জাফর সাদেক শিবলী
বাংলাদেশের বিভিন্ন সমস্যা গুলোর মধ্যে জনসংখ্যা সমস্যাই এখন এক নম্বর সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। পর্যাপ্ত জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর অপ্রতুলতা, মাঠ পর্যায়ের তীব্র জনবল সংকট ও সচেতনতা মূলক কর্মসূচীর অভাবে এ সমস্যা দিন দিন আরো প্রকট হচ্ছে। এ নিয়ে কার্যত কোন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছেনা।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশের শতকরা ৫৫.৮ভাগ নারী পুরুষ জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। অথচ এর বাইরে বিশাল একটা জনগোষ্ঠী সচেতন বা অসচেতনভাবে অনিয়ন্ত্রিত গর্ভধারণ করছে । ২০১৫ সালের মধ্যে জন্মহার ২.২ তে নামিয়ে আনার সরকারের যে লক্ষমাত্রা রয়েছে তা থেকে বর্তমান জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণের হার অনেক পিছিয়ে। জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণের এ হার শতকরা ৭৭.২ ভাগ হলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জণ সহজ হত। জনসংখ্যার এই উচ্চহার কমিয়ে আনতে সঠিক পরিকল্পনা ও মাঠপর্যায়ের কর্মসূচী বাড়ানোর কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র মতে, সারা দেশে এ মূহূর্তে ইনজেকটেবল পদ্ধতির কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। তবে এ ঘাটতি সাময়িকভাবে অন্যান্য জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব বলে তিনি জানালেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর মহাপরিচালক। এছাড়া কনডম, মহিলাদের দীর্ঘমেয়াদী অস্থায়ী পদ্ধতি(আইইউডি), ইমপ্লান্ট ও খাওয়ার বড়ির আপাতত কোন সংকট নেই।
জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সবচেয়ে মারাত্নক সংকট দেখা দেয় গেল বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত। এ সময় সিলেট ও চট্টগ্রামের বেশ ক’টি জেলায় অপ্রত্যাশিত গর্ভধারণ ও শিশু জন্মহার অকল্পনীয়ভাবে বেড়ে গিয়েছিল। যা এখনো নিয়ন্ত্রণের বাহিরে বলে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়।
নব্বইয়ের দশকে জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি দেখাশুনার জন্য দেশের প্রতিটি ইউনিয়নের ৫০০-৬০০ জন সক্ষম দম্পতির জন্য একজন করে মাঠকর্মী নিয়োজিত থাকলেও এখন ১২০০-১৮০০ জনের জন্য সব ইউনিয়নে একজন মাঠকর্মীও নেই। আবার এ একজনই আর্সেনিক সমস্যা, কমিউনিটি ক্লিনিকসহ, মা-শিশুর স্বাস্থ্যের দিকে নজরদারি করতে হয়। জন্ম নিয়ন্ত্রনের জন্য এ অপর্যাপ্ত জনবলের ব্যাপারে মহাপরিচালক বলেন, আগামী মার্চের মধ্যেই পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর মাঠপর্যায়ে নতুন জনবল নিয়োগ দিবে। এতে সমস্যা অনেকটাই কেটে যাবে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পাশাপাশি দেশের প্রায় ১২৫টি এনজিও মাঠ পর্যায়ে কাজ করে আসছে। এ ১২৫টি এনজিওর বিশাল কর্মীগোষ্ঠীও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। কিন্তু এত কিছুর পরেও মাঠ পর্যায়ে তেমন কোন সফলতা নেই।
সারাদেশের অবস্থা নিরীক্ষণে দেখা যায়, যেমন খুলনা, রাজশাহী বিভাগে জন্মহার ২.৭ এ স্থিতিশীল রয়েছে। অথচ সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে এ হার যথাক্রমে ৩.৭ ও ৩.৪ যা প্রত্যাশিত হারের চেয়ে অনেক বেশি। এলাকাভেদে এ ভিন্নতার কারন বর্নণা করতে গিয়ে মহাপরিচালক বলেন, ‘অর্থণৈতিক ও ভৌগলিকভাবে কোন কোন এলাকায় জন্মহার তুলণামূলক ভাবে অনেক কম। আমাদের পরিবার প্রতি গড় জন্ম হার ২.২ তে সীমাবদ্ধ রাখতে চট্টগ্রাম ও সিলেটে কর্মসূচীর ব্যাপকতা বাড়াতে হবে।”
সময়মত জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর পর্যাপ্ত সরবরাহ কিভাবে নিশ্চিত করা যায় ও কোন পদ্ধতিতে সারাদেশের জনগন অচিরেই সুফল পেতে পারে এ ব্যাপারে মহাপরিচালক মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ূম বলেন আমাদের নিজেদেরকে আত্ননির্ভরশীল হতে হবে। ‘সরকারের টাকায়, সরকারের নিজস্ব কারখানায়, নিজস্ব অর্থায়নে এ কাজটি করা না হলে সামনে এখনকার চেয়েও আরো বড় সমস্যা হতে পারে।’ তিনি আরো বলেন, বিদেশী এনজিওগুলোর কাছ থেকে বিভিন্ন সামগ্রী পেতে হলে তীব্র বিড়ম্বণার শিকার হতে হয়। নির্দিষ্ট কোন সংস্থার কাছ থেকে জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রী আনতে হলে সংস্থার আইন কানুন মানতে হয়। এসব কারনে সময়মত পন্য পাওয়াও যায় না, পাশাপাশি সরবরাহে অসামঞ্জস্যতা দেখা দেয়।
আগে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল বাজেট স্বল্পতা। তবুও প্রশাসনিক দক্ষতার কারনে মাঠ পর্যায়ের জন্ম নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচী বেশ সফল হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের বাজেটের কোন স্বল্পতা নেই বলে জানালেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। তিনি বলেন, ‘আমাদের অধিদপ্তরের বাজেট স্বল্পতা বলে কোন কথা নেই। যখন যে পরিমান অর্থ প্রয়োজন হয়ে থাকে সেটা আমরা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নক করলেই বিভিন্ন মাধ্যম থেকে টাকা এসে যায়।” |