
রোগ হলে প্রয়োজন চিকিৎসা, আর চিকিৎসার জন্য যেটি সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন সেটি হল ওষুধ। চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ওষুধে ভেজাল থাকার কারনে সারাদেশে প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। জীবনরক্ষার নামে নকল, ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে বাজার ছেয়ে গেছে। নকল ও ভেজাল ওষুধ বাজারজাত করায় শুধু জটিল রোগ-ব্যাধি নয়, ঘটছে মৃত্যুর মতো ঘটনাও। সারাদেশে ২৪৬টি ওষুধ কোম্পানি প্রায় ২০ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ উৎপাদন করছে। এর মধ্যে অধিকাংশ ব্র্যান্ডের ওষুধই ওষুধ প্রশাসনের কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই অবাধে বাজারে বিক্রি হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ফার্মাসিউটিক্যাল সোসাইটির সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আ ব ম ফারুক জানান, দেশে বছরে ওষুধ বিক্রি হচ্ছে ৫ হাজার কোটি টাকার। এর মধ্যে আড়াইশ কোটি টাকার ওষুধ ভেজাল হচ্ছে। ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কোম্পানিই ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ তৈরি করছে।
ওষুধের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ৮ থেকে ১০ টাকার জন্মনিয়ন্ত্রক ওষুধ ডিপো-প্রোভেরার কর্ক ও লেবেল বদলে ৮০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে ভেজাল ডিপোমেট্রাল। নকল করা হচ্ছে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত রোগে ব্যবহার করা কেভিনটল ট্যাবলেট। নকল কাঁচামাল দিয়ে তৈরি হচ্ছে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ হাইড্রোকরটিসন ইনজেকশন। নকল হচ্ছে অসটিওআর্থ্রাইটিস রোগীদের জন্য ব্যবহৃত মিথাইল প্রেডনিসোলন গ্রুপের একটি ইনজেকশন। এ ছাড়া বিভিন্ন তরল ওষুধেরও নকল হচ্ছে অহরহ। বাজারে অবাধে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন নিষিদ্ধ ওষুধও। জ্বরের ওষুধ চাইলেই দেওয়া হচ্ছে উৎপাদন নিষিদ্ধ ওষুধ নিমোসুলাইড। আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ রফিকেক্সিব গ্রুপের ওষুধও বিক্রি হচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, এসব ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় প্রাণহানিরও আশঙ্কা রয়েছে। মাত্র ৩০ টাকা মূল্যের অ্যান্টিবায়োটিক এমোক্সিসিলিন ড্রাই সিরাপের বোতলে দামি অ্যান্টিবায়োটিক ড্রাই সিরাপের লেবেল লাগিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে বেশি দামে। নকল হচ্ছে যক্ষ্মা রোগের ওষুধ রিফিমপিসিন ট্যাবলেট। বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, এ ট্যাবলেটের মধ্যে রাসায়নিক কোনো উপাদান নেই। শুধু ময়দা দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে এ ওষুধ। এছাড়া জীবন রক্ষাকারী আরও বেশকিছু নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের উপাদানে তৈরি ওষুধ বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে আছে ক্যানিকিড ইনজেকশন, ইনফেরন ইনজেকশন, হিমোগ্গ্নোবিন সিরাপ, ট্রাইডাল ইনজেকশন, জেনটোসিনাস ইনজেকশন, গ্রাইপ ওয়াটার সিরাপ, ভেনটোলিন, মাইসেফ, ডাইক্লোফেনাক, বেটনোবেট, মেথারজিন ট্যাবলেট, ইনসুলিন, নিউরোবিয়ান, বিটেক্স, রেনিটিডিন, জেনটামিনসহ বিভিন্ন মোড়কের সিরাপ ও ক্যাপসুল।
বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি এবং বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস প্রেসিডেন্ট সালমান এফ রহমান বাজারে নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ বিক্রি হচ্ছে স্বীকার করে বলেন, ভেজাল ওষুধ খেয়ে অনেক মানুষও মারা গেছে। তবে এ কাজের সঙ্গে যারা জড়িত তারা কেউই ওষুধ শিল্প মালিক সমিতির সদস্য নয়। প্রতিটি সদস্য প্রতিষ্ঠানের ওষুধের মান ঠিক রাখার ব্যাপারে আমরা সচেতন। তিনি বলেন, এ ধরনের ওষুধ বিক্রি বন্ধ করতে হলে সরকারকে কঠোর হতে হবে। দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে অবৈধ ফার্মেসি। মোটা অঙ্কের মুনাফার আশায় এসব ফার্মেসিতে নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ বিক্রি বন্ধ করতে ওষুধ প্রশাসনে বেশ কয়েকবার আবেদন করেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বেসিক সায়েন্স অনুষদের ডিন ও বায়ো-কেমিস্ট্রি বিভাগের চেয়ারম্যান, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সেলান বলেন, সরকার ওষুধ প্রশাসন পরিদফতরকে অধিদফতর করেছে এটা প্রশংসার। কিন্তু কাগজে-কলমে করলেই হবে না। এ জন্য কাজ করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরেই দেশে ওষুধই ভেজাল হচ্ছে। অথচ ভেজাল প্রতিরোধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ওষুধের মান উন্নয়ন ও গুণগতমান নিয়ন্ত্রণের জন্য উন্নত ও সম্প্রসারিত ড্রাগ টেস্টিং ল্যাব স্থাপন করা অতি জরুরি।
ওষুধে ভেজাল প্রতিরোধে সরকার উদ্যোগ নেবে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক বলেন, ওষুধে ভেজাল তো হচ্ছেই, তা আবার বিক্রিও হচ্ছে। কিছু অসাধু ব্যক্তি এমন করছে। পুরো সমাজই আসলে ভেজালে ভরে গেছে। ওষুধ সেক্টরের ভেজাল প্রতিরোধে ওষুধ প্রশাসনে নতুনভাবে লোক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। সব কার্যক্রম জোরদার করতে কাজ চলছে। দেখা যাক কতটা সফল হওয়া যায়।
|