশই মারা যায়।
শিশুমৃত্যুর জন্য কতকগুলো বিষয়কে এক্ষেত্রে দায়ী করা যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশ মতে নবজাতককে জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের প্রতিষেধক দিতে হবে। অথচ দেশে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের টিকা দেওয়া হচ্ছে শিশুর জন্মের ৪২ দিন পর। চিকিৎসকদের মতে ৭ দিনের মধ্যে টিকা না দিলে হয়তো বা এইচবি ভাইরাসে শিশুরা আক্রান্ত হতে পারে। সময়মতো টিকা না দেওয়ার কারণে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকছে দেশের শিশুরা। যা প্রভাব ফেলছে শিশু মৃত্যুহার রোধে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটে প্রকাশ, দেশে বছরে প্রায় ৪০ লাখ নারী গর্ভধারণ করে। আর এ সমস্ত নারীদের শতকরা ৩ দশমিক ৫ ভাগই হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে আক্রান্ত। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার গর্ভবতী নারী হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে আক্রান্ত। আক্রান্তদের কাছ থেকে নবজাতকের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা ৯০ ভাগ। সেক্ষেত্রে জন্মের প্রাথমিক সময়গুলোতে শিশুদেরকে টিকা দেয়ার ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা একমত।
বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকা দান কর্মসুচী (ইপিআই) একটি সফল চিকিৎসা কার্যক্রম। ২০০৪ সাল থেকে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের টিকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যার আওতায় শিশুকে ছয় সপ্তাহ বয়সে যক্ষ্মা, ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টঙ্কার, হুপিংকাশি, পোলিও এবং হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের প্রতিষেধক দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আজো সর্বত্র সচেতনতা আবার সহজলভ্যতার অভাবে নবজাতকে টিকা গুলো দেয়া সম্ভব হচ্ছেনা।
নবজাতকের মৃত্যুর পেছনে মায়ের অপুষ্টি, মাতৃকালীন সেবা গ্রহণে ক্লিনিকে যাওয়ার অপর্যাপ্ততা, জন্ম পরবর্তীতে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোতে অনীহা সহ প্রভৃতি কারণ দায়ী বলে চিকিৎসকদের অভিমত। এছাড়া বেশির ভাগ শিশুর মৃত্যু ঘটে ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত অসুস্থতার জন্য। সেভ দা চিলড্রেন ইউএসএ এর মতে এর জন্য নিউমোনিয়া, জন্মসংক্রান্ত জটিলতা ও অপুষ্টিই নবজাতক মৃত্যুর ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য বিষয়। সামগ্রিক ভাবে দেশের নবজাতকের মৃত্যুহার ২০১৫ সালের মধ্যে অর্জন অনেকাংশে দুরুহ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সাফল্য পেলেও নবজাতকের মৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে এগোতে পারেনি। জন্মের প্রথম ২৮ দিনে নবজাতকের মৃত্যুর হার কমাতে না পারলে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যের চার নম্বর ধারা অর্জনে ব্যর্থ হবে বাংলাদেশ। তাই এটি বাংলাদেশের জন্য একটি চ্যালেন্জও বটে। আর এ চ্যালেন্জ মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হলে ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার স্বপ্নও হবে অলীক। |