আমার পরিবেশ হেলথ পলিটিক্স ফার্মাসিউটিক্যাল আমার বিনোদন হেলথ এনজিও বিউটি এন্ড ফিটনেস আমার ডাক্তার হসপিটাল মেডিকেল কলেজ

অ্যানথ্রাক্স নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই

জাফর সাদেক শিবলী
এনথ্রাক্স বা তড়কা রোগ এখন সারাদেশের সবচেয়ে বড় আতংঙ্কের নাম। সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, টাঙ্গাইল এবং পাবনায় বেশ কিছু জেলার মানুষ এনথ্রাক্সের সংক্রমনের শিকার হওয়ার পর এ নিয়ে মানুষের মধ্যে বেশ উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। গোটা রাজধাণী জুড়েও শুরু হয়েছে এ নিয়ে তীব্র আতংঙ্ক। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে এ ব্যাপারে আতংঙ্কিত হওয়ার তেমন কিছু নেই।
সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী রুহুল হক জানান, কয়েকটি জেলা বা উপজেলায় এনথ্রাক্স রোগ দেখা দিলেও এটি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এ রোগটি পশু থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ার কোনো আশঙ্কা নেই। শুধু আক্রান্ত পশু জবাই, এর মাংস নাড়াচাড়া ও খাওয়ায় জড়িত ব্যক্তিরাই এতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
তাই আক্রান্ত পশুকে চিহ্নিত করে নিধন করে মাটির ছয় ফুট নিচে পুঁতে ফেলতে হবে। এতে এ রোগের জীবাণু সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে যাবে।
এদিকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আবদুল লতিফ বিশ্বাস এনথ্রাক্স নিয়ে জনগণকে আতঙ্কিত না হতে আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এটা কোন ছোঁয়াচে রোগ নয়। এ রোগের পর্যাপ্ত প্রতিষেধক সরকারের কাছে আছে।
মূলত এনথ্রাক্স কী এবং কী কারনে ও কীভাবে ছড়িয়ে থাকে এনিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চলে আসছে। আন্তর্জাতিক ও দেশী পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের নানা গবেষণা ও বক্তব্যের আলোকে এনথ্রাক্স রোগ সম্পর্কে সংক্ষেপে প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হলো-

এনথ্রাক্স কী?
এনথ্রাক্স ভাইরাস ঘটিত কোন রোগ নয়। ব্যাকটেরিয়ার কারণে এ রোগ ছড়িয়ে থাকে। এনথ্রাক্স কেন একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে ছড়িয়ে থাকে তার নির্দিষ্ট কোন কারণ জানা যায়নি
পশুসম্পদ অধিদফতরের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. এসএম আমিনুল ইসলাম বলেন, এনথ্রাক্স বা তড়কা রোগ ব্যাসিলাস এনথ্রাসিস জীবাণু দ্বারা সৃষ্ট গবাদিপশুর একটি অতি তীব্র প্রকৃতির ব্যাকটেরিয়া ঘটিত মারাত্মক সংক্রামক রোগ। এই জীবাণু রক্তের সঙ্গে সংযুক্ত অবস্থায় থাকে এবং এই মাসল ফাইব বায়ুর সংস্পর্শে এলেই স্পোর তৈরি করে। এই স্পোর বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থায় বেঁচে থাকতে পারে, যা বিভিন্ন জীবাণুনাশক পদার্থে, আবদ্ধ মাটিতে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় স্যালাইন ওয়াটার ও লবণযুক্ত বা লবণজাত চামড়াতে টিকে থাকতে পারে। এই অ্যানথ্রাক্স স্পোর মাটির মধ্যে ৬০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশে গবাদিপশু হাতি ও মানুষের দেহে এ রোগ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে গবাদিপশুর এ রোগ মহামারী আকারে হওয়ার অনেক তথ্য আছে

 

