দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কা অন্যতম ।লাগাতার গৃহযুদ্ধ ও সুনামিতে বিধ্বস্ত নিম্নমধ্য আয়ের দেশ এটি। তা সত্ত্বেও মা ও শিশুস্বাস্থ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সম্প্রতি শ্রীলঙ্কা সাফল্যের দিক থেকে সবার নজর কেড়েছে। দেশটিতে এখন প্রায় ৯৮ শতাংশ শিশুর জন্ম হয় হাসপাতালে। ১৯৬০ সালে শ্রীলঙ্কায় মাতৃমৃত্যুর হার ছিল প্রতি লাখে জীবিত জন্মে ৩৪০ জন, যা ২০০৫ সালে নেমে আসে ৪৩-এ।
সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার একটি সূত্রে জানা যায়, দেশটির এ ধরনের সাফল্য সরকারের সদিচ্ছার ফলেই অর্জিত হয়েছে। সুত্র থেকে আরো জানা যায়, রাজধানী কলম্বো এবং নিগাম্বো শহরসহ দেশের বিভিন্ন পেশাদার পরিবারে দুটির বেশি সন্তান নেই। আর একটি বা দুটি সন্তান হওয়ার সুবাদে তাদের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াতে পারছে মধ্য ও নিম্ন আয়ের লোকেরাও।
শ্রীলঙ্কায় এখন বিভিন্ন সড়কের মোড়ে বা ট্রাফিক সিগন্যালে বাংলাদেশের মতো ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত শিশুদের চোখে পড়ে না, বরং রাস্তার পাশে দেখা যায় বিভিন্ন মাতৃসদন ও ছোট ছোট হাসপাতাল।
২০০৭ সালের হিসাবে দেশটিতে মোট সন্তানধারণের হার ছিল মাত্র ১ দশমিক ৯, যেখানে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় সামগ্রিকভাবে সন্তানধারণের হার ৩। এক্ষেত্রে আমাদের দেশের হার ২ দশমিক ৯।
জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) বিশ্ব শিশু পরিস্থিতি-২০০৯ প্রতিবেদনেও শ্রীলঙ্কার এ সাফল্যের কাহিনী বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ‘শ্রীলঙ্কায় মাতৃস্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দান’ শীর্ষক একটি আলাদা প্রতিবেদন এতে স্থান পেয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে ১৯৪৭ ও ১৯৫০ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যু অর্ধেক হ্রাস পায়। পরের ১৩ বছর মাতৃমৃত্যুর হার আরো অর্ধেক কমে যায়। পরবর্তী ছয় থেকে ১১ বছরে মাতৃমৃত্যু আনুপাতিক হারে ৫০ শতাংশে নেমে আসে । প্রতিবেদনে এ সাফল্যের মূল কারণ হিসেবে স্বাস্থ্য ও সামাজিক-সেবার সমন্বিত প্যাকেজের সম্প্রসারণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো এবং প্রতিটি সরকারের ধারাবাহিকভাবে নারী ও শিশুস্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটিতে অনূর্ধ্ব পাঁচ বছর বয়সীদের মৃত্যুহার ১৯৯০ সালে প্রতি হাজারে জীবিত জন্মে ৩২ জন। ২০০৭ সালে তা ২১ জনে নেমে আসে। নবজাতকের মৃত্যুহার হ্রাস পেয়ে বর্তমানে প্রতি লাখে জীবিত জন্মে আটজনে দাঁড়িয়েছে।
শ্রীলঙ্কার পরিবার-পরিকল্পনা সমিতির পরিচালক (মেডিকেল) শ্রেন উইলাটাগমুয়া জানান, ‘পরিবার-পরিকল্পনাকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির পাশাপাশি মাতৃমৃত্যু ও শিশুস্বাস্থ্য বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য জানিয়ে সচেতন করার কাজটি করছেন।’
জনস্বাস্থ্য চিকিত্সক উষা পেরেরা জানান, দেশটিতে রেজিস্ট্রার জেনারেল ১৯০২ সাল থেকে মাতৃমৃত্যু নথিবদ্ধ করার কাজ করছেন। আর এসব সাফল্যের পেছনে প্রতিটি সরকারের সদিচ্ছা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
ইউনিসেফের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শ্রীলঙ্কায় ১৮৭৯ সালে ঔপনিবেশিক সরকারের সময় থেকে আনুষ্ঠানিক ধাত্রীবিদ্যায় প্রশিক্ষণ শুরু হয়। জনস্বাস্থ্যব্যবস্থায় কর্মরত ধাত্রীরা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রসব-সহায়কের ভূমিকা পালন করেন। ফলে ধাত্রীর সাহায্যে ঘরে প্রসবের হার ১৯৭০ সালে ৯ শতাংশ থেকে ১৯৯৫ সালে মাত্র ২ শতাংশে নেমে আসে। সেখানে ১৯৬৫ সাল থেকে ধাত্রীরা সরকারি জন্মনিয়ন্ত্রণ-সেবা সম্প্রসারণেও ভূমিকা রাখছেন। প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, নারীস্বাস্থ্যে উন্নতি ঘটার ফলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক মর্যাদার মাধ্যমে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর সার্বিক অবস্থান আরো শক্তিশালী হয়েছে। দেশটিতে ১৫-২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৯৮ শতাংশ। এত সব সাফল্যের পরও খাদ্যনিরাপত্তা, শিশুদের অপুষ্টি, শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর হার বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতিসহ বিভিন্ন বিষয়কে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে শ্রীলঙ্কার জনগণ।
দৈনিক প্রথম আলোর সৌজন্যে |