আমার পরিবেশ হেলথ পলিটিক্স ফার্মাসিউটিক্যাল আমার বিনোদন হেলথ এনজিও বিউটি এন্ড ফিটনেস আমার ডাক্তার হসপিটাল মেডিকেল কলেজ

যক্ষ্মায় বছরে আক্রান্ত ৩ লাখ, মৃত্যু ৭০০০০: প্রতিরোধে দরকার ব্যাপক সচেতনতা

ফয়সাল আকবর:

দেশে প্রতি বছর প্রায় তিন লাখ মানুষ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়। এদের মধ্যে প্রায় ৭০ হাজার এ রোগে মারা যান। প্রতি দু’মিনিটে একজন করে মানুষ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়। কেবল যক্ষ্মা রোগে মৃত্যুবরণ করে প্রতি বছর ৭০ হাজার মানুষ; অর্থাৎ প্রতি ১০ মিনিটে একজন যক্ষ্মায় মৃত্যুবরণ করে। তবে প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী সংক্রামক যক্ষ্মা রোগীদের সঙ্গে চলাফেরা, ওঠাবসার দরুন বছরে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে ১০৫ জন লোক সংক্রামক যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয় এবং ২৩৪ জন নতুন যক্ষ্মা রোগী সংক্রামক ও অসংক্রামক সব ধরনের যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়। এছাড়াও বছরে নতুন সংক্রামক ও অন্যান্য যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে আরো প্রায় ১ লাখ ৬২ হাজার।  অপ্রতুল চিকিৎসার কারণে দেশ থেকে যক্ষ্মা রোগ নির্মূল করা যাচ্ছে না। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশ দূষণকারী যান্ত্রিক যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি, শব্দ দূষণ ও শিল্প-কারখানার নির্গত ধোঁয়ার কারণে বাংলাদেশে বক্ষব্যাধি ও হৃদরোগীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।

চিকিৎসক ডা. প্রভাত চন্দ্র বড়ুয়া জানান, বিশ্বের ২২টি দেশে যক্ষ্মার প্রকোপ সবচে বেশি। এর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। এদেশে প্রতি দুই মিনিটে একজন যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন এবং প্রতি ১০ মিনিটে একজন মারা যান। যক্ষ্মা রোগীর কফ, হাঁচি ও কাশির মাধ্যমে জীবাণুর সংক্রমণ হয়। যক্ষ্মা রোগীদের ৮৫ ভাগই ফুসফুসের যক্ষ্মায় আক্রান্ত। এছাড়া মানবদেহের হাড়, গ্রন্থি, প্রজননতন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্রসহ অন্যান্য অঙ্গেও এ জীবাণুর সংক্রমণ হয় বলে জানান তিনি। প্রভাত চন্দ্র বলেন, "এ রোগের যথাযথ চিকিৎসা ও নিরাময় সম্ভব। তারপরও এটি নিঃশব্দ মারণব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। চিকিৎসা ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদী হওয়ায় এবং সামাজিক সচেতনতার অভাবে যক্ষ্মা প্রতিরোধ কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।"

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ডা. শাহ মনির হোসেন বলেন, সরকার ও বিভিন্ন এনজিও’র সহযোগিতায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ প্রোগ্রাম চালাচ্ছে। ব্র্যাকের মাধ্যমে ডস কার্যক্রম ইতিমধ্যে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে বেশ সাফল্য দেখাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ১৯৫৫ সালে ঢাকার মহাখালীতে স্থাপিত হাসপাতালটিই (টিবি হাসপাতাল) বাংলাদেশের বড়্গব্যাধি আক্রানত্ম রোগীদের চিকিৎসার একমাত্র জাতীয় প্রতিষ্ঠান। এরপর দেশে বক্ষব্যাধি রোগের চিকিৎসার জন্য বড় ধরনের আর কোন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়নি।

চিকিৎসকদের মতে, বক্ষব্যাধি রোগ বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান স্বাস্থ্যসমস্যা। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রোগীই ফুসফুসের বিভিন্ন রোগে আক্রানত্ম। শুধু অ্যাজমা বা শ্বাস কষ্টে ভুগছেন এমন রোগীর সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। যানবাহন, কলকারখানার বিষাক্ত ড়্গতিকর ধোঁয়া, বায়ু ও পরিবেশ দূষণের কারণে প্রতিবছর বিভিন্ন রোগে আক্রানত্ম হয়ে দেশে ২৫ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। আর স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা প্রতি ৫ জনের মধ্যে একজন বক্ষব্যাধি রোগী ধরা পড়ছেন। তাদের মতে, বায়ু দূষণের ফলে অ্যাজমা, অ্যালার্জি, শ্বাসনালী ও ফুসফুসে নিউমোনিয়া সংক্রমণ, ফুসফুসে ক্যানসার ছাড়াও বিভিন্ন কার্ডিওভাসকুলার রোগ দেখা দিচ্ছে অহরহ। ফুসফুসের যক্ষ্মা এখান থেকেই হয়ে থাকে।

যক্ষ্মার ভয়াবহতা অনুধাবন করে বাংলাদেশে যক্ষ্মার সংক্রমণ কমানোর লক্ষ্যে দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার জন্য বিশেষ করে ছোঁয়াচে যক্ষ্মা রোগীর দ্রুত চিকিৎসা এবং যক্ষ্মার সংক্রমণ রোধ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্হ্য মন্ত্রণালয় ১৯৯৩ সালে বহুল আলোচিত ডটস কার্যক্রম হাতে নেয়। এ কার্যক্রমের লক্ষ্য হচ্ছে ৭০ শতাংশ ছোঁয়াচে যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত করা এবং তার ৮৫ শতাংশ চিকিৎসার মাধ্যমে রোগমুক্ত করা। ডটস কার্যক্রমে চিকিৎসার ব্যয় খুবই কম এবং যেহেতু রোগী প্রথম ২ মাস স্বাস্হ্য প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট স্বাস্হ্যকর্মীর কাছে উপস্হিত হয়ে নিয়মিত ওষুধ খেয়ে থাকেন, তাই অনিয়মিত ওষুধ গ্রহণের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ফলে রোগ নিরাময় আশাব্যঞ্জক। এ কার্যক্রম সফল করে তোলার জন্য প্রয়োজন জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে সরকারের অঙ্গীকার। কাশি পরীক্ষার মাধ্যমে সাধারণ স্বাস্হ্য ব্যবস্হায় যক্ষ্মা রোগ শনাক্ত করা, জ্ঞানসম্পন্ন শর্ট কোর্স কেমোথেরাপি রেজিম ঠিক করা, নিয়মিত যক্ষ্মা রোগের ওষুধ সরবরাহ করা এবং এ কর্মসুচির তত্ত্বাবধান ও মুল্যায়ন লিপিবদ্ধ করা। তাই বাংলাদেশের মতো গরিব দেশে নিয়মিত এবং প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে চিকিৎসার কোনো বিকল্প নেই। এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি যক্ষা প্রতিরোধে সাধারন মানুষের ব্যাপত সচেতনতা অপরিহার্য।