আমার পরিবেশ হেলথ পলিটিক্স ফার্মাসিউটিক্যাল আমার বিনোদন হেলথ এনজিও বিউটি এন্ড ফিটনেস আমার ডাক্তার হসপিটাল মেডিকেল কলেজ

কিডনী রোগী বাড়ছে আশংকাজনক হারে, প্রতিরোধে নেই তেমন কার্যকরী পদক্ষেপ

ফয়সাল আকবর:

পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ মুহূর্তে বাংলাদেশে ২ কোটি লোক কোনো না কোনোভাবে কিডনী রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে প্রতি বছর প্রায় ৪০ হাজার রোগীর কিডনী সম্পূর্ণরূপে বিকল হয়। গত ১০ বছরে ক্রনিক কিডনী রোগের হার ৫০ ভাগ বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে শতকরা ১৮-তে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী ১০ বছরে ২৮-৩০ শতাংশে দাঁড়াবে যা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ব্যাপার। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, কিডনী ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও বারডেম এবং ন্যাশনাল কিডনি ইন্সটিটিউট অব কিডনী ডিজিজেজ অ্যান্ড ইউরোলজিতে কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করা যায়। এছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ৪০টির মতো ডায়ালাইসিস ইউনিট রয়েছে। সরাকরি ও বেসরকারিভাবে যে সেবা চালু রয়েছে তা প্রয়োজনের চাহিদার তুলনায় তা অপর্যাপ্ত।

কিডনী চিকিৎসা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কিডনী অকেজো রোগীদের মাত্র শতকরা ১০ ভাগ রোগীর সামর্থ্য আছে চিকিৎসা করার। বাকি ৮০-৯০ শতাংশ রোগীই চিকিৎসার সামর্থ্যের অভাবে মারা যায়। বর্তমানে একজন কিডনী রোগী সপ্তাহে দুইবার হেমোডায়ালাইসিস করলে বছরে খরচ হয় ২ লাখ ও ৩ বার ডায়ালাইসিস করলে বছরে খরচ হয় আড়াই লাখ টাকার মতো। কিডনী রোগে আক্রান্তদের মধ্যে  বেশির ভাগই চিকিৎসার অভাবে মারা যায়। অপরদিকে কিডনী রোগীর চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে ৯০ ভাগ পরিবার জায়গা জমি বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হয়ে যায় বলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান।

কিডনী রোগের ভয়াবহ তথ্য স্বভাবতই আতংকিত হওয়ার মত। আর অনেকেই সারাদেশের কিডনী রোগের এ অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে রমরমা ব্যবসা। বাংলাদেশের অঙ্গ সংস্থাপন আইনকে ভঙ্গ করে অনেকে লোক অসাধু পথ অবলম্বন করেছে। সাধারণত অঙ্গ সংস্থাপন আইন অনুযায়ী শুধুমাত্র নিকট আত্মীয় যেমন বাবা-মা, আপন ভাই-বোন, চাচা, মামা, খালা, ফুফু, স্বামী ও স্ত্রী এর মধ্যে একে অপরকে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে বিনিময় বিহীন কিডনী দান করতে পারেন। এই আত্মীয়তা সমপর্ক প্রমাণের জন্য বিভিন্ন ধরণের কাগজপত্র ছাড়াও ক্ষেত্র বিশেষে ডিএনএ, টেষ্টের প্রয়োজন হতে পারে। যে কোন ধরণের অনাত্মীয় এর নিকট থেকে কিডনি গ্রহণ কিংবা কিডনি কেনা বেচা আমাদের দেশের আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও শাস্তিমূলক অপরাধ। এক্ষেত্রে শাস্তি ৭ বছর সশ্রম কারাদন্ড ও তৎসহ আর্থিক জরিমানা। কিডনী ট্রান্সপ্লান্টের জন্য প্রাথমিকভাবে কিডনী দাতা ও গ্রহিতার রক্তের গ্রুপ, টিস্যু মেচিং ও টিস্যুক্রশম্যাচ প্রয়োজন হয়। এগুলো মিলে গেলে কিডনী দাতার শরীর থেকে একটি কিডনী অপসারণ করলে কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে কিনা তা বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চত করা হয়। অথচ আজকে এ বিষয় নিয়ে চলছে প্রতারনা।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, কিডনী রোগের প্রধান কারণ নেফ্রাইটিস। এটা জীবাণুর কারণে হয়ে থাকে আবার অজ্ঞাত কারণেও হতে পারে। প্রস্রাব দিয়ে এলবুমিন নির্গত হওয়া এবং শরীর ফুলে যাওয়া নেফ্রাইটিসের লক্ষণ। ভেজাল খাদ্য এবং বিষাক্ত দ্রব্যের সংমিশ্রণে তৈরি খাদ্যসামগ্রীর কারণে এই রোগ দ্রুত বাড়ছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। ভেজাল ও বিষাক্ত খাদ্যসামগ্রী বাংলাদেশে কিডনী রোগ বৃদ্ধির প্রধান কারণ বলে তারা মনে করেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা আরো বলেন, যাদের বয়স ৪০ বছরের উপরে তাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ প্রস্রাবে এলবুমিন নির্গত হচ্ছে কিনা তা বছরে একবার পরীক্ষা করে দেখা উচিত। যাদের বংশে কিডনী রোগী আছে, তাদের পরিবারের সকল সদস্যের প্রস্রাব ও রক্তের ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন।  

