|
  
|
আজ মহান স্বাধীনতা দিবস: প্রতিষ্ঠা হোক সমৃদ্ধ স্বাধীনতা এইচ এম দিদার: আজ ২৬ মার্চ।
মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। এবার পার হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৩৯ বছর। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কবল থেকে মুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে বীর বাঙালি সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা করে। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদাররা পরাজিত হয় এবং বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতারা কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের চেষ্টা করেও বার বার ব্যর্থ হন। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের ১৬২ আসনের মধ্যে ১৬০টি ও প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। এর মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাকিস্তান রাষ্ট্রের ক্ষমতা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে, পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এ নির্বাচনে অপেক্ষাকৃত কম আসনে জয় পেয়েও ক্ষমতা ভাগাভাগির নানা কৌশল আঁটতে থাকেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানও এ কৌশলে ইতিবাচক ভূমিকা রাখেন। দীর্ঘ বিলম্বের পর ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। হঠাত্ ১ মার্চ দুপুরে কোনো কারণ ছাড়াই পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন প্রেসিডেন্ট।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ফুঁসে ওঠে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ সাধারণ জনগণ। ১ মার্চ থেকেই রাজপথে নেমে আসেন তারা। ২ মার্চ উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা। ৩ থেকে ৬ মার্চ প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত গোটা প্রদেশে হরতাল পালিত হয়। সংগ্রামী ছাত্ররা ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মানচিত্রসহ স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। ৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বজ্রকণ্ঠে সাত-দফা ঘোষণা করেন। সামরিক আইন ও সেনাবাহিনী প্রত্যাহার, গণহত্যার তদন্ত এবং জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হইলে পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের প্রশ্ন বিবেচনা করা যাইতে পারে, তাহার পূর্বে নয়।’ এরপর ধারাবাহিকভাবে চলমান অসহযোগ আন্দোলনে ৯ মার্চ মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পল্টনের এক জনসভায় বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী অপেক্ষা বাংলার নায়ক হওয়া অনেক গৌরবের।’ শাসনতান্ত্রিক সঙ্কট প্রশ্নে ১৬ মার্চ প্রথম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান বৈঠকে বসেন। রাজনৈতিক সঙ্কট উত্তরণে ২২ মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়া-ভুট্টো শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপর পূর্ব ঘোষিত ২৫ মার্চের জাতীয় পরিষদের সভা স্থগিত করা হয়।
দীর্ঘ আলোচনার পর ২৪ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সমঝোতার আভাস দেন। সংবাদ সম্মেলনে শেখ মুজিব বলেন, ‘ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে আমরা মতৈক্যে পৌঁছেছি। আমি আশা করি, প্রেসিডেন্ট এখন তা ঘোষণা করবেন।’ এর আগে শেখ মুজিব ও ইয়াহিয়া কয়েকটি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছান। এগুলো ছিল সামরিক আইন প্রত্যাহার, প্রেসিডেন্টের ঘোষণা অনুযায়ী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর, ইয়াহিয়া খান অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি থাকবেন এবং কেন্দ্রীয় সরকার তার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সংসদ সদস্যদের জন্য পৃথক অধিবেশন বসবে এবং শাসনতান্ত্রিক আলোচনার জন্য পরবর্তীকালে একসঙ্গে বসে জাতীয় সংসদে সংবিধানের খসড়া তৈরি করা হবে। বঙ্গবন্ধুর চার দফার আলোকে ভুট্টোর দেয়া প্রস্তাবও ছিল এমনই।
২৫ মার্চ দিনব্যাপী ঢাকা শহরে চলে প্রতিবাদ মিছিল, রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি এবং বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ চলে মুক্তিপাগল মানুষের সঙ্গে সেনাবাহিনীর জওয়ানদের। সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। এদিন রাত ১১টার পর থেকে অপারেশন সার্চলাইট শুরু করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। পাকবাহিনী রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা, ইপিআর সদর দফতর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পুরো ঢাকা মহানগরীতে হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং অগ্নিসংযোগ করে।রাত ১টা ১০ মিনিটের দিকে একটি ট্যাংক, একটি সাঁজোয়া গাড়ি এবং কয়েকটি ট্রাক বোঝাই সৈন্য শেখ মুজিবের বাড়ির ওপর দিয়ে গুলি ছুড়তে ছুড়তে রাস্তা ধরে এগিয়ে আসে এবং তাকেসহ ৪ জন চাকর এবং একজন দেহরক্ষীকে গ্রেফতার করে।
রাত তিনটার দিকে চট্টগ্রাম থেকে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন মেজর জিয়া। ১৯৭১-এর ২৬ মার্চ থেকে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয়েছিল মহান বিজয়। বিশ্ব মানচিত্রে ঠাঁই করে নেয় বাংলাদেশ নামের ভূখণ্ডটি।ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতার লাল সূর্য। বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং দীর্ঘ নয় মাস সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় আমাদের মহান স্বাধীনতা। স্বাধীনতার মূল লক্ষ্যে পৌঁছাতে আমাদের আরও অনেকদূর যেতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন দলমত নির্বিশেষে সবার ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস। তাহলেই হয়তো আমরা একটি সমৃদ্ধ স্বাধীনতা পাবো। প্রতিটি মানুষ তাদের রক্তস্নাত স্বাধীনতার সুফল ভোগ করবে। খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা সহ প্রত্যেকটি প্রয়োজন জনগন পুরণে সক্ষম হবে। |
উত্তাল ২৫ মার্চ : আজ সেই ভয়াল কালরাত
আজ বাঙালী জাতির ইতিহাসে এক নৃশংস, ভয়ঙ্কর ও বিভীষিকাময় কালরাত্রি। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক কলঙ্কিত দিন। একাত্তরের অগ্নিঝরা এদিনে বাঙালী জাতি তথা বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছিল ইতিহাসের জঘন্যতম নৃশংসতা। একাত্তরের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে রাতের অন্ধকারে পাক বাহিনী এক দানবীয় নিষ্ঠুরতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত বাঙালীর ওপর। গণহত্যার নীলনকশা 'অপারেশন সার্চলাইট' নামে পাকিস্তানী দানবরা মেতে ওঠে নির্বিচারে স্বাধীনতাকামী বাঙালী নিধনযজ্ঞে। ঢাকাসহ দেশের অনেক স্থানে মাত্র এক রাতেই হানাদাররা নির্মমভাবে হত্যা করেছিল প্রায় অর্ধলৰাধিক ঘুমন্ত বাঙালীকে।
বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে নিষ্ঠুর, নির্মম ও বর্বরোচিত গণহত্যা চালিয়েছিল পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা। একাত্তরের এদিনে চির আকাঙ্খিত ও প্রিয় স্বাধীনতার জন্য উন্মাতাল লাখো বাঙালীর রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল বাংলার মাটি। ঘুমন্ত শিশু, বধূ, বৃদ্ধার রক্তে কলঙ্কিত হয় মানব ইতিহাস। সেই নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতা চেঙ্গিস খান-হালাকু খানদের নৃশংস নির্মমতাকেও হার মানায়।এ রাত একদিকে যেমন বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মমুহূর্তটি প্রত্যক্ষ করেছিল, অন্যদিকে এ রাতেই সূচিত হয়েছিল জঘন্যতম গণহত্যা। ন'মাসে স্বাধীনতার জন্য মূল্য দিতে হয়েছিল ৩০ লাখ মানুষকে। স্বাধীনতার জন্য সম্ভ্রম হারাতে হয়েছিল অসংখ্য মা-বোনকে। মাত্র নয় মাসে এত বিপুলসংখ্যক মানুষ হত্যা ও নারী নিগ্রহের নজির বিশ্ব ইতিহাসে আর নেই।
কী ঘটেছিল সেই ভয়াল রাতে। সূর্য ডুবল। পাঁচটা বেজে চুয়াল্লিশ। ঠিক এক মিনিট পরেই ঢাকার প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে জেনারেল ইয়াহিয়া সোজা এয়ারপোর্ট চলে গেলেন। এর আগেই বঙ্গবন্ধু-ইয়াহিয়া সিরিজ বৈঠক ব্যর্থ হয়ে যায়। পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট বিমানে করাচী পাড়ি দিলেন। শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ এড়িয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বাঙালী হত্যার নীলনকশা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়ে পালালেন।
কৃষ্ণপক্ষের রাত। সারাদিন ধরে রোদেপোড়া নগরী চৈত্রের হাওয়ায় জুড়িয়ে আসছিল। তারপর দুই ঘণ্টাও যায়নি। ক্যান্টনমেন্ট থেকে জীপ, ট্রাকবোঝাই দিয়ে সৈন্য ট্যাঙ্কসহ অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র নিয়ে সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ছে। তারা ছক অনুযায়ী পজিশন নিচ্ছে। গোলান্দাজ, সাঁজোয়া পদাতিক তিন বাহিনী থেকে বাছাই তিন ব্যাটালিয়ন ঘাতক।
রাত ১০টা ৩৫। নর্থ ঢাকায় সৈন্যরা ইন্টারকন্টিনেন্টাল বর্তমানে শেরাটন হোটেল ঘিরে ফেলেছে। ডিসিপশনে কালো বোর্ডে চকখড়ি দিয়ে একজন বাচ্চা ক্যাপ্টেন লিখে দিল বাইরে বেরুলেই গুলি। বিদেশী সাংবাদিকরা বেরোতে না পেরে রেডিও ধরলেন। না কার্ফুর কোন ঘোষণা নেই। বাইরে ট্যাঙ্কের শব্দ। ছুটে সবাই ১২ তলায় উঠলেন। মেশিনগানের গুলিতে কানপাতা দায়। ভুট্টোর ঘরের দরজায় গিয়ে সবাই থমকে দাঁড়ালেন। কড়া পাহারা। কাঁচা ঘুমে জাগানো বারণ। ঢাকা-করাচী টেলিপ্রিন্টার লাইনও কেটে দেয়া হয়েছে। বাইরের পৃথিবী থেকে ঢাকা বিচ্ছিন্ন। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বেতারের প্রচারও। কেউ জানতেই পারেনি ততক্ষণে খুলে গেছে নরকের দরজা।
'অপারেশন সার্চলাইট' নামে হানাদার বাহিনীর সেই বর্বরোচিত হামলায় সবাই হতবাক হয়ে যায়। মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকে মার্কিন ট্যাঙ্ক, সঙ্গে সেনাবোঝাই লরি। ইকবাল হল (বর্তমানে জহুরুল হক হল) ও জগন্নাথ হলে মধ্যযুগীয় কায়দায় চলে পাকিস্তানী হানাদারদের নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ। রক্তের হোলিখেলায় মেতে ওঠে মানুষরূপী নরপিশাচরা। অসহায় নারী-পুরুষের মর্মান্তিক আর্তনাদ। চলল বর্বরোচিত নিধনযজ্ঞ আর ধ্বংসের উন্মত্ত তান্ডব। প্রতিটি রুমে রুমে ঢুকে ঘুমন্ত ছাত্রদের গুলি করে হত্যা করে পাক জল্লাদরা। একে একে গুলি করে, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে জগন্নাথ হলের ১০৩ ছাত্রকে। হলের কর্মচারীদের কোয়ার্টারে ঢুকে তাদের স্ত্রী-বাচ্চাসহ পুরো পরিবারকে একে একে নির্মমভাবে হত্যা করে।
ওই রাতে মানুষরূপী ক্ষুধার্ত শকুনীরা শুধু হত্যা করেই ক্ষ্যন্ত হয়নি। পাক জান্তা সেই রাতে বাবার সামনে মেয়েকে আর ছেলের সামনে মাকে ধর্ষণের পর হত্যা করে। কাউকে কাউকে তারা সেদিন বাঁচিয়ে রেখেছিল নিহতদের কবর খোঁড়ার কাজ করতে। মাথায় বন্দুকের নল ঠেকিয়ে তাদের বাধ্য করে প্রিয়জনের কবর খুঁড়তে। তাদের দিয়েই একে একে সহপাঠীদের লাশ টানিয়ে এনে মাটিচাপা দিয়েছিল পাক সেনারা। তারপরও শেষ রক্ষা হয়নি। কাজ শেষে তাদের লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করা হয়।
সেদিন রাতে একযোগে জগন্নাথ হল ছাড়াও ইকবাল হল, রোকেয়া হলে শকুনীর দল একে একে দানবের মতো হিংস্র থাবায় তছনছ করে দিয়েছিল। পাক জান্তার কালো থাবা থেকে রক্ষা পায়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য. ড. মনিরুজ্জামানসহ বিভিন্ন বিভাগের নয় শিক্ষককে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। হানাদাররা চলার পথে রাস্তার দুই পাশে ব্রাশফায়ার করে মেরে ফেলে অসংখ্য নিরীহ, গরিব মানুষকে। মেডিক্যাল কলেজ ও ছাত্রাবাসে গোলার পর গোলা ছুড়ে হত্যা করা হয় অসংখ্য মানুষকে।
চারদিক রক্ত আর রক্ত, সারি সারি শহীদের লাশ। সেদিন হিংস্র শ্বাপদ পাক বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পেতে রোকেয়া হলের ছাদ থেকে প্রায় ৫০ ছাত্রী লাফ দিয়ে পড়েছিল। নরপশুরা সেদিন হত্যার পাশাপাশি ধর্ষণ, লুট, জ্বালাও-পোড়াও প্রত্যক্ষ করেছিল শহরের সব জায়গায়। সেই রাতে রাজারবাগ পুলিশের সদর দফতরে পাকসেনাদের সাঁড়াশি অভিযানের মুখেও বাঙালী পুলিশ সদস্যরা আত্মসমর্পণের বদলে রাইফেল তাক করে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। কিন্তু শত্রুর ট্যাঙ্ক আর ভারি মেশিনগানের ক্রমাগত গুলির মুখে মুহূর্তেই গুঁড়িয়ে যায় সমস্ত ব্যারিকেড। গ্যাসোলিন ছিটিয়ে আগুনে ভস্মীভূত করা হয় পুলিশের সদর দফতর। সে রাতে ১১শ' বাঙালী পুলিশের রক্ত ঝরিয়েও তারা ক্লান্ত হয়নি, গুঁড়িয়ে দেয় পুরো ব্যারাক, জ্বালিয়ে দেয় সবকিছু।
ঘটায় পৃথিবীর ইতিহাসের নিকৃষ্টতম, কাপুরোষচিত জগন্য ইতিহাস। ফলশ্রুতিতে আমরা পেয়েছি রক্তস্নাত স্বাধীনতা। |
উত্তাল ২৪ মার্চ: বিভিন্ন স্থানে হাজারো মুক্তিকামী জনতা পাকসেনাদের গুলিতে নিহত
পাকিস্তান সব নিয়ন্ত্রণই হারায় দেশে। সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু আর অস্ত্রের আঘাতকে তুচ্ছ করে স্বাধীনতার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ গোটা জাতি। রক্তঝরা একাত্তরের এদিনেই সৈয়দপুরসহ বিভিন্ন স্থানে অবাঙালীদের সঙ্গে নিয়ে ঘাতক পাকবাহিনী নির্বিচারে গুলি চালিয়ে কমপক্ষে ৩ শতাধিক বীর বাঙালীকে হত্যা করে তবুও স্বাধীনতার প্রশ্নে অকুতোভয় মুক্তিকামী জনতা। একাত্তরের এদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে বিভিন্ন সময় সমাগত মিছিলকারীদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিরামহীন ভাষণ দেন।
বঙ্গবন্ধু দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা দেন 'আর আলোচনা নয়, এবার ঘোষণা চাই। আগামীকালের মধ্যে সমস্যার সমাধান না হলে বাঙালীরা নিজেদের পথ নিজেরা বেছে নেবে। আমরা সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ ঐক্যবদ্ধ। কোন ষড়যন্ত্রই আমাদের দাবিয়ে রাখতে পারবে না।' সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, বাংলার জনগণের ওপর কোন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া হলে তা বরদাশত করা হবে না।
২৩ মার্চ রাত থেকে ২৪ মার্চ সকাল পর্যন্ত পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী সৈয়দপুর সেনানিবাসের পার্শ্ববর্তী বোতলগাড়ী, গোলাহাট ও কুন্দুল গ্রাম ঘেরাও করে অবাঙালীদের সঙ্গে নিয়ে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। এতে এক শ' নিহত এবং এক হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়। শহরে কার্ফু দিয়ে সেনাবাহিনীর সদস্য এবং অবাঙালীরা সম্মিলিতভাবে বাঙালীদের বাড়িঘরে আগুন দেয় ও হত্যার অভিযান চালায়।
রংপুর হাসপাতালের সামনে ক্রুদ্ধ জনতা ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানী সেনারা সেনানিবাস সংলগ্ন এলাকায় নিরস্ত্র অধিবাসীদের ওপর বেপরোয়াভাবে গুলিবর্ষণ করে। এতে কমপক্ষে ৫০ জন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়।
চট্টগ্রামে পাকিস্তানী সেনারা নৌবন্দরের ১৭ নম্বর জেটিতে নোঙ্গর করা এমভি সোয়াত জাহাজ থেকে সমরাস্ত্র খালাস করতে গেলে প্রায় ৫০ হাজার বীর বাঙালী তাদের ঘিরে ফেলে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা জাহাজ থেকে কিছু অস্ত্র নিজেরাই খালাস করে ১২টি ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়ার সময় জনতা পথরোধ করে। সেনাবাহিনী ব্যারিকেড রচনাকারী জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালালে ২শ' শ্রমিক শহীদ হন।
মিরপুরে অবাঙালীরা সাদা পোশাকধারী সেনাবাহিনীর সদস্যদের সহযোগিতায় বাঙালীদের বাড়িঘরের শীর্ষে ওঠানো বাংলাদেশের পতাকা ও কালো পতাকা নামিয়ে জোর করে তাতে আগুন দেয় এবং পাকিস্তানী পতাকা তোলে। রাতে বিহারীরা এখানে ব্যাপক বোমাবাজি করে আতঙ্কের সৃষ্টি করে।
টিভি কেন্দ্রে প্রহরারত সৈন্যরা টিভিকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করলে সন্ধ্যা থেকে ঢাকা টিভির কর্মীরা সকল ধরনের অনুষ্ঠান প্রচার থেকে বিরত থাকেন। স্বাধীন বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এক বিবৃতিতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে সশস্ত্র গণবিপ্লবকে আরও জোরদার করার জন্য সংগ্রামী বাংলার জনগণের প্রতি আহ্বান জানায়। সাংবাদিকরা জরুরী সভায় মিলিত হয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সেনাবাহিনী সদস্যদের হয়রানিমূলক আচরণের তীব্র নিন্দা জানান। |
উত্তাল ২৩ মার্চ: স্বাধীনতকামী মানুষ 'প্রতিরোধ দিবস' পালন করে
২৩ মার্চ, ১৯৭১। আন্দোলন, সংগ্রামের উত্তাল ঢেউ ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে শহর থেকে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছিল। ঢাকা নগরীও এদিন মিছিলে মিছিলে গর্জে উঠেছিল। একাত্তরের এই দিন সকালে আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সদস্যদের সামরিক কায়দায় অভিবাদন গ্রহণ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বাসভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। এ সময় 'জয় বাংলা, বাংলার জয়' উদ্দীপক গানটি সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হয়।
একাত্তরের মার্চের শুরুতে বঙ্গবন্ধুর ডাকা অসহযোগ আন্দোলন চলছিল পুরোদমে। সারাদেশেই এই অসহযোগ আন্দোলন পালিত হচ্ছিল। অপরদিকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পাকিস্তানী প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের বৈঠকের সমাধান হওয়ার কোন সম্ভাবনা দেখা না গেলেও জুলফিকার আলী ভুট্টো এ বৈঠককে 'উৎসাহব্যঞ্জক বৈঠক' বলে অভিহিত করেন।
ইয়াহিয়া খান এবং বঙ্গবন্ধুর প্রতিদিনের বৈঠকগুলো চলছিল কড়া নিরাপত্তার মধ্যে। যার ফলে বৈঠক সম্পর্কে চারিদিক রহস্য ঘনীভূত হচ্ছিল। বিভিন্ন পত্রিকাতে এ সময়ের বৈঠক নিয়ে নিবন্ধও লেখা হয়।
দিন যত যেতে থাকে বাঙালীরা ঠিকই বুঝতে পারে যে আলোচনায় কোন ফল আসবে না। তাই তারা প্রস্তুতি নিতে থাকে। অপরপক্ষে পাকিস্তানী স্বৈরাচার সরকারও তাদের ষড়যন্ত্র চালিয়ে যায়। এরই মধ্যে তারা নিজেদের মধ্যেই বাঙালীর ওপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিতে থাকে।
সমস্ত শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে একেকটি মিছিল এসে মিশে যাচ্ছিল আরও অনেক মিছিলের সঙ্গে। ঢাকা শহর এদিন মিছিলের নগরীতে রূপ নেয়। সারাদেশে আন্দোলনের ঢেউ ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। স্বাধীন বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদ একাত্তরের ২৩ মার্চ 'প্রতিরোধ দিবস' পালন করে।
এ উপলকে ঢাকায় ছিল গণআন্দোলনের প্রবল জোয়ার। রাজপথে লাঠি, বর্শা, বন্দুকের মাথায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে হাজার হাজার মানুষ 'জয় বাংলা' স্লোগানে ছিল উচ্চকিত। জনতা ভুট্টো ও সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধেও স্লোগান দেয়। হোটেল ইন্টারকনের সামনে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি, ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর কুশপুত্তলিকা দাহ করে বিক্ষুব্ধ বাঙালী।
কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও বাঙালী প্রাক্তন সৈনিকদের সমন্বয়ে গঠিত 'জয় বাংলা বাহিনী'র আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজ ও মহড়া আউটার স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়। জয় বাংলা বাহিনীর পাঁচ শতাধিক সদস্য প্যারেড করে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে যান। |
উত্তাল ২২ মার্চ: ক্রমশ রাজনৈতিক সংকট গভীর হচ্ছে
শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত স্বাধীনতার জন্য বাঙালী সংগ্রামে গর্জে ওঠে। যতই দিন গড়াচ্ছিল, রাজনৈতিক সঙ্কট ততই গভীরতর হচ্ছিল। ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে একাত্তরের ২২ মার্চের ঘটনাবলী সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ সকালে ঢাকায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করে বলেন, পাকিস্তানের উভয় অংশের নেতৃবৃন্দের মধ্যে আলোচনাক্রমে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের পরিবেশ সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টির জন্য ২৫ মার্চের অধিবেশন স্থগিত রাখা হয়েছে।
সকালে রমনার প্রেসিডেন্ট ভবনে পাকিসত্মানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো আলোচনা বৈঠকে মিলিত হন। এটি ছিল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর টানা ষষ্ঠ দফা বৈঠক। প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে নিজ বাসভবনে ফিরে আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, আমরা আন্দোলনে আছি এবং লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
