আমার পরিবেশ হেলথ পলিটিক্স ফার্মাসিউটিক্যাল আমার বিনোদন হেলথ এনজিও বিউটি এন্ড ফিটনেস আমার ডাক্তার হসপিটাল মেডিকেল কলেজ

শতবর্ষী আন্তর্জাতিক নারী দিবসে প্রত্যাশ্যা: স্বাস্থ্যসেবায় সমসুযোগ ও অধিকার প্রতিষ্ঠা হউক

এম. দিদার হোসেন : প্রতিবছর ৮ই মার্চ বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস।১৯১১ সাল হতে আজ অবধি নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী দিবসটি স্বগৌরবে প্রতিষ্ঠিত। শত বছরের পরিক্রমায় নারী অধিকার আন্দোলনে দিবসটির তাৎপর্য আকাশচুম্বী। প্রতিবারের ন্যায় এবারও পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। অত্যন্ত সময়পোযোগী দাবী পুরণের লক্ষ্যে এবারের দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘সবার উন্নয়নে:সমঅধিকার ও সমসুযোগ’ ।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মুল প্রতিপাদ্য সত্যিকারার্থেই তাৎপর্য বহন করছে। বর্তমান সময়কার পৃথিবী উন্নয়নমুখীতায় অত্যাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। এটিকে সময়ের দাবী বললেও অত্যুক্তি হবেনা। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় সমঅধিকার এবং সমসুযোগ প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে। আবার এটি ব্যতিত উন্নয়ন সম্ভব নয়।সমাধান হতে পারে যেকোন উপায়ে সমঅধিকার এবং সমসুযোগ প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। আবারো প্রশ্ন বর্তমান  পেক্ষাপটে বাংলাদেশে নারী উন্নয়নে এ লক্ষ্যের সম্পুর্ন প্রতিফলন কি সম্ভব? যেহেতু সম্ভব নয়, সেহেতু আমাদের অগ্রাধিকার চিন্হিত করতে হবে। যেগুলোতে আমাদেরকে এ প্রেক্ষাপটে দাড়িয়েও  অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। অনেকগুলো অগ্রাধিকারের মধ্যে জাতির  প্রত্যাশা হতে পারে স্বাস্থ্যসেবায় সমসুযোগ ও অধিকার প্রতিষ্ঠা হউক।

প্রখ্যাত গবেষক সিদ্দিক ওসমানী ও নোবেল বিজয়ী প্রফেসর অমর্ত্য সেনের এক গবেষণায় দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ায় নারীদের হৃদরোগে মৃতু্বরণের হার প্রতি হাজারে ৪.৮ থেকে ৭.১ পর্যন্ত৷ প্রায় একই অবস্থা বহুমূত্র রোগের ক্ষেত্রেও বিরাজমান৷ আশঙ্কা করা হয় যে, দক্ষিণ এশিয়ার নারীদের স্তন ক্যান্সারের হারও অপেক্ষাকৃত বেশি৷ অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, দক্ষিণ এশিয়ানদের জিনে এমন কোনো বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা তাদেরকে এসব দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত করে৷ এছাড়াও  সাম্প্রতিককালে বিজ্ঞানীরা এক ভয়াবহ তথ্য দিয়েছেন৷ তাঁরা বলছেন, ভ্রুণ থেকেই আগত সন্তানের ভবিষ্যত স্বাস্থ্য নির্ধারিত হয়৷ অর্থাৎ ভ্রুণের স্বাস্থ্যের ওপর সন্তানের ভবিষ্যত স্বাস্থ্য অনেকাংশে নির্ভরশীল৷ বিজ্ঞানীরা এ প্রক্রিয়ার নামকরণ করেছেন ফিট্যাল প্রোগ্রামিং৷ অর্থাৎ গর্ভবতী মা অপুষ্ট হলে তার পেটে ভ্রুণ অপুষ্টিতে ভুগবে এবং স্বল্প ওজনের (আড়াই কেজির কম) সন্তান জন্ম দেবে৷ যে সন্তানরা পরিণত বয়সে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হবে৷ দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এক্ষেত্রে খুবই ঝুঁকিপূর্ন দেশ।

