দীপন নন্দী : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেসরকারি হাসপাতালগুলোর প্রতি দুস্থ মানবতার সেবায় এগিয়ে আসার এবং স্বল্প খরচে দরিদ্র মানুষকে চিকিৎসা দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
শুক্রবার হোটেল সোনারগাঁওয়ে ল্যাব এইড কার্ডিয়াক হাসপাতালের উদ্যোগে আয়োজিত কার্ডিওলজি ও কার্ডিয়াক সার্জারি বিষয়ক তৃতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন এবং প্রথম ঢাকা লাইভ-২০০৯’র উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এ আহ্বান জানান।
শেখ হাসিনা কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে প্রতি মাসে অন্তত ১০ জন গরিব অথচ জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদানের আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের সমষ্টিগত উদ্যোগ একটি হাসপাতালের জন্য তেমন কোনো ব্যয়বহুল হবে না। কিন্তু তা অনেক মানুষের দুর্দশা লাঘবে সাহায্য করবে। তিনি চিকিৎসা ব্যয় কমানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে যে পরিমাণ চার্জ আদায় করা হয় তা আমাদের সাধারণ মানুষের ক্ষমতার বাইরে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, হৃদরোগ মানুষের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। প্রতি বছর হৃদরোগে মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েই চলেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে হৃদরোগ দিন দিন স্বাস্থ্যসেবা খাতে অন্যতম সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে। তিনি বলেন, ২০০৮ সালে সারা বিশ্বে প্রায় ১ কোটি ৮৭ লাখ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন, যা সব ধরনের মৃত্যুর শতকরা ৩৫ ভাগ। উদ্বেগের বিষয় হলো এই মৃত্যুগুলোর অর্ধেকেরও বেশি হয়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কা উন্নয়নশীল দেশগুলোর এক-চতুর্থাংশেরও বেশি লোকের প্রতিনিধিত্ব করছে। আর এই অঞ্চলে হৃদরোগের প্রকোপ ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশে হৃদরোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলো হচ্ছে- অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা, অত্যধিক মানসিক চাপ, ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত ব্যায়াম না করা।
শেখ হাসিনা বলেন, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান হৃদরোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা উভয় ক্ষেত্রে অনেক নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে, সেই সঙ্গে আবিষকৃত হয়েছে নতুন ওষুধসামগ্রী। হৃদরোগ মোকাবেলায় ওষুধ এবং প্রযুক্তি যেমন আবশ্যক, তেমনি এই রোগের কারণ ও তা প্রতিরোধ সম্পর্কে জ্ঞান থাকাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য এটা পরিষ্কার যে, হৃদরোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রতিরোধ করাই সর্বোত্তম উপায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় সংক্রামক ব্যাধি এবং প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা সবসময় প্রাধান্য পেয়ে আসছে। ফলে অন্যান্য জটিল রোগগুলো আড়ালে থেকে যায়। তাই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বিশেষ করে বাংলাদেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কৌশলে হৃদরোগ এবং তার প্রতিরোধ সম্পর্কিত বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
হৃদরোগ সম্পর্কে তার সরকারের সচেতনতার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, গ্রামাঞ্চলের জনগণের অনেকেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে অকাল মৃত্যুবরণ করছেন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে তাদের রোগ পর্যন্ত নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। তিনি এ ধরনের অকাল মৃত্যু বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর জোর দেন।
তিনি বলেন, সরকার এই গুরুত্ব অনুধাবন করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে প্রতিটি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং জেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্যাথলজি ল্যাবরেটরিসহ কার্ডিয়াক সার্জারি এবং হৃদরোগ চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধাসংবলিত হৃদরোগ বিভাগ স্থাপন করার নির্দেশ দিয়েছে। এর ফলে হৃদরোগে ভুগছেন দেশের এমন বৃহৎসংখ্যক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় দ্রুত ও কার্যকরী চিকিৎসা সুবিধা পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে। এছাড়া শিশুদের হৃদ রোগ চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, এই সম্মেলনে দেশ-বিদেশের বিখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এবং কার্ডিয়াক সার্জনদের মহামিলন ঘটেছে। তাদেরকে কাছাকাছি আসার এবং নিজেদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যম পরস্পরকে সমৃদ্ধ করার অপূর্ব সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যে পেশাগত বন্ধন ও সামাজিক সৌহার্দ্যও বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি এই সম্মেলনের আলোচনা ও উপস্থাপিত প্রবন্ধ থেকে তারা যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি দেশের হৃদরোগ চিকিৎসা সেবার মান বৃদ্ধির জন্য রোগ নির্ণয় ও প্রযুক্তিগত কৌশলের ক্ষেত্রে নতুন নতুন দিক-নির্দেশনা বেরিয়ে আসবে।
তিনি বলেন, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সরকারের একার পক্ষে সকল নাগরিকের শতভাগ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এখনও সম্ভব নয়। বরং দেশের এক বিরাট সংখ্যক মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পেয়ে থাকে বেসরকারি চিকিৎসক, হাসপাতাল এবং ক্লিনিকগুলো থেকে। ইদানিং সেরকারি খাতে দক্ষ চিকিৎসক ও আধুনিক যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ বেশ কয়েকটি বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপিত হয়েছে এবং এসব হাসপাতালে উন্নতমানের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
এই উদ্যোগ অবশ্যই আমাদের দেশের রোগীদেরকে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার ওপর নির্ভরতা অনেকখানি কমিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এতে বেঁচে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা। তারপরও দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলোর উন্নয়নের জন্য আরো অনেক কিছুই করণীয় রয়েছে। আমাদের দেশের অনেক বেসরকারি ক্লিনিকে পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি নেই, নেই দক্ষ চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ। অপচিকিৎসা ও ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর অভিযোগ শোনা যায়, তার ওপর বেসকরারি ক্লিনিক এবং ডায়গনস্টিক ল্যাবরেটরিগুলো থেকে সেবাপ্রাপ্তির ব্যয়ও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে তাঁর সরকার গত মেয়াদে সারা দেশে ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক করেছিল। কিন' বিএনপি সরকার সেগুলো চালু করেনি। বর্তমান সরকার আবার সেগুলো চালু করবে। প্রতি ছয় হাজার মানুষের জন্য একটি করে চিকিৎসাকেন্দ্র করা হবে। চার হাজার চিকিৎসক নিয়োগের কাজও শুরু হয়েছে।
শেখ হাসিনা স্বাস্থ্য ও ওষুধ নীতিকে যুগোপযোগী করায় তার সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে বলেন, সরকার স্বাস্থ্যসেবাকে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইতিমধ্যে প্রতি ৬ হাজার মানুষের জন্য একটি করে মেডিকেল সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নতুন ৪ হাজার চিকিৎসক নিয়োগেরও প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এছাড়া জনগণের চিকিৎসা সেবার মান বাড়াতে নার্স ও প্রয়োজনীয় মেডিকেল স্টাফ নিয়োগের কাজও শুরু হয়েছে। এই সম্মেলনের মাধ্যমে হৃদরোগ চিকিৎসার নতুন দিক নির্দেশনা পাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা প্রদান করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের সংখ্যা বাড়ছেই। বর্তমান সরকার সাধারণ মানুষের চিকিত্সাসেবাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দেন ল্যাব এইড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামীম আহমেদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রফেসর ডা. জালাল উদ্দিন। অনুষ্ঠানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দেশী-বিদেশী হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন।
|