দুপুরে প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে কড়া সামরিক প্রহরায় হোটেলে ফিরেই ভুট্টো তাঁর উপদেষ্টাদের নিয়ে বৈঠকে বসেন। এই বৈঠক শেষে ভুট্টোর নেতৃত্বে পাকিস্তান পিপলস পার্টি নেতৃবৃন্দ সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ভবনে যান। রাতে সেখান থেকে ফিরে ভুট্টো হোটেল লাউঞ্জে অনির্ধারিত এক সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেন, প্রেসিডেন্ট এবং আওয়ামী লীগ প্রধান বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনের লক্ষ্যে একটি সাধারণ ঐকমত্যে পোঁছেছেন। তবে এ ঐকমত্য অবশ্যই পিপলস পার্টির কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। পিপলস পার্টির অনুমোদন ছাড়া কোন সিদ্ধান্ত পশ্চিম পাকিস্তানীরা মেনে নিতে পারে না।
অসহযোগ আন্দোলনের ২১তম দিবস ছিল ২২ মার্চ। মোকাররম প্রাঙ্গণে শিশু-কিশোরদের এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে শিশু-কিশোররা বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করে। এদিকে পল্টন ময়দানে সশস্ত্র বাহিনীর প্রাক্তন বাঙালী সৈনিকরা এক সমাবেশ এবং কুচকাওয়াজের আয়োজন করেন।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান রাতে ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস উপলৰে প্রদত্ত এক বাণীতে বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মিলেমিশে এক সঙ্গে কাজ করার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। পাকিস্তান এখন এক ক্রান্তিলগ্নে উপনীত। গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পথে অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে গেছে। তবে আমরা যদি আমাদের লক্ষে অবিচল থাকি, তাহলে কোন কিছুই আমরা হারাব না। |
উত্তাল ২১ মার্চ : জুলফিকার আলী ভুট্টোর হঠাৎ করে ঢাকা সফর
উত্তাল-অগ্নিগর্ভ সারাদেশ। ইয়াহিয়ার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর বৈঠক ভেস্তে যাওয়ার পর বিদ্রোহে ফুঁসে ওঠে বাঙালী জাতি। ঢাকা শহরের মোড়ে মোড়ে স্বাধীনতাকামী বাঙালীদের মিছিল, সমাবেশ। দলে দলে সব ছুটছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে। বাঙালী বুঝতে পারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পাকিস্তানী প্রেসিডেন্টের বৈঠক ছিল প্রহসনমাত্র। পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানুষ সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে।
একাত্তরের এদিন সকালেই বঙ্গবন্ধু প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে পঞ্চম দফা বৈঠক করেন। চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ডে ন্যাপপ্রধান আবদুল হামিদ খান ভাসানী বিশাল এক জনসভায় পরিষ্কার ঘোষণা দেন, এসব আলোচনা করে কোন ফল আসবে না। এদেশের আজ কেউ আর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে মানে না।
অন্যদিকে এদিন সকালেই পাকিস্তানের পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো হঠাৎ করেই ঢাকায় আসেন। রাজনৈতিক নেতা হওয়া সত্ত্বেও সেদিন তার অভ্যর্থনার জন্য এয়ারপোর্টে কয়েকজন আমলা ছাড়া আর কেউ উপস্থিত ছিলেন না। ভুট্টো এ দেশে আসার প্রতিবাদে যোগ দিতে ঢাকা মহানগরীর রাজপথে যেন সবাই নেমে আসেন। মিছিল-মিটিংয়ের মাধ্যমে ভুট্টোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন মুক্তিপাগল বীর বাঙালী। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের আমন্ত্রণে ভুট্টো এ দেশে আসেন। দেশবাসী বুঝতে পারে এর পিছনে নিশ্চয় কোন ষড়যন্ত্র আছে। তারা নতুনভাবে প্রস্তুতি নিতে থাকে। সবকিছুর পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর ডাকা অসহযোগ আন্দোলন চলতেই থাকে।
দেশে একদিকে আলোচনা, অসহযোগ আন্দোলন চলছে অন্যদিকে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী তাদের ঘাঁটিগুলোকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে থাকে। প্রতিদিনই পাকিস্তান থেকে অস্ত্র-গোলাবারুদ, সৈন্য আসতে থাকে। আলোচনার আড়ালে তারা নিজেদের এ দেশের নিরীহ মানুষের ওপর হিংস্র জন্তুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য সেনা সদস্যদের প্রস্তুত করতে থাকে।
বাংলা নামের ভূখন্ড তখন তপ্ত। পেশাজীবী গ্রুপগুলো সভা, সমাবেশ, মিছিলে মুখর। সবার কণ্ঠে একটিমাত্র ধ্বনি, একক একটি উচ্চারণ- স্বাধীনতা। জয়দেবপুরে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী গুলি চালিয়েছে নিরীহ জনগণের ওপর। তার তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জে। মিরপুর, চট্টগ্রাম, পার্বতীপুর, সৈয়দপুরে বাঙালী-বিহারী দাঙ্গায় রক্তপাত হয়েছে। এদেশবাসী ক্ষুব্ধ। প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছে জাতির সত্তা ও চৈতন্য।এই প্রেক্ষাপটে এগিয়ে চলছিল রণপ্রস্তুতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে গণবাহিনীর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় কুচকাওয়াজ। মোটকথা, জাতি সেই উত্তাল সময়ে ছিল স্বাধীনতার জন্য উন্মুখ, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। |
উত্তাল ২০ মার্চ: কোন ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত মুক্তিকামী জনতা
১৫ তারিখ থেকে শুরু হওয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে পাকিস্তানী প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পথে। বন্ধ হয়ে যায় সমঝোতার সমস্ত পথ। সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনা ছাড়া বাঙালীর সামনে কোন পথ খোলা ছিল না। নরঘাতক জেনারেল টিক্কা খানরা গোপন বৈঠক করে নির্বিচারে বাঙালী নিধনে অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে।
যদিও চতুর্থ দফা বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু বলেন, আলোচনা আরও হবে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য আনা হচ্ছে- এই মর্মে জনৈক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, 'বাংলাদেশের সব খবর আমার জানা আছে। বাঙালী বুঝতে পারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইয়াহিয়া খানের আলোচনায় বসাটা ছিল সম্পূর্ণ লোক দেখানো, প্রহসন মাত্র। আলোচনার আড়ালে পাকিস্তানে স্বৈরশাসকরা বাঙালীদের স্বাধীনতার সমস্ত আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেয়ার কৌশলে ব্যস্ত ছিল। এরই মধ্যে পাকিস্তানী সামরিক জান্তারা নির্বাচনে বাঙালী নিধনে অপারেশন সার্চলাইটের সমস্ত পরিকল্পনা করে ফেলে। এদিন লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবদুল হামিল ও জেনারেল টিক্কা খানের এক বৈঠক থেকেই অপারেশন সার্চ লাইটের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়।
একাত্তরের ২০ মার্চ ছিল ঘটনাবহুল উত্তেজনাপূর্ণ একটি দিন। আন্দোলনে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু সংবাদপত্রে দেয়া এক বিবৃতিতে বলেন, 'একটি স্বাধীন দেশের মুক্ত নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য জনগণ যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত। তাই মুক্তির লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে এ সংগ্রাম চালিয়ে যেতে আমি বাংলাদেশের জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানাই। এবারের সংগ্রাম প্রতিটি শহর, নগর, বন্দর ও গ্রামে। আবালবৃদ্ধবনিতা বাংলাদেশের দাবির পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ, সারা বিশ্বের স্বাধীন জাতি কিভাবে স্বীয় লক্ষ্যপানে এগিয়ে যেতে পারে, বিশ্বের সামনে বাংলার মানুষ আজ তার উজ্জ্বল দৃষ্টানত্ম স্থাপন করেছে।
অসহযোগ আন্দোলনের ঊনবিংশ দিবসে একাত্তরের অগি্নঝরা এদিনই বঙ্গবন্ধু এক বিবৃতি দিয়ে ২৩ মার্চ লাহোর প্রস্তাব উপলক্ষে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেন। এদিন বিহারী ও পাক সেনাবাহিনীর সঙ্গে বাঙালীর সংঘর্ষ হয়েছে মিরপুর, চট্টগ্রাম, পার্বতীপুর ও সৈয়দপুরে। আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক।
সারাদেশে এক উত্তপ্ত পরিবেশ বিরাজ করতে থাকে। ক্ষুব্ধ বাঙালীরা পথে নেমে আসে। যুদ্ধের প্রস্তুতি চলতে থাকে দেশজুড়ে। কিন্তু তখনও পূর্ব পাকিস্তানবাসী বুঝতে পারেনি যে অতর্কিতেই তাদের ওপর চালানো হবে অপারেশন সার্চলাইট। জেনারেল ইয়াহিয়া খান এদিন তার সামরিক উপদেষ্টা জেনারেল হামিদ খান, টিক্কা খান, জেনারেল পীরজাদা, জেনারেল ওমর প্রমুখকে নিয়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে সামরিক প্রস্তুতির পূর্ণ রূপ দেন। |
উত্তাল ১৯ মার্চ :পাক সেনাদের অতর্কিত হামলায় নিহত হয় বেশ কযেকজন বাঙ্গালী সৈনিক
একেকটি দিন যেতে থাকে আর দেশব্যাপী উত্তেজনা বাড়তে থাকে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আলোচনা চলতে থাকলেও এ কথা সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, এ আলোচনা মূলত বাঙালী জাতির সঙ্গে প্রহসন। বাঙালীদের আর একবার বোকা বানিয়ে তারা আলোচনার নামে শুধু কালক্ষেপণ করছে। একাত্তরের এই দিন ঢাকার অদূরে জয়দেবপুরে পাক সেনারা বেশ ক'জন নিরস্ত্র বাঙালী সৈনিককে গুলি করে হত্যার প্রতিবাদে ক্ষোভে ফেটে পড়েন বঙ্গবন্ধু।
ইয়াহিয়ার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আলোচনা চলার দিনগুলোতে পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠী তাদের ঘাঁটিগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ গোলাবারুদ এবং সৈনিক সমাগম ঘটাতে থাকে। পাকিস্তানী স্বৈরাচার সরকার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আড়ালে এসব কার্যক্রম চালাতে থাকে।
দেশের অনেকে অবশ্য এদিন পর্যন্ত আলোচনা নিয়ে আশাবাদী ছিল। তারা ভেবেছিল আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়ে এটার সমাধান চলে আসবে। কিন্তু হঠাৎ ঘটনার মোড় নেয় অন্যদিকে। জয়দেবপুরে নিরীহ বাঙালী সৈনিকদের ওপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাক সেনারা। হত্যা করে বেশিকিছু বাঙালী সৈনিককে। এর ফলে পাকিস্তানী শাসকদের সঙ্গে আপোসের সব সম্ভাবনার পথ বন্ধ হয়ে যায়। বাঙালী এমন অতর্কিতে হামলায় প্রথমে হতভম্ব হয়ে পড়লেও পরে দেশজুড়েই সবাই আক্রোশে ফেটে পড়তে থাকে। এই ঘটনার মধ্য দিয়েই পাকিস্তানী বাহিনীর মনোভাব সম্পর্কে বাঙালীর সংশয়ের অবসান ঘটে।