গবেষণায় প্রকাশ বাংলাদেশের শিশুদের শতকরা ৫০ ভাগ স্বল্প ওজন নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে যা পৃথিবীর প্রায় শীর্ষে৷ শতকরা ৯০ ভাগের বেশি শিশু কোনো না কোনোভাবে পুষ্টিহীনতায় ভোগে৷ সরকারী তথ্য অনুযায়ী, আমাদের দেশে প্রতি বছর আড়াই লক্ষ শিশু মরণব্যাধি নয় (ডায়রিয়া, ধনুষ্টঙ্কার), এমন রোগে মৃত্যুবরণ করে৷ এ সকল মৃত্যুর নেপথ্য এবং প্রকৃত কারণ অপুষ্টি৷ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ১৯৩৭ থেকে ১৯৮২ সময়কালে ১২ বছর বয়স্ক বাংলাদেশী ছেলেদের গড় উচ্চতা শতকরা ৭ ভাগ হ্রাস পেয়েছে৷ কয়েক বছর আগের একটি সরকারী হিসাব থেকে দেখা যায়, পুষ্টিহীনতার হার কমানো না গেলে পরবর্তী বছরে বাংলাদেশ ২৩০০ কোটি ডলার উত্‍পাদনশীলতা থেকে বঞ্চিত হবে৷ যা উন্নয়নে বাঁধা হবে।

প্রসবকালীন মৃত্যু, মাতৃমৃত্যুহার প্রভৃতি বাংলাদেশের নারী স্বাস্থ্যের উন্নয়নে সত্যিকারার্থে ঝুঁকি। মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জনের ক্ষেত্রেও এটি বাংলাদেশের জন্য হুমকি। উপরন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সমঅধিকারের নামে আমরা নারীদেরকে স্বাস্থ্যসেবায় আরো ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছি। এমন সব কায়িকশ্রম  আমরা তাদের দিয়ে সংঘটিত করছি, যেগুলো তাদের স্বাভাবিক বিকাশে মারাত্নক ব্যাঘাত সৃষ্টি করে।
এ সব প্রতিকূল পরিস্থিতির অবসান তাহলে কোন পথে? হতে পারে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে  নারী-পুরুষের সমতা ও সমসুযোগ নিশ্চিত করা৷ তৃণমুল পর্যায়ে হাজারো নারী প্রসবকালীণ সময়ে চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে ও দেশে মারাত্নক বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাব, কুসংস্কার, যৌন নিপীড়ন প্রভৃতি নারীদেরকে স্বাস্থ্যসেবায় সমসুযোগ ও সমঅধিকার থেকে বঞ্চিত করে। তাই এসব প্রতিবন্ধকতা দুরীকরণে আমাদেরকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে এখনই।

নারীর প্রতি বৈষম্য দূর হলে, নারী অপুষ্ট হবে না, ফলে ভ্রুণ হবে স্বাস্থ্যবান৷ জাতি রক্ষা পাবে সম্ভাবনাহীন প্রজন্ম থেকে৷ এটা অর্জন করতে বাল্যকাল থেকেই কন্যাশিশুর স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে৷ না হয় এর পরিণতি হবে আমাদের সকলের জন্যই ভয়াবহ৷ এই বৈষম্যের ফলে নারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাদের স্বাস্থ্যে সুরক্ষায়৷ অর্থাৎ অপুষ্ট কিশোরী থেকে অপুষ্ট গর্ভবতী, অপুষ্ট গর্ভবতী থেকে অপুষ্ট মা, এবং সবশেষে অপুষ্ট সন্তান৷ এভাবেই শত শত বছর ধরে নারী অপুষ্টির 'দুষ্টচক্রে' আবর্তিত হচ্ছে৷ আমরাও এই দুষ্টচক্রের অংশ৷ আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যত সন্তানও তাই৷ অপুষ্ট সন্তান বেড়ে ওঠে অস্বাভাবিকভাবে৷ অপুষ্ট সন্তানের চিন্তা-চেতনা, আচরণ, অভ্যাস সবই এলোমেলোভাবে বিকশিত হয়৷ এ সন্তানরা হয়ে ওঠে প্রত্যাশাহীন ও অসচেতন নাগরিক৷ তাই শতবর্ষী এবারের  আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আমাদের প্রত্যাশ্যা হওয়া উচিত  স্বাস্থ্যসেবায় নারীদের সমসুযোগ ও অধিকার প্রতিষ্ঠা হউক।