কিভাবে ছড়ায়?
সারা পৃথিবীজুড়েই এই জীবানুর সন্ধান পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, এই ভাইরাস যখন মাটি বা ভূমির উপরিভাগে থাকে তথন কোন সমস্যা সৃষ্টি হয়না। কিন্তু যখন বংশবৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত পরিবেশের সংস্পর্শে আসে তখন এটা জীবানু সংক্রমন করে থাকে। মূলত এমিনো এসিড, নিউক্লিউসাইডস এবং রক্ত সম্পর্কিত গ্লুকোজ, মানুষের কোষের সংস্পর্শে আসলে এ রোগ ছড়ায়।
পশুসম্পদ অধিদফতরের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. এসএম আমিনুল ইসলাম বলেন, গরু, ছাগল ও ভেড়ার ক্ষেত্রে এটি একটি মারাত্মক রোগ। তবে মানুষের এই রোগে আক্রান্ত হলে মৃত্যুর ঘটনা নেই বললেই চলে, তবে ফুসফুসে আক্রান্ত হলে মানুষের ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেয়। সাধারণত আক্রান্ত মৃত প্রাণী উন্মুক্ত স্থানে ফেলে দিলে বা পানিতে ফেলে রাখা হলে মাংস আহারী প্রাণী দ্বারা এই রোগটি ছড়ায় এবং এই রোগের জীবাণু ও স্পোর মাটিতে বিস্তার লাভ করে। তাছাড়া জীবাণুযুক্ত খাদ্য বা পানি গ্রহণের মাধ্যমে এই রোগজীবাণু সংক্রমিত হতে পারে অনেক ক্ষেত্রে চামড়া ও উলের কারখানায় পশমের মাধ্যমে ও শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শ্রমিকের দেহে এ রোগের জীবাণু প্রবেশ করতে পারে। সুস্থ পশুকে আক্রান্ত পশুর সংস্পর্শে রাখলে এই রোগ সংক্রমিত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত গবাদিপশু জবাই করে মাংস কাটার সময় এই রোগ মাংস কাটার কাজে নিয়োজিত মানুষের দেহে সংক্রমিত হতে পারে। এছাড়াও এই রোগে আক্রান্ত মৃত গবাদিপশুর চামড়া ছাড়ানো, মাংস বা রক্তের সংস্পর্শে মানুষের এই রোগ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত যখন আক্রান্ত প্রাণী মারা যায় বা চারণ ভূমিতে ঘাস খায় তখন এই রোগ বেশি হারে ছড়ায়। জীবানুগুলোর নির্দিষ্ট কোন গন্ধ, স্বাদ, রং থাকে না। কিন্তু দৃশ্যমান জিনিসের সাথে মিশে গিয়ে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। তাই একজন ব্যাক্তি আক্রান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত কিছুই বুঝতে পারেন। শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে যখন শরীরের ভিতরে প্রবেশ করে
আমেরিকান মেডিকেল এসোসিয়েশনের হিসেব মতে, অন্তত ২৫০০ ব্যকটেরিয়া শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করলে ইনফেকশন তৈরী হয়। মানুষের শরীরে প্রবেশ করার পর এনথ্রাক্স জীবানু তার উপযোগী পরিবেশ খুজে নেয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সংবেদনশীল কোষে আক্রমন করে
বৃটিশ গবেষকদের মতে, এনথ্রাক্স ৩টি প্রোটিনের জন্ম নেয়। এককভাবে প্রোটিন গুলো ক্ষতিকর না হলেও দুটি প্রোটিন যখন একত্রিত হয় তথন তা মানুষের ক্ষতি করতে পারে
প্রোটিন তিনটি হলো-

ক) প্রোটেকটিভ এনটিজেন(পিএ)
খ) এডিমা ফ্যাক্টর(ইএফ)
গ) লিদাল ফ্যাক্টর(এলএফ)

প্রকারভেদ:
গবেষকদের গবেষণা অনুযায়ী এনথ্রাক্স সাধারণত তিন ধরণের। যথা:
ক) ইনহেলাশন: সাধারণত এ ক্ষেত্রে ৭/১০দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা যায়। আক্রান্ত ব্যাক্তির ৬০দিন পর্যন্ত এই সমস্যা বিদ্যমান থাকে। মাথাব্যাথা, বুকজ্বালা, কাশি, জ্বর, দুর্বলতা ও শরীরের ব্যাথা এ রোগের প্রধান উপসর্গ।
খ) কানটানেয়াস: ১২দিন পর্যন্ত এর কোন উপসর্গ দেখা দেয়না
গ) গাস্ট্রোয়েনটেস্টিনাল: এটা সাধারণত আক্রান্ত পশুর মাংস খাওয়া, বা যে কোন ধারণের পান ভক্ষণ থেকে ছড়ায়।

