আমার পরিবেশ হেলথ পলিটিক্স ফার্মাসিউটিক্যাল আমার বিনোদন হেলথ এনজিও বিউটি এন্ড ফিটনেস আমার ডাক্তার হসপিটাল মেডিকেল কলেজ

জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশ ৭০ হাজার কোটি টাকা সাহায্য চাইবে

এইচ এম দিদার

বাংলাদেশ খুব শীঘ্রই অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন জলবায়ু সন্মেলনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিকট ৭০ হাজার কোটি টাকা সাহায্য চাইবে । জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে যে ঝুঁকি ও হূমকির সম্মূখীন হবে তার প্রভাব মোকাবেলার জন্য এ সাহায্য প্রয়োজন বলে বাংলাদেশের নীতি নির্ধারকরা মনে করছেন।গত ৩ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের স্ট্যান্ডিং কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে কোপেনহেগেন সন্মেলন সম্পর্কিত এক প্রস্তুতিমূলক বেঠক শেষে একথা জানানো হয়। কমিটির প্রধান আব্দুল মোমিন তালুকদার বলেন আমরা নদী সংস্কারের জন্য ৩৮ হাজার কোটি টাকা সহ মোট ৭০ হাজার কোটি টাকা প্রদানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিকট দাবী জানাবো।
উল্লেখ্য আগামী ৭ থেকে ১৮ ডিসেম্বর ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সম্মেলনে যোগদান করে পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের অবস্থান এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরবেন বলে সরকারী মহল থেকে জানানো হয়েছে বিভিন্ন সময়ে ।
বহুল প্রত্যাশিত এবং গুরুত্বপূর্ণ এ সন্মেলনে সল্পোন্নত দেশগুলোর পরিবেশ ঝুঁকি মোকাবিলার উপায় খুঁজে বের করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহের জন্য করণীয় নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হবে। পরিবেশবিদদের ভাষ্যমতে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে বর্তমানে ১০টিরও বেশি দেশ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ১৭ ও ১৮ ডিসেম্বর সম্মেলনের মূল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। অধিবেশনে বিশ্বের ১৯২টি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিগণ অংশ নেবেন। ৬০টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা  অধিবেশনে যোগ দিয়ে বিশ্বে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ এই সমস্যার কথা তুলে ধরবেন। পরিবেশবিদদের ভাষ্যমতে, স্বল্পোন্নত যে সব দেশ বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন সেগুলো হচ্ছেঃ হন্ডুরাস, বাংলাদেশ, নিকারাগুয়া, ভিয়েতনাম, ডোমিনিক্যান রিপাবলিক, ভুটান, মালদ্বীপ, টোবাগো, কিরিবাতি, কোষ্টারিকা অন্যতম।
বর্তমানে উন্নত বিশ্বের শিল্প বর্জ্য নিঃসরণ এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে স্বল্পোন্নত দেশগুলো মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অধিক মাত্রায় কার্বনডাইঅক্সাইড নির্গত হওয়ার ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে ভূপৃষ্ঠ ও পরিবেশের ওপর। এর বাইরে অধিক মাত্রায় রাসায়নিক বিষক্রিয়া ও গাছপালা উজাড় হওয়ায় ঝড়, জ্বলোচ্ছ্বাসসহ মারাত্মক প্রাকৃতিক বিপর্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেসব রাষ্ট্র-এর ক্ষতিকর প্রভাবে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে সে জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা নিজেরা দায়ী নয়। উন্নত দেশগুলোর রাসায়নিক পরীক্ষা ও নির্বিচারে পরিবেশ বিধ্বংসী কাজের জন্য এই পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে
বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