জয়দেবপুরের ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা দেখা দেয়। পরিস্থিতি আয়ত্তে আনতে পাকিস্তানী শাসকরা জয়দেবপুরে দীর্ঘ ২৯ ঘণ্টার কার্ফু জারি করে রাখে। কার্ফু উঠিয়ে নেয়ার পর পরই জয়দেবপুরের বিক্ষুব্ধ জনতা আবার পথে নেমে আসে। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মুক্তিকামী জনতা ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে শুরু করে। তারা প্রস্তুত হতে থাকে আসন্ন যুদ্ধের জন্য।
একাত্তরের ১৯ মার্চ ছিল অসহযোগ আন্দোলনের অষ্টাদশ দিন। প্রতিদিনের মতো সকল সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ছিল বন্ধ। সর্বত্র উড্ডীন ছিল কালো পতাকা। বঙ্গবন্ধু-ইয়াহিয়া খানের বৈঠক চলে দেড় ঘণ্টা। বৈঠক শেষে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের বঙ্গবন্ধু জানান, 'আগামীকাল আবার বৈঠক হবে। দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা আমাকে সাহায্য করবেন। আজ সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগ দলীয় নেতাদের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টারা বৈঠকে মিলিত হবেন।'
সন্ধ্যায় উপদেষ্টা পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় প্রেসিডেন্ট ভবনে। আওয়ামী লীগের তরফে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও ড. কামাল হোসেন এবং সরকারের পক্ষে বিচারপতি এ আর কর্নেলিয়াস, লে. জেনারেল পীরজাদা ও কর্নেল হাসান অংশ নেন। দু'ঘণ্টা স্থায়ী হয় আলোচনা। দু'দলের উপদেষ্টারা কি ফমর্ুলার ভিত্তিতে আলোচনা হবে অর্থাৎ টার্ম অব রেফারেন্স নির্ধারণ করেন।
চট্টগ্রামে মওলানা ভাসানী বলেন, শেখ মুজিবের হাতে ৰমতা অর্পণ ছাড়া পাকিসত্মানকে রৰা করা সম্ভব নয়। প্রখ্যাত শিল্পী কামরম্নল হাসানের পরিকল্পনা ও ডিজাইনের বাংলা স্টিকার- 'একেকটি বাংলা অৰর একেকটি বাঙালীর জীবন' প্রথম প্রকাশিত হয় একাত্তরের রক্তৰরা এই দিনে।
|
উত্তাল ১৮ মার্চ: পাক সরকারের আলোচনার নামে সময়ক্ষেপন চলছে
১৮ মার্চ ১৯৭১। উত্তাল-অগ্নিগর্ভ একাত্তরের রক্তঝরা এই দিনে দেশব্যাপী সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি চলছিল। একদিকে সংগ্রামের প্রস্তুতি, অন্যদিকে চলছিল বঙ্গবন্ধু ও ইয়াহিয়া খানের আলোচনা। এক পর্যায়ে সবাই বুঝতে পারে যে, আলোচনার নামে চলছে সময়ক্ষেপণ। বঙ্গবন্ধু আলোচনাতেই শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে আলোচনার নামে প্রহসনের অভিযোগ আনেন। তিনি স্বাধীনতার দাবিতে অটল থেকে আলোচনায় অংশগ্রহণ করছিলেন।
একাত্তরের এ দিনেই বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত বাঙালী সৈনিকরা স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কর্মীরা বাংলাদেশে অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করতে বিভিন্ন স্থানে মতবিনিময় চালিয়ে যেতে থাকে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষ সামরিক প্রশিক্ষণের প্রস্তুতি নিতে থাকে। মহিলা পরিষদের মেয়েরাও পিছিয়ে ছিল না। তাদেরও বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
এদিকে পশ্চিম পাকিস্তানী বাহিনী সামরিক ঘাঁটিকে শক্তিশালী করতে গোপনে গোলাবারুদ আর সৈনিক জড়ো করতে শুরু করেছিল। পাকিস্তানী শাসকরা স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমাতে এভাবে একটু একটু করে প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছিল। এদিন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা তেজগাঁও-মহাখালীতে শ্রমিকদের ট্রাকে হামলা চালায়। আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে বলেন. 'এ ধরনের উস্কানি আর সহ্য করা হবে না। উনিশ শ' একাত্তর সাল মার্চ মাস ছিল গণজাগরণের সময়। অসহযোগ আন্দোলনের সপ্তদশ দিবস ছিল ১৮ মার্চ। এ দিনও সরকারী-বেসরকারী ভবনের শীর্ষে কালো পতাকা উড়িয়ে, অফিস-আদালতে অনুপস্থিত থেকে সর্বশ্রেণীর কর্মচারীরা বঙ্গবন্ধু ঘোষিত সংগ্রামের কর্মসূচী সফল করে তোলেন।
বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে জনতা সারাদিন ধরে মিছিলের পর মিছিল করে চলমান আন্দোলনের সঙ্গে তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন ও একাত্মতা ব্যক্ত করে। জনগণের কণ্ঠে উচ্চারিত স্লোগান ছিল- 'বীর বাঙালী অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর।
স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এক বিবৃতিতে আমেরিকা, ব্রিটেন, রাশিয়া, চীন প্রভৃতি শক্তির প্রতি তাদের সরবরাহকৃত অস্ত্রের দ্বারা বাঙালী হত্যার প্রয়াস বন্ধ করার আবেদন জানায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ অপর এক বিবৃতিতে বিভিন্ন দেশের সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুদ্ধিজীবীদের কাছে তারবার্তা প্রেরণ করে আসন্ন গণহত্যা ও যুদ্ধ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানীদের নিবৃত করার অনুরোধ জানান। |
উত্তাল ১৭ মার্চ : পাক সরকারের উপলদ্ধি অখন্ডতা রক্ষা সম্ভয় নয়
"সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম/চলবেই দিনরাত অবিরাম"। এ রকম অনেক উদ্দীপনামূলক গান টিভিতে প্রচারিত হচ্ছে মার্চের উত্তাল দিনগুলোতে। সে ছিল আশ্চর্য এক জাগরণের কাল। সকল বাঙালীর চেতনা স্থির ছিল একটি মাত্র লক্ষ্যবিন্দুতে যার নাম স্বাধীনতা। একাত্তরের উত্তাল এই দিনে পাকিস্তানের উর্ধ্বতন সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। খোদ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থান করে নিশ্চিত হন এ অংশে কার্যত পাকিস্তানের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। স্বাধীনতার প্রশ্নে বীর বাঙালীর অকুতোভয় সংগ্রাম আর রণপ্রস্তুতিতে পাক প্রেসিডেন্টের বুঝতে বাকি থাকে না পাকিস্তানের অখন্ডতা আর রক্ষা করা সম্ভব নয়।
তাই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণের পথ বেছে নেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া। প্রতিটি বৈঠকেই বঙ্গবন্ধু বাঙালীর মুক্তি ও স্বাধীনতার প্রশ্নে আপসহীন। ফলে পাক সামরিক জান্তা ভেতরে ভেতরে বাঙালী নিধনযজ্ঞ চালিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রামকে ভন্ডুল করার জঘন্য পরিকল্পনা আঁটতে থাকে। প্রতিদিনই পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য ও অস্ত্র-গোলাবারুদ মজুদ করা হয় বাংলাদেশে।
একাত্তরের উত্তাল মার্চের এদিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে গিয়েছিলেন মুক্তিপাগল হাজারো বাঙালী।
|
উত্তাল ১৬ মার্চ: পাকিস্তানী ও মুক্তিকামী জনতার সশস্ত্র সংগ্রামের জোর প্রস্তুতি চলছে
একাত্তরের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের বৈঠক হয়। বৈঠকে বঙ্গবন্ধু সামরিক আইন প্রত্যাহার, বাঙালীদের ওপর গুলিবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড বন্ধসহ বিভিন্ন নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে এর জোরালো প্রতিবাদ জানিয়ে বিচার দাবি করেন। লাখো বাঙালী হত্যার প্রতীকী প্রতিবাদ হিসাবে গাড়িতে কালো পতাকা উড়িয়ে বঙ্গবন্ধু অংশ নেন ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বৈঠকে। সকাল থেকেই উৎসুক জনতা অপেক্ষা করছিল বঙ্গবন্ধু-ইয়াহিয়া বৈঠকের ফলাফল কী হয় তা জানতে। সকাল ১০টায় শুরু হওয়া বৈঠকটি শেষ হয় দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে। বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের জানান, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা থেকে কোন সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। বঙ্গবন্ধু-ইয়াহিয়া বৈঠক চলছে, অন্যদিকে স্বাধীনতার প্রশ্নে আন্দোলন-সংগ্রামে পুরো পূর্ব পাকিস্তান কার্যত অচল হয়ে পড়ে। পহেলা মার্চ থেকেই পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ হারায় বাংলাদেশের। সামরিক জান্তাদের কোন আদেশ-নির্দেশই মানছে না বীর বাঙালী। একমাত্র সেনা ছাউনি ছাড়া পাকিস্তানের অস্তিত্বই ছিল না কোন জায়গায়। বরং পুরো বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে, পাড়া-মহল্লায়, শহর-বন্দরে পতপত করে উড়ছে বাংলাদেশের রক্তস্নাত জাতীয় পতাকা। পাকিস্তানী প্রেসিডেন্ট আলোচনার জন্য বাংলাদেশে অবস্থান করলেও ভেতরে ভেতরে সামরিক জান্তা ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখে। কেননা সামরিক জান্তা বুঝতে পারে এদেশের মানুষ স্বাধীনতার প্রশ্নে কোন আপোষ করবেন না। তাই আলোচনার নামে কালক্ষেপণ করে ভেতরে ভেতরে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে। প্রতিদিনই পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য ও অস্ত্র-গোলাবারুদ আনা হয় পূর্ব পাকিস্তানে। এদেশের সচেতন জনগণও বিষয়টি আঁচ করতে পেরে গোপনে সারাদেশেই অস্ত্র-গোলাবারুদ সংগ্রহের মাধ্যমে সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। রক্তঝরা একাত্তরের এদিন শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের আলোচনার পাশাপাশি সারাদেশে আন্দোলন বাধভাঙ্গা রূপ নিয়েছে। রাজপথ মিছিলে মিছিলে উত্তপ্ত করে সাধারণ মানুষজনও দেশের উদ্ভূত সমস্যার চূড়ান্ত সমাধানে বঙ্গবন্ধুর সর্বশেষ মন্তব্যের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। এরই মধ্যে ৩ মার্চ থেকে শুরু হওয়া অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জেও ছড়িয়ে পড়ে। অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ বন্ধ। সব সরকারী ভবন, হাটবাজার এমনকি পাড়া-মহল্লায়ও উড়ছিল প্রতিবাদের কালো পতাকা। কোথাও কোথাও বাংলাদেশের নতুন পতাকাও উড়তে থাকে। মহ্ল্লায় মহলস্নায় গড়ে উঠতে থাকে সংগ্রাম কমিটি। সব বয়স, সব পেশা ও শ্রেণীর মানুষ বেরিয়ে আসতে থাকে রাজপথে। স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে দীৰিত বঙ্গবন্ধুকে আরও উজ্জীবিত করতে রাস্তায়, মাঠে-ময়দানে তখন গণসঙ্গীত, নাটক, পথনাটক ও পথসভা করে চলছে উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, বেতার-টেলিভিশন শিল্পী সংসদ, মহিলা পরিষদ প্রভৃতি সংগঠন। হাইকোর্টের আইনজীবী, বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন অসহযোগ আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করতে থাকে। |
উত্তাল ১৫ মার্চ: ঢাকায় বঙ্গবন্ধু – ইয়াহিয়া বৈঠক
১৯৭১ এর এ দিনে উত্তাল-অগ্নিগর্ভ বাংলাদেশে (পূর্ব পাকিস্তান) আসেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাদা রঙের গাড়িতে কালো পতাকা উড়িয়ে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে দেখা করতে যান। ১৬ মার্চ শুরু হবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব-ইয়াহিয়া খানের পূর্বনির্ধারিত বৈঠক। স্বাধীনতার দাবিতে অটল থেকেই তিনি ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনায় বসার ব্যাপারে সংকল্পবদ্ধ।