 

এনথ্রাক্স বা তড়কা রোগ মানুষের মধ্যে ছড়ানো লক্ষনসমূহঃ
অ্যানথ্রাক্স বা তড়কা রোগ আক্রান্ত গবাদিপ্রাণি বিশেষ করে গরু বেসিলাস এনথ্রাক্স দ্বারা আক্রান্ত হলে সেই গবাদিপ্রাণিকে যারা জবাই করবেন,যারা মাংস কাটবেন,যারা মাংস ধোয়ামোছা করবেন,যারা চামড়া ছাড়াবেন এবং খাবেন প্রত্যেকেই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।

লক্ষণ:
১. আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে জ্বর উঠবে
২. চামড়ায় প্রথমে লালচে দাগ হবে এবং উক্ত স্থান চুলকাবে
৩. পরবর্তীতে আক্রান্ত স্হানে প্রায় দেড় দুই ইঞ্চি পরিমানে ফোসকা উঠবে, ফোসকার মাঝখানে পচনের মতো কালচে হবে
৪. ফোসকার সহানে পরে ব্যাথামুক্ত ঘা হবে। আক্রান্ত ব্যক্তি সঠিকভাবে চিকিৎসা না নিলে রোগী মারা যেতে পারে

গবাদি প্রাণির তড়কা রোগ, লক্ষন ও প্রতিকার
তড়কা রোগ গবাদিপ্রাণির একটি মারাত্নক সংক্রামক রোগ। গবাদিপ্রাণি থেকে এ রোগে মানুষও আক্রান্ত হয়। এ রোগের জীবানু দ্বারা সংক্রমিত খাদ্য খেয়ে সাধারণতঃ প্রাণি আক্রান্ত হয়। বিশেষকরে বর্ষাকালে নদীনালার পানি ও জলাবদ্ধ জায়গার ঘাস খেয়ে গবাদি প্রাণি বেশী আক্রান্ত হয়।

লক্ষণঃ
১. অত্যধিক জ্বর হয় (১০৩-১০৭ ফাঃ)
২. শ্বাসকষ্ট এবং দাঁত কটকট করে
৩. শরীরের লোম খাড়া হয়ে উঠে
৪. আক্রান্ত প্রাণি মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে,প্রাণিকে কিছুটা উত্তেজিত দেখায়
৫. প্রাণি নিস্তেজ হয়ে শুয়ে পড়ে
৬. খিঁচুনি হয় ও অবশেষে প্রাণি মারা যায়
৭. মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্তে বা পরে প্রাণির নাক, মুখ, মলদ্বার ইত্যাদি দিয়ে কালো রক্ত নির্গত হয়
৮. অনেক সময় লক্ষণ প্রকাশের আগেই প্রাণির মৃত্যু ঘটে

প্রতিকারঃ
১. সুস্হ গবাদি প্রাণিকে নিয়মিত বছরে একবার তড়কা রোগের টিকা দিতে হবে
২. প্রাণির ঘর সবসময় পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে
৩. মৃত প্রাণির দেহ, গোবর, লালা, প্রস্রাব, রক্ত ইত্যাদিসহ গভীর গর্তে পুঁতে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে
৪. কোন প্রাণি আক্রান্ত হলে তাকে পৃথক করে চিকিৎসা ব্যবসহা করতে হবে
৫. মৃত প্রাণির চামড়া ছাড়ানো যাবে না
৬. নদীনালার পানি ও নীচু এলাকার ঘাস খাওয়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে

 

ভ্যাকসিন ব্যবহারের মাত্রা:
পশুসম্পদ অধিদফতরের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. এসএম আমিনুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে অ্যানথ্রাক্স স্পোর ভ্যাকসিন গবাদিপশুর ক্ষেত্রে চামড়ার নিচে ১ সি.সি. মাত্রায় বছরে একবার দেয়া হয়। ছাগল ও ভেড়ার ক্ষেত্রে আধা সি.সি. করে বছরে একবার চামড়ার নিচে বা লেজের নিচে চামড়ায় দিতে হয় এবং এই ভ্যাকসিন ৪ডিগ্রি তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয় ও ভ্যাকসিন ব্যবহার করার আগে বোতল ভালোভাবে ঝাঁকিয়ে নিতে হয়।