জাফর সাদেক শিবলী :
সারাদেশে মাদক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সন্তোষজনক নয়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মাদকাসক্তের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, মাদক ও মাদকজাত দ্রব্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের নতুন কোন কর্মসূচী নেই। এমতাবস্থায় দেশের যুবশ্রেণী মারাত্বক স্বাস্থ্য হুমকির মুখে।
মাদকের ক্রমবৃদ্ধির সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছেনা অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ। এমনকি প্রয়োজনীয় পদের প্রায় অর্ধেক এখনো খালি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণী পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের ১৪৩টি পদের মধ্যে ৭০টি পদই খালি। যার কারনে অধিদপ্তরের কার্যক্রমে অনেকটা স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। এছাড়া তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেনীর পদগুলোও অর্ধেকের বেশি খালি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মনোয়ার ইসলাম বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে সংস্থাপণ মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছি। সেখান থেকে গ্রীণ সিগন্যাল আসলেই নতুন নিযোগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে।’
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে বর্তমানে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৫২লাখেরও বেশি। যুবক ও ছাত্র-ছাত্রীরাই মাদকের প্রদান গ্রহীতা। অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী মোট মাদকাসক্তের মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগই কিশোর, যুবক ও ছাত্র-ছাত্রী। নারী মাদকাসক্তের সংখ্যা দুই লাখের মতো। ধূমপানে আসক্তদের শতকরা ৬৫ ভাগ ছাত্র, আট ভাগ ছাত্রী। অ্যালকোহলে আসক্ত ১৪ শতাংশ ছাত্র, চার শতাংশ ছাত্রী। ফেনসিডিল, গাঁজা, ঘুমের ওষুধে আসক্ত ৭০ শতাংশ ছাত্র, দুই শতাংশ ছাত্রী। বর্তমান বিশ্বে মাদক তৃতীয় বৃহত্তম ও লাভজনক ব্যবসায় রুপ নেয়ায় চোরাকারবারীরা এই ব্যবসার দিকে ঝুঁকছে।
১৯৯০ সালে প্রেসিডেন্টের সচিবালয়ের অধীনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অঘিদপ্তর(ডিএনসি)-র কার্যক্রম চালু হয়। বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের অধীনে এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু এতসব অদল বদলের পরও মাদকদ্রব্য নিয়ে তেমন কার্যকর পদক্ষেপ হাতে নেয়া হয়নি।
পাশ্ববর্তীদেশ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা সহ উপমহাদেশের বেশ কয়টি দেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণে থাকা লোকদের নিরাপত্তা দিতে অত্যাধুনিক অস্ত্র সরবরাহ করা হলেও দেশে সেরকম কোন ব্যবস্থা নেই বলে কয়েকজন মাঠকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অধীনে কর্মরত এক ইন্সপেক্টর বলেন, আমরা সূত্রের ভিত্তিতে অভিযানে যখন মাঠে যাই, তখন ভারী অস্ত্রশস্ত্র সজ্জিত শক্তিশালী কোন মাদকপাচারকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারিনা। আমারহেলথের সাথে কথা বলার সময় তিনি অস্ত্রের ব্যাপারে মহাপরিচালকের দৃষ্টি আকর্ষণের অনুরোধ জানান।
জানা গেছে, সড়কপথ ও জলপথ দিয়ে দেশের দক্ষিণ,উত্তর পশ্চিমাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চল দিয়ে অপ্রতিরোধ্যভাবে মাদকদ্রব্য আসছে । তবে এ নিয়ে প্রশাসন আগের মতই নিশ্চুপ। কর্মকর্তা ও মাঠ পর্যায়ের কর্মীদেরকে সঠিক নির্দেশনা ও সাপোর্ট না দেয়ায় এমনটি ঘটছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের পাশাপাশি ডাব্লিউবিবি ট্রাস্ট, আপন, মধুমিতা, ঢাকা আহসানিযা মিশন সহ দেশের প্রায় শতাধিক এনজিও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ও মাদকাসক্তদের পূণর্বাসনে কাজ করছে। এক্ষেত্রে অধিদপ্তর থেকে একহাজার টাকায় একটি লাইসেন্সের প্রয়োজন হয় বলে অধিদপ্তরের প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে।
দেশে ক্রমবর্ধমান মাদকগ্রহণের হার বৃদ্ধি ও এর বর্তমান অবস্থা নিরসনে করণীয় সম্বন্ধে জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মনোয়ার ইসলাম বলেন, ‘আমি যদিও সবেমাত্র দায়িত্ব নিয়েছি, তারপরও সারাদেশকে মাদকমুক্ত করতে একটি বড় ধরনের ধাক্কা দেয়ার পরিকল্পনা আমার আছে।’
তিনি আরো বলেন, আমাদের সবাইকে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে। ‘এটা খুবই সত্য যে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে যারা কাজ করেন তাদের অঘিকাংই দূণীতিগ্রস্থ্য’। মাদক প্রশাসন, সরকার ও মিডিয়ার দায়িত্বশীলতাই পারে এসব অনাকাংঙ্খিত অবস্থা থেকে আমাদের মুক্তি দিতে। মাদকের পাচার রোধে ‘সাপ্লাই’ ও ‘ডিমান্ড’ বন্ধ করা খুবই জরুরী।
|