জাতীয় কিডনী ও ইউরোলজী ইনষ্টিটিউট এর ইউরোলজী বিভাগের প্রধান অধ্যাপক জামানুল ইসলাম ভূইয়া বলেন, বাংলাদেশে কিডনি রোগের অবস্থা ভয়াবহ, এ রোগ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে কারণ বাংলাদেশের মানুষ এখনো অসচেতন। সাধারণত চর্ম রোগ, পাথর হওয়া, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস এসব কারনে কিডনী রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে পরিবেশদুষণগত কারনে এ রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি আরো জানান, দেশে প্রতি ২০ লাখ লোকের জন্য আছেন মাত্র একজন কিডনী বিশেষজ্ঞ সেখানে কিডনী রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্যসেবার জন্য জনগনের সচেতনতা যেমন অপরিহার্য তেমনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, মিডিয়াকেও এ ব্যাপারে ভুমিকা রাখতে হবে।

কিডনী ফাউন্ডেশনের সভাপতি প্রফেসর হারুন-উর-রশিদ বলেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অসুবিধা হলো দীর্ঘস্থায়ী কিডনী রোগের কোন উপসর্গই পরিলক্ষিত হয় না। বছরের পর বছর তারা ডাক্তারের শরণাপন্নও হয় না। যখন লক্ষণ দেখা দেয়, তখন তাদের মধ্যে ৭৫ ভাগেরই কিডনী অকেজো হয়ে যায়। তিনি জানান,  কিডনী ফাউন্ডেশন এ পর্যন্ত ১৪০ জন রোগীর দেহে সফলভাবে কিডনী সংযোজন করেছে। ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আগামী জুন থেকে মিরপুরে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট একটি কিডনী হাসপাতাল চালু হচ্ছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী আ.ফ.ম. রুহুল হক এ বিষয়ে বলেন, কিডনী ডায়ালসিসকে সকলের আয়ত্বে আনতে সরকার সরাদেশের সকল জেলা হাসপাতালে কিডনী ডায়ালাইমসিস করার ব্যবস্থা করা হবে। এজন্য ২ থেকে ৩ বছর সময় লেগে যেতে পারে। যে কোন চিকিৎসা যত ব্যায় বহুলই হোকনা কেন সরকারী হাসপাতালে তা প্রদান করা হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও জনান ঢাকা শহরে আরও কয়েকটি শিশু হাসপাতাল স্থাপনে পরিকল্পনা হাতে নেয়া হচ্ছে।