অপরদিকে দেশবাসী তাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি নিতে থাকে। দেশবাসীকে তাদের অধিকার বঞ্চিত করার প্রতিবাদস্বরূপ শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা তাদের খেতাব বর্জন অব্যাহত রাখেন। চারদিকে শিল্পী এবং বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এ নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা দেখা যায়। শিল্পাচার্য জয়নুলের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে সাংবাদিক-সাহিত্যিক আবুল কালাম শামসুদ্দীন এবং অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী তাঁদের রাষ্ট্রীয় খেতাব বর্জন করেন। বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এ খেতাব বর্জনের বিষয়টি ব্যাপক সাড়া ফেলে। এদিন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সব শিল্পী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীকে রাষ্ট্রীয় খেতাব বর্জনের আহ্বান জানায়। দেশবাসী আরও বেশী উৎসাহ ও উদ্দীপনা পেয়ে নিজেদের সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করতে থাকে। এদিনে ঢাকা শহরে শিল্পী, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সাহিত্যিকদের সভা-সমাবেশ চলতেই থাকে।
একাত্তরের এদিনে অধ্যাপক আবুল ফজলের সভাপতিত্বে এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান, সাংবাদিক নূর ইসলাম প্রমুখ। বুদ্ধিজীবীদের পাশাপাশি টেলিভিশন নাট্যশিল্পী সংসদ এদিন স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে। তাদের সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন আবদুল মজিদ। বক্তব্য রাখেন সৈয়দ হাসান ইমাম, ফরিদ আলী, শওকত আকবর, আলতাফ হোসেন, রওশন জামিল, আলেয়া ফেরদৌস প্রমুখ।
শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'একাত্তরের দিনগুলি'তে লিখেছেন, "... সিঁড়ির মুখ থেকে জামী চেঁচিয়ে ডাকল, মা, ভাইয়া, শিগগির এসো, খবর শুরু হয়ে গেছে। টিভিতে শেখ মুজিবকে দেখাচ্ছে। হুড়মুড়িয়ে উঠে নিচে ছুটলাম। খবর খানিকটা হয়ে গেছে। শেখ মুজিবের গাড়িতে পত্পত করে উড়ছে কালো পতাকা। দেখে প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। প্রতিবাদের কালো পতাকা উঁচিয়ে পাকিসস্তানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনায় গিয়েছেন শেখ মুজিব। এর আগে কোনদিনও পাকিস্তান সরকার বাঙালীর প্রতিবাদের এই কালো পতাকা স্বীকার করে নেয়নি। এবার সেটাও সম্ভব হয়েছে।"
জাহানারা ইমাম সেই সময়কার বিবরণ দিতে গিয়ে আরও লিখেছেন, "... সারা দেশ স্বাধীনতার দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে, ঢাকায়, রাজশাহীতে, চট্টগ্রামে সবখানে এই দাবি তুলে শান্তিপ্রিয় বাঙালীরা আজ মরিয়া হয়ে ওঠে, লাঠি-সড়কি যা পাচ্ছে তাই হাতে নিয়ে ছুটে যাচ্ছে গুলির সামনে। ঘরে ঘরে নিজের হাতে বোমা, পটকা, মলোটভ ককটেল বানিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে প্রতিপক্ষের ওপর।" একই দিন ঢাকা শহরের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন শহরেও সভা, সমাবেশ, মিছিল, মিটিং চলতে থাকে। এদিনে নেত্রকোনায় সুইপার ও ঝাড়ুদাররা ঝাড়ু, দা, লাঠি ও কোদাল নিয়ে মিছিল বের করে। বগুড়া, খুলনা, রংপুর, লাকসাম, কুমিলস্না ও কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে স্বাধীনতার সপক্ষে মিছিল-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। |
উত্তাল ১৪ মার্চ: মাঝিমাল্লারা হাতে রাজপথে নেমে আসে
১৯৭১ এর এ দিনে ঢাকার উত্তাল রাজপথে ছিল এক ব্যতিক্রর্মী চিত্র। মাঝিমাল্লারা সব বৈঠা হাতে এদিন রাজপথে নেমে আসে। সেদিনের রাজপথ ছিল মাঝিমাল্লাদের দখলে। সামরিক আইনের ১১৫ ধারা জারির প্রতিবাদে সেদিন বেসরকারী কর্মচারীরাও বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। দেশের জনগণকে গণতান্ত্রিক অবস্থা থেকে বঞ্চিত করার প্রতিবাদে খ্যাতিমান শিল্পী শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন তাঁর 'হেলাল ইমতিয়াজ' খেতাব বর্জন করার ঘোষণা দেন।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এদিন নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বসার ব্যাপারে শর্তারোপ করেন। তিনি অবশ্য প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, যদি প্রেসিডেন্টের দাবি পূরণের ইচ্ছা নিয়ে আলোচনায় বসতে চান, তা হলে আমি বসতে পারি। তবে বঙ্গবন্ধু দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কোনভাবেই তৃতীয় কোন পক্ষ সেখানে উপস্থিত থাকতে পারবে না।
অন্যপক্ষে পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর দেয়া ৬ দফা দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। তবে ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে অলোচনার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ন্যাপ (ওয়ালী) নেতা খান আবদুল ওয়ালী খান পূর্ব পাকিস্তান সফরকালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একান্তে আলাপ-আলোচনা করেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় বাঙালীর আন্দোলন এবং তাদের দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করেন।
একাত্তরের রক্তঝরা এই দিনে জাতীয় লীগ নেতা আতাউর রহমান অস্থায়ী সরকার গঠনের জন্য শেখমুজিবুর রহমানের কাছে দাবি জানান। এ সময় দেশের পত্রিকাগুলোতেও আন্দোলনকে সমর্থন করে সম্পাদকীয় লেখা চলতে থাকে। আওয়ামী লীগের সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমেদ অসহযোগ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৫ মার্চ পালনে ৩৫টি নতুন নির্দেশনা দেন।
এই দিনে ঢাকার বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে ছাত্র ইউনিয়নের এক সমাবেশ থেকে দেশের ৭ কোটি জনতাকে সৈনিক হিসেবে সংগ্রামে অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি নুরুল ইসলাম নাহিদের (বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী) সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম (বর্তমানে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক)। একই দিনে শিল্প সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা শিল্প সংগ্রাম গঠন করেন। বাঙালীর স্বাধীনতার আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে ঢাকার কবি-সাহিত্যিকরা 'লেখক সংগ্রাম শিবির' নামে একটি কমিটি গঠন করেছেন। আহ্বায়ক : হাসান হাফিজুর রহমান। সদস্য : সিকান্দার আবু জাফর, আহমদ শরীফ, শওকত ওসমান, শামসুর রাহমান, বদরম্নদ্দীন ওমর, রণেশ দাসগুপ্ত, সাইয়িদ আতীকুলস্নাহ, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, রোকনুজ্জামান খান, আবদুর গাফ্ফার চৌধুরী, সুফিয়া কামাল, জহির রায়হান, আবদুল গনি হাজারীসহ অনেকে।
|
উত্তাল ১৩ মার্চ : পিপিপি নেতা ভুট্টো ৬ দফা প্রত্যাখান করেন

একাত্তরের ১৩ মার্চ জনতার বাঁধভাঙা আন্দোলনের একপর্যায়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রধান ওয়ালী খানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। নিজ বাসভবনে এ বৈঠক শেষে শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের সহিত বৈঠকে প্রস্তুত আছি’। আর ওয়ালী খান বলেন, ‘জাতীয় পরিষদ আলোচনার উপযুক্ত স্থান।
এদিকে স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করে এদিন রাস্তায় নেমে আসেন লেখক, শিল্পী, কবি ও সাহিত্যিকরা। ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’ বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে এক সভায় শোষণহীন সমাজব্যবস্থা কায়েমের উদ্দেশ্যে দেশের সর্বস্তরের জনগণকে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। অধ্যাপক ড. আহমদ শরীফের সভাপতিত্বে এ সভায় বক্তারা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কবি, শিল্পী ও সাহিত্যিকদের লেখনীকে বলিষ্ঠতর করার মাধ্যমে স্বাধীনতার জয়গান ও দেশের স্বাধীনতা সৈনিকদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রত্যক্ষভাবে সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার কথা বলেন। সভায় বক্তৃতা করেন সাংবাদিক রণেশ দাশগুপ্ত, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ, কবি বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, সাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন, সাহিত্যিক খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, শিশুসাহিত্যিক রোকনুজ্জামান খান (দাদা ভাই), কবি-প্রাবন্ধিক ফরহাদ মজহার ও কবি-প্রাবন্ধিক আহমদ ছফা।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এদিন তার ‘হেলালে ইমতিয়াজ’ খেতাব বর্জনের ঘোষণা দেন। এ ঘোষণা শিল্পীসমাজকে আন্দোলনে শামিল হওয়ার পথ দেখায়। তার এ ঘোষণা ছিল এদেশের জনগণকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করার প্রতিবাদ। এদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক বিবৃতিতে সর্বসাধারণের প্রতি অসহযোগ অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, জনগণের বীরোচিত সংগ্রাম এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের সব স্বাধীনতাকামী এবং স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামরত মানুষ আমাদের এই দাবিকে তাদের নিজের দাবি হিসেবে গণ্য করবে। এদিন বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জানান, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আলোচনায় বসতে চাইলে তার কোনো আপত্তি নেই। তবে এজন্য প্রেসিডেন্টকে আন্দোলনের দাবি পূরণের সদিচ্ছা দেখাতে হবে। সেই সঙ্গে তিনি আরও বলেন, আলোচনা দ্বিপক্ষীয় হতে হবে। এতে কোনো তৃতীয়পক্ষ উপস্থিত থাকতে পারবে না। অপরদিকে করাচিতে বসে শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা দাবি প্রত্যাখ্যান করেন পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো। এক জনসভায় তিনি বলেন, ‘পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের দুই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করা উচিত |
উত্তাল ১২ মার্চ: জাতীয় ফুল হিসেবে শাপলা’র স্বীকৃতি

১৯৭১ সালের এই দিনে প্রতিবাদ প্রতিরোধ বিদ্রোহ বিক্ষোভে সুপ্ত আগ্নেয়গিরি ঘুম ভেঙ্গে জেগে উঠেছিল। শেকল ছেঁড়ার অদম্য আকাক্ঙায় দুরন্ত দুর্বার হয়ে উঠছিল বীর বাঙালী জাতি। একাত্তরের এদিন চির পরিচিত শাপলাকে আমাদের জাতীয় ফুল করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। শিল্পী কামরুল হাসানের আহ্বানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে আয়োজিত শিল্পীদের এক সভাতে এ ঘোষণা দেয়া হয়। ঘোষণা শেষে মুক্তিকামী মানুষকে সেদিন আরও বেশি উৎসাহী করে তুলতে তাঁরা প্রতিবাদী পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন বিলি করেন।
একাত্তরের ১২ মার্চ জাতিসংঘের তদানীন্তন মহাসচিব উ থান্ট এক নির্দেশে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত জাতিসংঘের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী যেন সদর দফতরে ফিরে যান। এ নির্দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন বাঙ্গালীরা। সেদিন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, বাংলাদেশের মানুষও এ পৃথিবীর বাসিন্দা। তাদের প্রতিও জাতিসংঘের দায়িত্ব রয়েছে।
অন্যদিকে ক্রমেই স্তিমিত হতে থাকে পাকিস্তানী বাহিনীর কর্মকান্ড। লাগাতার অসহযোগ আন্দোলনের ফলেই পূর্ব বাংলায় থাকা পাকিস্তানী সামরিক জান্তারা দমে যেতে থাকে। মার্চের শুরুতে পতাকা উত্তোলন এবং ইশতেহার পাঠের পর থেকে বাঙালীর স্বাধীনতাপ্রাপ্তির আকাঙ্কা আরও তীব্র হতে থাকে। পেশাজীবীরা পথে নেমে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে।
এই দিনে পূর্ব পাকিস্তানের সিভিল সার্ভিস এ্যাসোসিয়েশন বাঙালীর স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে। তারা আন্দোলনে অর্থের জোগান দিতে তাদের একদিনের বেতন দেয়ার ঘোষণা দেন। এ দিনে রাস্তায় নেমে আসেন শিল্পী, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কর্মজীবী সবাই। স্লোগানে মাতিয়ে রাখে ঢাকার রাজপথ। পূর্ব পাকিস্তানের সাংবাদিক ইউনিয়ন আন্দোলনকে জোরদার করতে, আরও সংঘবদ্ধ করতে রাজপথে নেমে আসে। পাকিস্তানবিরোধী স্লোগানে রাজপথকে উত্তাল করে তোলে জনতা। শিল্পী মুর্তজা বশীর ও কাইয়ুম চৌধুরীর নেতৃত্বে এ দিন চারুশিল্প সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামে এ পরিষদ বিশেষ ভূমিকা রাখে।
একাত্তরের মার্চ মাসের দিনগুলো ছিল থমথমে, উৎকণ্ঠা আশঙ্কায় পরিপূর্ণ। চাপা উদ্বেগে অস্থিরতা অনিশ্চয়তার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছিল সাড়ে সাত কোটি বাঙালী। কি ঘটবে, কী ঘটতে যাচ্ছে তা নিয়ে চিন্তিত উৎকণ্ঠিত ছিলেন সকলেই। অবরুদ্ধ গণমানুষ ভিতরে ভিতরে প্রস্তুত হচ্ছিলেন চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য। লক্ষ্য একটাই- নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা। কারণ ততদিনে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে, পশ্চিম পাকিস্তানী বেনিয়া দুবৃত্ত শোষকগোষ্ঠী বাঙালীকে তার ন্যায্য অধিকার কোন দিনই দেবে না। |
উত্তাল ১১ মার্চ: নিয়ন্ত্রণহীন পাক সরকার, প্রস্তুতি নিচ্ছে স্বাধীনতাকামী জনতা

১১ মার্চ, ১৯৭১। অগ্নিবিদ্রোহ টালমাটাল সারাদেশ। কবির স্বাধীনতার চেতনায় দীপ্ত জাতি প্রতিবাদে, প্রতিরোধে তখন মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। স্বাধীনতার আন্দোলন ক্রমেই উত্তাল থেকে উত্তালতর হতে থাকে। শান্তিপূর্ণভাবে অসহযোগ আন্দোলন সফল হওয়ায় বঙ্গবন্ধুর ওপর দেশবাসীর আস্থা বেড়ে যায় অনেক। পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ, নিপীড়ন-বঞ্চনার বিরুদ্ধে অগ্নিবিদ্রোহের চূড়ান্ত রণপ্রস্তুতি চলছিল একাত্তরের এই সময়টায়। বাঙালী জাতির মুখ্য চিন্তা ও লক্ষ্য তখন ছিল একটাই 'স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান অনেক আগেই পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
একমাত্র সেনা ছাউনি ছাড়া টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া কোথাও পাকদের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। পুরো দেশ, মানুষ চলছিল একমাত্র এক ব্যক্তির নির্দেশে, তিনি হলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী ও সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু ও আদেশ উপেক্ষা করেই সব দোকানপাট, অফিস-আদালত, কলকারখানা, কোর্ট-কাচারি বন্ধ রাখা হয়। দেশজুড়ে চলতে থাকে মিটিং-মিছিল। সংঘবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টা আরও জোরালো হয়। বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় দল গঠনের কাজ চলতে থাকে। শহরগুলোতে প্রতিদিনই মিছিল-মিটিং চলতে থাকে। পাক বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন অনেকে। বাড়তে থাকে শহীদদের তালিকা। একেকটি মৃত্যু বীর বাঙালীর রক্তে প্রতিশোধের ইচ্ছাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। চারদিকে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। দেশের স্বাধীনতা আনতে অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিতে সবাই প্রস্তুত।
অনিবার্য স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে দেশ। পূর্ব পাকিস্তান হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এটা বুঝতে পেরে পাক সামরিক জান্তা গোপনে বাঙালী নিধনের ঘৃণ্য খেলায় মেতে ওঠে। যে কোন মূল্যে স্বাধীনতা ঠেকাতে পাক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বাঙালীর রক্তের হোলি খেলার ষড়যন্ত্র করতে থাকে। গোপনে পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানী সামরিক শক্তি ও অস্ত্র-গোলাবারূদ মজুদ করতে থাকে। কিন্তু এই ঘৃণ্য পরিকল্পনার কথা সামরিক বাঙালী অফিসাররা জানতে পেরে তাঁরাও ভেতরে ভেতরে স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ে শক্তি-সাহস সঞ্চয় করতে থাকেন। |
অগ্নিঝরা ১০ মার্চ : সারাদেশ বিক্ষোভে উত্তাল, পশ্চিম পাকিস্তানের দুটি পত্রিকার ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান
আজ ১০ মার্চ। ১৯৭১ সালের এইদিনে সরকার বিরোধী আন্দোলন ও বিদ্রোহ-বিক্ষোভের তরঙ্গ প্রবহমান ছিল টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। এসময়ে দেশজুড়ে চলছে অসহযোগ আন্দোলন পাশাপাশি চলছে চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি। সবাই যার যার অবস্থান থেকে স্বাধীনতার প্রস্থতি নিচ্ছিল। আর ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বঙ্গবন্ধুর বাসভবন পরিণত হয় বিকল্প রাষ্ট্রপ্রধানের দফতরে।
এদিনও সরকারি-বেসরকারি ভবন, ব্যবসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, থানা এবং হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির বাসভবনে উড়েছে কালো পতাকা।
এদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশে জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছাই আজ শেষ কথা। বাংলাদেশের জনগন তাদের মুক্তির লক্ষ্য বাস্তবায়ন ও স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকার অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম ও সব ধরনের ত্যাগ স্বীকারে দৃঢ়সংকল্প থাকবে। বাংলাদেশের জনগণ জানে, সকল ধ্বংসকারী অস্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণের তাদের চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে নিবেই। এদিন তিনি বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার জন্য বঙ্গবন্ধু বিদেশী সাংবাদিকদের প্রতি আহবান জানান। বিবৃতিটি পরের দিন দৈনিক আজাদের প্রধান সংবাদ হিসেবে ছাপা হয়। সংবাদের শিরোনাম ছিল—‘বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছাই চূড়ান্ত : মুজিব, জনগণ শেষ পর্যন্ত সংগ্রাম করিবে’।
এ দিনই স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন গতিশীল করতে শিল্পী-সাহিত্যিকরা ত্যাগ স্বীকারের শপথ নেন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। কবি-কথাশিল্পী হাসান হাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে ঢাকায় কবি-সাহিত্যিকরা গঠন করেছিলেন 'লেখক সংগ্রাম শিবির।' আন্দোলনের তীব্রতা দেখে এইদিনেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রভাবশালী পত্রিকা ‘দৈনিক পাকিস্তান’ অবিলম্বে জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহবান জানিয়ে সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য পিপল’ পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর সমালোচনা করে সম্পাদকীয় প্রকাশ করে।
অসহযোগ আন্দোলনে সমর্থন জানাতে রাস্তায় নামে দৃষ্টিশক্তিহীন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে খণ্ড মিছিল ও ট্রাকে গণসঙ্গীতের স্কোয়াড বের করা হয়। সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এসব মিছিল ও গণসঙ্গীতের উত্তাপ। এদিনে নিউইয়র্ক প্রবাসী পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্ররা জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ৭১-এর এইদিনে নারায়ণগঞ্জ জেল থেকে ৪০ জন কয়েদি পলায়ন করে। এ সময় গোলাগুলিতে একজন কয়েদি নিহত এবং দুই পুলিশ ও ২৫ কয়েদি আহত হয়। রাজশাহী শহর থেকে কারফিউ প্রত্যাহার করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হল প্রাঙ্গণে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের উদ্যোগে কর্মিসভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সভার পরে ছাত্রলীগ ও ডাকসু নেতাদের স্বাক্ষরিত স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এক বিবৃতিতে বাঙালি সৈন্য, ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের পাকিস্তানি সরকারকে সহযোগিতা না করার আহ্বান জানানো হয়।
ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সমাবেশ শেষে মিছিল বের করা হয়। ফরোয়ার্ড স্টুডেন্ট ব্লক বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে জনসমাবেশের আয়োজন করে। এককথায় ১০ ই মার্চ ছিল বিদ্রোহ-বিক্ষোভ ও স্বাধিকারের পক্ষে বাঙ্গালীর এক বিস্ফোরণ। |
উত্তাল ৮ই মার্চ: বিদ্রোহ-সংগ্রামের তরঙ্গ টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া ছড়িয়ে পড়ে