স্বল্পোন্নত দেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের এ ধরণের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলায় পর্যদুস্ত একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বরাবরই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা রেখেছে। কেননা জনসংখ্যাবহুল বাংলাদেশ পরিবেশ বিপর্যয়গত কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এর মাত্রা হবে আরো ভয়াবহ । সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে অদূর ভবিষ্যতে মালদ্বীপের মত সমুদ্র উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো বিলীন হয়ে যেতে পারে। সম্প্রতি মালদ্বীপের মন্ত্রী পরিষদ এই আশঙ্কার প্রতিবাদ হিসেবে সমুদ্রের তলদেশে মন্ত্রী পরিষদের বৈঠকের মহড়া দিয়ে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন । একইভাবে অতিসম্প্রীতি নেপালের মন্ত্রীপরিষদ হিমালয়ের চুড়ায় সম্পন্ন করে গুরূত্বপুর্ণ বৈঠক।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিবেশের বিষয়ে সবচেয়ে সোচ্চার সরকার প্রধানদের অন্যতম একজন হিসেবে ইতোমধ্যে পরিচিত হতে সক্ষম হন । ইতোপূর্বেও তিনি জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন। গত মাসে ইটালির রাজধানী রোমে খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক বিশ্ব শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা  বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সর্বাধিক ঝুঁকিতে থাকা স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে জাতিসংঘ ও উন্নত দেশগুলোর প্রতি আহবান জানান। এ ব্যাপারে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এসব দেশকে আলাদা একটি গোষ্ঠী হিসেবে দেখারও আহবান জানান।এছাড়াও অক্টোবরে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে ইউরোপিয়ান ডেভেলপমেন্ট দিবস-২০০৯ সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের (আইপিসিসি) এক মূল্যায়ন রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ঊষ্ণায়নের কারণে বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্ব চরম ও নজিরবিহীন প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাতের মুখে পড়েছে। এ দুর্যোগ ধনী, উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত সব দেশের জন্য সমান।
ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর ডিজাস্টার রিডাকশন বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ বন্যার ঝুঁকি, তৃতীয় সর্বোচ্চ সুনামি ও ষষ্ঠ সর্বোচ্চ ঘূর্ণিঝড় ঝুঁকির দেশ হিসেবে অভিহিত করেছে । বৈজ্ঞানিক তথ্য উপাত্ত আভাস দিচ্ছে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বৃদ্ধি পেলে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনভূমি ইউনেস্কো ঘোষিত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট সুন্দরবনসহ বাংলাদেশের এক-চতুর্থাংশ পানির নিচে তলিয়ে যাবে।
তবে সবচেয়ে বিপজ্জনক হচ্ছে হিমালয়ের বরফ দ্রুত গলে যাওয়া। এর ফলে জলবায়ু পরিবর্তন দ্রুত মধ্যম পর্যায়ে চলে আসবে। এ অবস্থা  হলে বাংলাদেশে অনিয়মিত ও মৌসুমের দীর্ঘস্থায়ী বন্যা ও খরার সৃষ্টি হবে। আর এতে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের চার কোটি লোকের জীবিকা নির্বাহের উপায় রুদ্ধ এবং দুই কোটি মানুষ তাদের আবাসস্থান চ্যুত হবে। ফলশ্রুতিতে আমাদের নগরগুলো জনস্রোতে স্ফীত হয়ে উঠবে। সামাজিক বিশৃংখলা, অবকাঠামো সংকট ও দারিদ্র্য বাড়বে এবং সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জন ব্যর্থ হবে।
স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি জানান বাংলাদেশ আসন্ন সম্মেলনে পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে ঝূকিপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে উন্নত দেশগুলো এবং জাতিসংঘের কাছে ক্ষতিপূরণের দাবি উত্থাপন করবে। তারই প্রস্তুতি ও পর্যালোচনা সম্পন্ন করার অংশ হিসেবে তারা এ বৈঠকের আয়োজন করেন। ধারণা করা হচ্ছে সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী সরকার ও রাষ্ট্র প্রধানগণ বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা তথা  পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে আলোচনার পর একটি সমঝোতা স্মারক এবং চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারেন।