নাজিবুল্লাহ: ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অবদান সর্বজনবিদিত। ১৯৪৭, ৪৮ এবং৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি পর্বে এই মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র সমাজের সাহসী ও প্রতিবাদী ভূমিকা ছিল গৌরবজনক। তখনকার শিক্ষার্থীরা এ আন্দোলনের পক্ষে সুসংগঠিত হয়ে দলে দলে যোগদান করে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট ভারত বর্ষ বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্টের জন্ম হয়। শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীদের উপর নেমে আসে নির্যাতন আর ষড়যন্ত্র। পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষের মাতৃভাষা বাংলার উপর নেমে আসে আক্রমণ। তাঁরা সুকৌশলে অফিস-আদালত , টিকেট, খাম ইত্যাদিতে বাংলার পরিবর্তে উর্দু চালাতে শুরু করে। এমনি এক ছায়াচ্ছন্ন পরিবেশে এসবের বিরুদ্ধে গর্জে উঠে শিক্ষিত বঙ্গ সন্তানেরা। দেশ বিভাগের মাত্র ১৭ দিনের মাথায় ১৯৪৭ সালের ১লা সেপ্টেম্বর গড়ে উঠে তমদ্দুন মজলিস নামক একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। তারাই সর্বপ্রথম বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক আন্দোলনের সূচনা করেন। তমদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবুল কাসেমের ১৯নং আজিমপুরের বাসা ছিল এই সংগঠনের প্রথম অফিস। এখান থেকেই ভাষা আন্দোলনের ঘোষণাপত্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু প্রকাশিত হয়। এরপর ১৯৪৭ সালের ১লা নভেম্বর তমদ্দুন মজলিসের অফিস ১৯নং আজিমপুর থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সংলগ্ন রশিদ বিল্ডিংয়ের দোতালায় স্থাপন করা হয়। এর ফলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীরা সহজে যাতায়াত ও প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা পেয়েছিল। পরে ১৯৪৮ সালে জানুয়ারী মাসে ভাষা আন্দোলন বিরোধীদের দ্বারা তমদ্দুন মজলিস অফিস আক্রান্ত হলে আবার ১৯নং আজিমপুরেই এটি স্থানান্তরিত করা হয়। ১৯৪৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে সর্বপ্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। অধ্যাপক নূরুল হক ভূইয়াকে এই সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক করা হয়। সে সময় মির্জা মাজহারুল ইসলাম ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। ভাষা আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্ন আন্দোলনের সাথে জড়িত থেকে এবং নেতৃত্ব দিয়ে আন্দোলনকে শক্তিশালী করণে তিনি গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেন। ভাষা সৈনিক মির্জা মাজহারুল ইসলাম ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট প্রসংঙ্গে সাক্ষাতকারে বলেন, অনেক আন্দোলন ও ত্যাগের পরে বৃটিশরা এ উপমহাদেশ থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু এ উপমহাদেশে তারা স্থায়ীভাবে দ্বন্দ্ব ও কলহকে জিইয়ে রাখতে ভারত ও পাকিস্তানকে আলাদা করে এমনভাবে যাতে রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব না হয়। ধর্মীয় সংখ্যা গরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পাকিস্তান ও পূর্ব বঙ্গ (পশ্চিম পাকিস্তান নামে) একটি আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠলেও দুই দেশের মধ্যে রয়েছে বিশাল আয়তনের ভারত। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪৪% এর আবাস পশ্চিম পাকিস্তান আর বাদ বাকি ৫৬% মানুষ থাকত পূর্ব পাকিস্তানে। তার মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানে আবার অনেকগুলো ভাষা। অথচ পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সবারই মুখের ভাষা বাংলা। অথচ পাকিস্তানের স্বাধীনতার পরপরই ওরা পোষ্টকার্ড, মানিঅর্ডার ফরম টাকাসহ যাবতীয় মাধ্যমে উর্দু ভাষার ব্যবহার চালু করে। সাথে সাথে চাকরি বাকরিতে উর্দু ভাষীদের আধিপত্য সৃষ্টি হয়। বড় বড় সরকারি অফিস ও প্রশাসনিক কার্যালয়ে উর্দু ভাষার প্রচলন করা হয় একচেটিয়াভাবে। এছাড়ও এক লক্ষাধিক জনঅধ্যুষিত ঢাকা শহরে প্রায় দুই লক্ষ উর্দুভাষী মোহাজের এসে এদেশের জনগণের মনে ভীতি সঞ্চার করে। উচ্চ শিক্ষা ও সরকারি চাকরির প্রতিযোগীতায় বাংলাভাষাকে উপেক্ষা করে উর্দুকে চাপিয়ে দেয়া হয়। এসব কারণেই মূলত ভাষা আন্দোলনের সৃষ্টি হয়। এরপর হরতাল, বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ, স্মারকলিপি প্রদান ইত্যাদির মাধ্যমে প্রায় দীর্ঘ সাড়ে ৪ বছর ধরে চলতে থাকে আন্দোলন সংগ্রাম। ঢাকা মেডিক্যাল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই এ আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এসময় অনেকে আহত ও গ্রেফতার হন। ১৯৪৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদের ভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রত্যাখ্যান করায় ২৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবিতে স্লেগান দিতে দিতে ছাত্ররা সেদিন মেডিক্যাল কলেজের শ্রেণী কক্ষ থেকে বের হয়ে রাজপথে চলে আসে। ঐদিন ঢাকা মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অধ্যাপক আবুল কাসেমের নেতৃত্বে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে সর্বাত্বক সাধারন ধর্মঘট পালিত হয়। এটা ছিল ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তথা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এ দেশে প্রথম সফল হরতাল। এই হরতালে সফলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীরা গুরুত্ব পূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই দিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে সচিবালয়ের উদ্দেশ্যে আগত মিছিলটি হাই কোর্টের সামনে বাধার সম্মুখিন হয়। ১৯৪৮ সালের ১৫ মার্চ আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করে তৎকালীন প্রাদেশিক সরকার ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। সরকারের সাথে বাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ৮ দফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ভাষা আন্দোলনের মূল নেতা অধ্যাপক আবুল কাসেমের সাথে প্রধান ভূমিকা পালন করেন ভাষা সৈনিক শামসুল আলম, গাজীউল হক, আলি আহাদ, শেখ মুজিবর রহমান, কাজী গোলাম মাহবুব, শামসূল হক প্রমূখ। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন দূর্বার গতি লাভ করে। রাষ্ট্র ভাষার চুক্তি ভেঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারী পল্টন ময়দানে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা করার ঘোষনা দেন। এরপর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সর্বাত্বক আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। এই আন্দোলনের চুড়ান্ত পর্যায়ে ২১ ফেব্রুয়ারী বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেয়। সেদিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার সমাবেশে ব্যাপক লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস ও গুলি বর্ষণ করে। এসময় রক্তের স্রোত বন্ধ করতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী ও ডাক্তারগণ যে অবদান রেখেছেন তা ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। আহতদের আর্তচিৎকারে যে অভাবনীয় হৃদয় বিদারক ঘটনা অবতারন করেছিল তার স্বাক্ষী হয়ে আছেন তারাই। আহতদের প্রতি তাদের সাহায্যের কথা জাতি সব সময় স্মরণ রাখবে। এভাবে ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি পদক্ষেপে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীরা সক্রিয় আবদান রাখেন।
|