আজ ৮ মার্চ। ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর বিক্ষুব্ধ বাংলায় বিদ্রোহ-সংগ্রামের তরঙ্গ টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া ছড়িয়ে পড়ে। বাঙালীর প্রচন্ড বিক্ষোভে একাত্তরের এই দিনে রেডিও-টেলিভিশনে বঙ্গবন্ধুর অবিস্মরণীয় ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচার করতে বাধ্য হয় পাক শাসকগোষ্ঠী। চোখের সামনে সবাইকে বোকা বানিয়ে বঙ্গবন্ধুর কৌশলে স্বাধীনতার আহ্বানে হতভম্ভ হয়ে যায় পাকিস্তানী সামরিক জান্তারা। বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বানিয়ে স্বাধীনতার আন্দোলনকে ভন্ডুলের শেষ পরিকল্পনাও ব্যর্থ হওয়ায় হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম দমনের নীলনকশা আটতে থাকে পাক শাসক গোষ্ঠী। উনিশ শ' একাত্তরের এই দিনে বাংলার দামাল ছেলেরা চূড়ান্ত আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিতে থাকে। আর ৭ মার্চে দেয়া বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে উদ্বুদ্ধ বাংলার জনগণ। বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন তার পক্ষে দেশবাসী জেগে উঠতে শুরু করে। বাংলার দামাল ছেলেরা নিজেরা দলে দলে যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে অসহযোগ আন্দোলন চলতেই থাকে। এ সময় স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর বাণী রেডিওতে প্রচার না করায় বাঙালী ক্ষোভে ফেটে পড়ে। বেতারকর্মীদের আন্দোলনের কারণে পাকিস্তানীরা বাধ্য হয় বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বেতারে প্রচার করতে। ৮ মার্চ সকাল ৮টায় রেডিওতে ভেসে আসে বঙ্গবন্ধুর সেই অবিস্মরণীয় ভাষণ- 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।' অন্যদিকে আগের মতোই উত্তাল জনতা মিটিং-মিছিলে প্রকম্পিত করে রাখে সারাদেশ।
|
উত্তাল ৭ই মার্চ: 'এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম' ভাষণে উদ্ভুদ্ধ স্বদেশ
রক্তঝরা একাত্তরের ঐতিহাসিক ৭ মার্চ আজ। এদিনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন একটি ভিন্নমাত্রা পেয়েছিল। রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের স্বাধীনতার ডাকে রক্ত টগবগিয়ে উঠেছিল মুক্তিপাগল বাঙালীর। মুহূর্তেই উদ্বেল হয়ে ওঠে জনতার সমুদ্র। মুহর্মুহ সেস্নাগানে কেঁপে ওঠে বাংলার আকাশ। নড়ে ওঠে হাতের ঝাকায় তাদের গর্বিত লাল-সবুজ পতাকা, পতাকার ভেতরে সোনালি রঙে আকা বাংলাদেশের মানচিত্র। বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক ভাষণেই মুক্তিপাগল বাঙালী জাতিকে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করেছিল।
একাত্তরের এই ঐতিহাসিক দিনে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ববাংলা সমন্বয় কমিটি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার গেরিলা যুদ্ধের আহ্বান জানান। তাদের প্রচারপত্রে আহ্বান জানানো হয়- 'আঘাত হানো', 'সশস্ত্র বিপ্লব শুরু করো', 'জনতার স্বাধীন পূর্ববাংলা কায়েম করো্। পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি- ন্যাপ (মুজাফফর) পাকিস্তানের শাসনতন্ত্রের জন্য ১৭ দফা প্রস্তাব দেয়। এতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকারসহ আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দাবি করা হয়।
৭ মার্চ ঢাকা ছিল লাখো মানুষের শহর। বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ ছুটে এসেছিল বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য। 'বীর বাঙালী অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো' স্লোগানে ঢাকা শহর উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। কখন ঘটবে বিস্ফোরণ এমন একটি পরিস্থিতি বিরাজ করে সারা শহরে। টানটান উত্তেজনার মধ্যে রেসকোর্সে অনুষ্ঠিত হয় এই সমাবেশ। একটি সফল সমাবেশ। যা বাঙ্গালির স্বাধীনতার বীজ ঘোষণা করে।
বিচ্ছিন্নতাবাদীর দায় চাপিয়ে দেশের স্বাধীনতাকে যাতে পাকিস্তানী সামরিক জান্তারা বিলম্বিত করতে না পারে সেজন্য বঙ্গবন্ধু পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ একটি ভাষণ দেন। সরাসরি না দিয়ে বঙ্গবন্ধু পরোক্ষভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। আর বঙ্গবন্ধুর ব কণ্ঠে এ নির্দেশ পেয়েই নিরস্ত্র বাঙালী জাতি সশস্ত্র হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকহানাদারদের বিরুদ্ধে। বাঙালীর দেশপ্রেমের অগ্নিশিখায় পরাস্ত করে প্রশিক্ষিত পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীকে। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনে মহামূল্যবান স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ
|
উত্তাল ৬ই মার্চ : রেসকোর্সের সমাবেশ সফলে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহন 
স্বাধীনতা ঠেকাতে রণপ্রস্তুতিতে পাকিস্তানী সামরিক হানাদাররা। অন্যদিকে যে কোন আত্মত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে অটুট বন্ধনে বীরবাঙালীরা। সভা, মিছিল, কার্ফু ভঙ্গ, গুলিতে বাঙালী হত্যা- সব মিলিয়ে অগ্নিগর্ভ সময়, বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতি।
উনিশশ' একাত্তর সালের ৬ মার্চেও ছিল হরতাল। সকাল ছ'টা থেকে দুপুর দু'টা পর্যন্ত। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন একাত্তরের এদিন দুপুরে। তাঁর ভাষণ পূর্ণ ছিল বীর বাঙালীকে উদ্দেশে করে হুমকি ও ধমক। ছিল পাক সামরিক বাহিনী দিয়ে বাঙালীকে শায়েস্তা করার হুমকি।
“বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুরবৃত্ত” বেপরোয়া বাঙালী তখন স্বাধীনতার স্বপ্নে যেমন উদ্দীপ্ত, তেমনি ফুঁসছিল বিদ্রোহ, বিক্ষোভ ও ঘৃণায়। পরদিন ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ দেবেন বাঙালীর মুক্তির দিশারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ভাষণে তিনি কী বলবেন? বহুল প্রত্যাশিত স্বাধীনতার ঘোষণা তাঁর বর্জ্রকণ্ঠে উচ্চারিত হবে কি? এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনার অনন্ত ছিল না সাড়ে ৭ কোটি বাঙালীর মধ্যে।
একাত্তরের পহেলা মার্চ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, বাংলার মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার অর্জনের কর্মসূচী ৭ মার্চ ঘোষণা করা হবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের একদিন আগে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার হুমকিধমকি স্বাধীনতাকামী বাঙালীকে হতাশ, ক্ষুদ্ধ ও উত্তেজিত করে তোলে। এমনিতেই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে লাগাতার হরতাল ও অসহযোগ আন্দোলন চলছে। পাক প্রেসিডেন্টের ভাষণের পর তা নতুন মাত্রা পায়। ঘর থেকে রাজপথে নেমে আসে বিক্ষুব্ধ হাজার হাজার স্বাধীনতাকামী বাঙালী। সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর অধীর অপেক্ষা; দৃষ্টি রেসকোর্সের ময়দানে আয়োজিত জনসভার দিকে। |
উত্তাল ৫ মার্চ: হরতালে অচল সারাদেশ, নিয়ন্ত্রণে দেশের জনগন
"কারার ঐ লৌহকপাট, ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট শিকল পূজার পাষাণ বেদী..."। দেশ মাতৃকাকে হানাদারমুক্ত করতে দীপ্ত শপথে বলীয়ান পুরো বাঙালী জাতি। উনিশশ' একাত্তরের মার্চের এই দিনে স্বাধিকার চেতনায় শাণিত আন্দোলনমুখর ছিল বাঙালী জাতি। বাংলাদেশ তখন বিদ্রোহ-বিক্ষোভে টালমাটাল, বীর বাঙালী স্বাধীনতার আকাক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। রক্তঝরা পহেলা মার্চ ঢাকায় যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তার ঢেউ আছড়ে পড়েছে দেশের প্রতিটি পাড়া-মহল্লা, শহর-বন্দরে। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর কোন নির্দেশই মানেনি মুক্তিপাগল বাঙালীরা। দেশ স্বাধীন না হলেও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সবকিছু নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এদেশবাসীর। সারাদেশে টানা হরতাল চলছে। অহিংস আন্দোলন ক্রমশ সশস্ত্র প্রতিরোধে রূপ নিতে শুরু করে। দেশের বিভিন্নস্থানে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে রাজপথ উত্তপ্ত করছে বীর বাঙালী। পাক সেনাবাহিনী ও সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই স্বাধীনতার দাবিতে অগ্নিগর্ভ হতে থাকে পুরো বাংলাদেশ। পাক সামরিক বাহিনীর সামনেই মুক্তিপাগল বাঙালী জাতি প্রকাশ্য রাজপথে "বীর বাঙালী অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো"-স্লোগানে মুখরিত গোটা দেশ। উনিশ শ' একাত্তর সালের ৫ মার্চের দিনটি কেমন ছিল? এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের লেখা বিখ্যাত প্রামাণ্য গ্রন্থ "একাত্তরের দিনগুলি'তে। শহীদ জননী তাঁর গ্রন্থে একাত্তরের ৫ মার্চ শুক্রবারের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে- "আজও ছ'টা দুটো হরতাল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হরতালের দিনগুলোতে বেতন পাওয়ার সুবিধার জন্য এবং অতি জরুরি কাজকর্ম চালানোর জন্য সরকারী-বেসরকারী সব অফিস দুপুর আড়াইটা থেকে চারটা পর্যন্ত খোলা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। রেশন দোকানও ঐ সময় খোলা। ব্যাংকও তাই। আড়াইটা-চারটার মধ্যে টাকা তোলা যাবে। তবে দেড় হাজার টাকার বেশি নয়। বিকেলে ব্যাংক খোলা ভাবতে মজাই লাগছে। জরুরী সার্ভিস হিসাবে হাসপাতাল, ওষুধের দোকান, এ্যাম্বুলেন্স, ডাক্তারের গাড়ি, সংবাদপত্র ও তাদের গাড়ি, পানি, বিদু্যত, টেলিফোন, দমকল, মেথর ও আবর্জনা ফেলা ট্রাক- এগুলোকে হরতাল থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
|
উত্তাল ৪ঠা মার্চ: 'বীর বাঙালী অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো' স্লোগানে প্রকম্পিত সারা দেশ
স্বাধীনতার দাবিতে উত্তাল, অগ্নিগর্ভ পুরো দেশ। দেশমাতৃকাকে হানাদারমুক্ত করতে সবাই রাজপথে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে চলছে লাগাতার হরতাল। 'বীর বাঙালী অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো' স্লোগানে প্রকম্পিত শহর, বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ। অহিংস আন্দোলন-সংগ্রামে নয়, সশস্ত্র সংগ্রামই একমাত্র মুক্তির পথ, এটা বুঝতে বাঙালীর জাতির বাকি রইল না। তাই আন্দোলনের পাশাপাশি সারাদেশেই গোপনে চলে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি। উনিশশ' একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চের চার তারিখ ছিল দেশব্যাপী লাগাতার হরতালের তৃতীয় দিন। তবে এই দিন হরতাল ছিল আট ঘণ্টার। দ্রোহ-ক্ষোভে বঞ্চিত শোষিত বাঙালী তখন ক্রমেই ফুঁসে উঠছিল ঔপনিবেশিক পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। এক্ষেত্রে বসে নেই কুখ্যাত পাকিস্তানী বাহিনী। কারফিউ দিয়েও সামরিক জান্তারা সাহসী বীর বাঙালীদের ঘরে আটকে রাখতে না পেরে গোপনে আটতে থাকে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে বাঙালী নিধনের পরিকল্পনা। শুধু অপেক্ষা করতে থাকে ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কী বলেন তা শোনার জন্য। আন্দোলনের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা দফায় দফায় বৈঠকে বসেন ৭ মার্চের জনসভা সফল করার জন্য। তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) চলতে থাকে জনসভার প্রস্তুতি। পাশাপাশি ঢাকাসহ সারাদেশেই গঠন হতে থাকে সংগ্রাম কমিটি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের যুব ও ছাত্র নেতারা গোপনে নানা স্থান থেকে অস্ত্র সংগ্রহ অভিযান চালাতে থাকেন। একাত্তরের এই দিনে অর্থাৎ ৪ মার্চ, ১৯৭১ ক্ষুদ্ধ বাঙালীর মিছিলে মিছিলে ও ঝাঁঝালো স্লোগানে হচকচিত ছিল সারাদেশ। স্লোগানগুলো ছিল- 'বীর বাঙালী অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো', 'তোমার আমার ঠিকানা, পদ্ম-মেঘনা-যমুনা', 'তোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ। একাত্তরের উত্তাল, ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এই দিনটিতে সারাদেশের সকল পাড়া, গ্রাম, মহল্লায় সংগ্রাম কমিটির পাশাপাশি শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটি এবং স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠনের আহবান জানানো হয়। এর উদ্যোক্তা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হলের (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরল হক হল) ক্যান্টিনে স্থাপন করা হয় ছাত্রদের যোগাযোগ কেন্দ্র।
|
উত্তাল ৩রা মার্চ : স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করা হয় এই দিনে
একাত্তরে ৩ মার্চ ছিল রক্তঝরা দিন। পাক সেনাদের গুলিতে ঢাকা ও চট্টগ্রামে একশ’ ব্যক্তির প্রাণহানি হয় এই দিনে। স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেন তত্কালীন ছাত্রনেতা শাজাহান সিরাজ। একদিকে পাক সরকারের ষড়যন্ত্রমূলক বৈঠকের আমন্ত্রণ, অন্যদিকে জনতার বিক্ষোভ, হরতাল ও উত্তাল মিছিলে পাক সেনাদের গুলির মধ্য দিয়ে কাটে এই দিন। এই দিনে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী নিন্দা ও ব্যঙ্গাত্মক টেলিগ্রাম পাঠান শাসক ইয়াহিয়া খানের কাছে।
ছাত্রলীগ ও জাতীয় শ্রমিক লীগ আহূত এ সভায় স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেন ছাত্রনেতা শাজাহান সিরাজ। পল্টন ময়দানে নূরে আলম সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে ছাত্রলীগ আয়োজিত বিশাল জনসভায় স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রস্তাবিত জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন এবং জাতীয় পতাকা প্রদর্শিত হয়। এদিন সকাল থেকেই যথারীতি মিছিলের নগরী হয়ে ওঠে ঢাকা। শান্তিপূর্ণভাবে অর্ধদিবস হরতাল পালনের সঙ্গে সঙ্গে মিছিলে মিছিলে ঢেকে যায় পুরো নগরী। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে এদিন পার্লামেন্টারি গ্রুপের ১২ জন নির্বাচিত নেতাকে ১০ মার্চ বৈঠকে আমন্ত্রণ জানান ইয়াহিয়া খান। শেখ মুজিবুর রহমান এ আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন। একই দিনে মওলানা ভাসানীর তীব্র নিন্দাসূচক ও ব্যঙ্গাত্মক টেলিগ্রাম পৌঁছে ইয়াহিয়ার কাছে।
অগ্নিগর্ভ মার্চের বাঙালীর প্রবল আন্দোলনে দিশেহারা হয়ে পড়ে পাকিস্তানী সামরিক জান্তারা। কিভাবে বাঙালীর এই আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করা যায় সে ব্যাপারে নীলনকশা করতে থাকে সামরিক জান্তা ও তাদের এ দেশীয় দোসররা। বিশ্বের কাছে স্বাধীনতার জন্য বাঙালীর এই বাঁধভাঙ্গা আন্দোলন-সংগ্রামের খবর যাতে কোনভাবেই যেতে না পারে সে জন্য তৎপর হয়ে ওঠে পাক জেনারেলরা। শুধু সেন্সরশিপ আরোপই নয়, কোনভাবেই যাতে বাঙালীর আন্দোলন-সংগ্রামের খবর না ছাপা হয় সে জন্য প্রতিটি সংবাদপত্রের অফিসে ফোন বা স্বশরীরে গিয়ে হুমকি-ধমকিও দেয়া হয়।
বাঙালী জাতির এমনই আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় শুরু হয়েছিল প্রাণঘাতী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। প্রশিক্ষিত পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীকে পরাস্ত করে বীর বাঙালী বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ছিনিয়ে এনেছিল মহামূল্যবান স্বাধীনতা স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। কৃতজ্ঞ বাঙালী জাতি তাই নানা কর্মসূচীর মাধ্যমে স্মরণ করছে দেশমাতৃকার জন্য আত্মোৎসর্গকারী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের।
আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জেএসডি গতকাল ২ মার্চ প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন দিবস পালন করে। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস এ পতাকাকেই বাংলাদেশের পতাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
|
অগ্নিঝরা ২রা মার্চ: স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা উত্তোলন।
হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালী তার আত্মপরিচয়ের সন্ধান পেল যে মাসে তার নাম মার্চ। একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চ। কয়েক শতাব্দীর ঔপনিবেশিক দুঃশাসনের পাথার পেরিয়ে ১৯৪৭ সালে 'পাকিস্তান' নামে বাঙালীর ভাগ্যে যা জুটেছে, তা ভিন্নরূপে আরেক অপশাসন, নির্যাতন আর বঞ্চনা ছাড়া কিছুই নয়। বাঙালী জাতি ওই শোষণ-বঞ্চনার হাত থেকে মুক্তি পেতে নেমে পড়ে রাজপথে।
অগ্নিঝরা মার্চের দ্বিতীয় দিন আজ। একাত্তরের এই দিনে ঢাকাসহ পুরো বাংলাদেশ পরিণত হয়েছিল এক বিক্ষুব্ধ জনপদে। এদিন ওড়ানো হয়েছিল মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা। এর আগের দিন ১ মার্চ পাকিস্তানের ততকালীন শাসক ইয়াহিয়া খান এক ফরমানের মাধ্যমে জাতীয় পরিষদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে দেন। তার সেই অবৈধ এবং স্বৈরাচারী ঘোষণার মাধ্যমে বাঙালী জাতির কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিনিধি ক্ষমতায় যেতে পারবে না। স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু করা ছাড়া অধিকার আদায়ের আর কোন বিকল্প নেই। পাকিস্তানী শাসকদের এই মনোভাবের বিস্ফোরণ ঘটেছিল ২ মার্চ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার ছাত্র এদিন বটতলায় এসে জমায়েত হন। বটতলার সমাবেশে ইয়াহিয়ার স্বৈরাচারী ঘোষণার ধিক্কার জানানো হয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। বটতলার ঐতিহাসিক সমাবেশে ততকালীন ডাকসুর ভিপি আ স ম আবদুর রব স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকাটি উত্তোলন করেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের ৯ মাস এই পতাকাই বিবেচিত হয়েছে আমাদের জাতীয় পতাকা হিসেবে। এদিকে বঙ্গবন্ধুর ডাকে ততকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যান) আহূত ৭ মার্চের ঐতিহাসিক জনসভা সর্বাত্মকভাবে সফল করার প্রস্তুতি চালায় আওয়ামী লীগ। আর এই জনসভাকে কেন্দ্র করে মুক্তিপাগল বাঙালীর মধ্যে এক অন্য ধরনের গণজাগরণের সৃষ্টি হয়। পাক হানাদার বাহিনীর কর্তা ব্যক্তিদের ললাটেও তখন চিন্তার বলিরেখা। ওই জনসভায় বঙ্গবন্ধু কী স্বাধীনতার ডাক দেবেন? দিলে কি পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে- এ নিয়ে পুরো পাকিস্তানেই তোলপাড় চলছিল। একদিকে জনসভার প্রস্তুতি, অন্যদিকে গোটা বাংলাদেশেই উত্তাল আন্দোলন-বিক্ষোভে রীতিমতো অগ্নিগর্ভ অবস্থার সৃষ্টি হয়। প্রতিটি বাঙালীর চোখেমুখে একই প্রত্যাশা পাকিস্তানী দখলদারদের হটিয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ ছিনিয়ে আনা। আর সেই লক্ষ্য পূরণেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালীর দামাল ছেলেরা সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে
|
অগ্নিঝরা ১লা মার্চ: স্বাধীকার আন্দোলনের নতুর পর্যায়
রক্তঝরা-অগ্নিক্ষরা মার্চের প্রথম দিন আজ। উনিশ শ' একাত্তর সালের এই মাসে তীব্র তুঙ্গ আন্দোলনের পরিণতিতে শুরু হয় মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বিশ্ব মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটেছিল বাংলাদেশ নামক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা হলেও চূড়ান্ত আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ১ মার্চ। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এদিন বেতার ভাষণে ৩ মার্চের গণপরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। এ সময় ঢাকা স্টেডিয়ামে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম) পাকিস্তান বনাম বিশ্ব একাদশের ক্রিকেট খেলা চলছিল। ইয়াহিয়া খানের ওই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দর্শক খেলা ছেড়ে বেরিয়ে আসে। ততক্ষণে হাজারো মানুষ পল্টন-গুলিস্থানে বিক্ষোভ শুরু করে দিয়েছে। সেই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নেয়।
সেদিন মতিঝিল-দিলকুশা এলাকার পূর্বাণী হোটেলে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। ক্ষুদ্ধ ছাত্ররা সেখানে গিয়ে প্রথমবারের মতো স্লোগান দেয়, 'বীর বাঙালী অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর'। ছাত্ররা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে কর্মসূচী ঘোষণার দাবি জানায়। বিক্ষোভ- স্লোগানে উত্তাল ঢাকাসহ সারাদেশ। আর কোন আলোচনা নয়, এবার পাক হানাদারদের সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলার দাবি ক্রমশ বেগবান হতে থাকে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বাইরে চলছে বিক্ষুব্ধ বাঙালীর কঠোর কর্মসূচী দাবিতে মুহুর্মুহু শ্লোগান। বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু ২ ও ৩ মার্চ তৎকালীন পাকিস্তানে সর্বাত্মক হরতালের ডাক এবং ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসভার ঘোষণা দেন।
সেই শুরু এরপর ১ মার্চ পেরিয়ে ২ মার্চ। একে একে পার হয় ঝঞ্চাবিক্ষুব্দ ২৫টি দিন। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালীদের ওপর আক্রমণ চালায়, শুর হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। এই পথ ধরে বাংলার দামাল ছেলেরা এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনেন একটি স্বাধীন দেশ- বাংলাদেশ।
|