আপনার স্বাস্থ্য, তোমার স্বাস্থ্য, আমার স্বাস্থ্য-সবার স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার জন্য অনলাইন হেলথ নিউজ পোর্টাল আমারহেলথ

  দেশের স্বাস্থ্যসেবার হালচাল –ফিরে দেখা ২০১০

ইমান উদ্দিন ইমন,

আমারহেলথ (১ জানুয়ারী, শনিবার): সারা বছর ধরেই স্বাস্থ্যজগতের নানা রকম খবরাখবর আপনারা শুনেছেন, পড়েছেন৷ বছর শেষে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বিষয়ের দিকে ফিরে দেখা যাক আরেকবার৷

 

কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা
২০১০ সালের উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে অন্যতম হল বর্তমান সরকারের কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে গ্রামীন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার ঘোষণা। বর্তমান সরকার কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে । এরই অংশ হিসেবে বন্ধ হয়ে যাওয়া কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো চালু এবং নতুন করে আরও কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মানের মধ্যমে জনগনের স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়ানো হবে। ২০১০ সালের ০৮ মার্চ জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আফম রুহুল হক একথা বলেন। তিনি আরও বলেন, ‘রিভাইটালাইজেশন অব কমিউনিটি হেলথ কেয়ার ইনিশিয়েটিভস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় প্রতি ছয় হাজার গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য একটি করে মোট ১৩ হাজার ৫০০ কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে এবং প্রতিটি ইউনিয়নে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স নির্মাণ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর শূন্যপদ পূরণসহ বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ১৯৯৬-২০০১ সালে নির্মিত ১০ হাজার ৭২৩ টি কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে নয় হাজার ৫৫২টি কমিউনিটি ক্লিনিকের কাজ শুরু হয়েছে। ২ হাজার ৭৭৭ টি কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ৯৯ টি ধ্বংসপ্রাপ্ত কমিউনিটি ক্লিনিক ২০১১-২০১২ অর্থবছরের মধ্যে নির্মাণ করা হবে।

 

বছরের আলোচিত রোগ অ্যানথ্রাক্স

২০১০ সালের আলোচিত রোগ হল অ্যানথ্রাক্স। দেশে অ্যানথ্রাক্স ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় ০৫ সেপ্টেম্বর,  সারা দেশে রেড এলার্ট জারি করা হয়েছিল। একই সাথে বর্ডার এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।
০৫ সেপ্টেম্বর, ২০১০ দুপুরে অ্যানথ্রাক্সের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে সচিবালয়ে নিজ মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ মন্ত্রী মো. আব্দুল লতিফ বিশ্বাস এই রেড এলার্ট জারির কথা জানিয়েছিলেন।
 

আইসিডিডিআরবি ৫০বছর পূর্তি

২০১০ সালের স্বাস্থ্যসেবা খাতের অনেক ঘটনার মধ্যে একটি হলো আইসিডিডিআরবি ৫০বছর পূর্তি। এ বছর আইসিডিডিআর’বি তাদের ৫০ বছর পূর্তি উৎসব করে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর’বি) খাওয়ার স্যালাইন (ওআরএস) আবিষ্কার করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সম্মান বাড়িয়েছে। আইসিডিডিআর’বিতে কর্মরত বাংলাদেশী বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, তাঁদের অনেকের প্রতিভাই বিশ্বমানের। ২০ জুন, রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি হোটেলে আইসিডিডিআরবি’র ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে আলোচকরা এসব কথা বলেন।

প্রতিষ্ঠানটির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিশেষ ডাকটিকিট অবমুক্ত করেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, আইসিডিডিআরবিকে নিয়ে তিনি গর্বিত।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী আফম রুহুল হক বলেন, আইসিডিডিআর’বিকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে সরকারের অনেক অবদান রয়েছে। তিনি গবেষণা ও চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে আইসিডিডিআর’বির অভিজ্ঞতা মেডিকেল কলেজ ও সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে বিনিময় করার কথা বলেন।

 

২০১০ সালে কমেছে এসিড সন্ত্রাস

বিগত কয়েক বছরের তুলনায় ২০১০ সালে কমেছে এসিড সন্ত্রাস। সারাদেশে এসিডদগ্ধের সংখ্যাও কমছে। বিগত এক দশকের বেশি সময় ধরে এ দেশে এসিড-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যৌথ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশন(এএসএফ) ও বিভিন্ন গণমাধ্যম।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৮ সালের চেয়ে ২০০৯ সালে এসিড দগ্ধের শতকরা ২৫ ভাগ হ্রাস পেয়েছে। এরপরেও ২০০৯ সালে এসিড নিক্ষেপের শিকার হয়েছেন ১৪৪ জন। যৌতুক, প্রেম-বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের কারণে যেখানে এসিড নিক্ষেপের শিকার হয়েছেন মোট ৩৩ জন। আর জমি ও টাকা পয়সা সংক্রান্ত বিরোধের কারণে এসিড নিক্ষেপের শিকার হয়েছে ৬২ জন। নারী পুরুষ সবাই এ সন্ত্রাসের শিকার হন।
এসিডসন্ত্রাস রোধে উক্ত সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক সফলতা চোখে পড়ার মত। এ ছাড়াও দেশের প্রথম সারির সবকটা সংবাদপত্র, রেড়িও এবং টেলভিশন জনগনের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়াস ছিল লক্ষনীয়।
এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের মতে, ২০০০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত এসিড-সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন মোট দুই হাজার ৭৯৫ জন। তাঁদের মধ্যে এক হাজার ৩৯২ জনই নারী, আর ৬৯৬ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। ২০১০ সালের জানুয়ারী-ফেব্রুয়ারীতে সারাদেশে এসিড আক্রান্তের সংখ্যা মাত্র ৫ জন। 


 

আইসিডিডিআরবি’তেকলেরারজীবাণুভয়াবহহয়েওঠারপ্রক্রিয়াআবিষ্কার

২০১০ সালের একটি কৃতিত্বপূর্ণ সাফল্য হলো কলেরার জীবানু ভয়াভহ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া আবিস্কার। ১৬ অক্টোবর, ২০১০আইসিডিডিআরবি’তে কলেরার জীবাণু ভয়াবহ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেছেন বাংলাদেশী বিজ্ঞানীরা। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর’বি) এর মনিক্যুলার জেনেটিক্স বিভাগের প্রধান ড. শাহ এম ফারুক এবং তার সহকর্মী বিজ্ঞানীগণ সম্প্রতি এই প্রক্রিয়ায় বিষয়টি আবিষ্কার করেছেন।
বোস্টনে অবস্থিত হাবার্ড মেডিকেল স্কুলের ড. জন ম্যাকালেনোস এই গবেষণায় সহযোগিতা করেন।
কখন কীভাবে কলেরা সৃষ্টিতে সক্ষম, ভিব্রিও কলেরি-নামক জীবাণুর নতুন প্রজাতির উদ্ভব ঘটবে, মানুষকে আক্রমণ করে অসুস্থ করে তুলবে এবং জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন পড়বে এ সম্পর্কে পূর্ব ধারণা তৈরিতে এই যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সারাবিশ্বে অবদান রাখবে।
উল্লেখ্য, ড. শাহ এম ফারুকের নেতৃত্বে বিজ্ঞানী দলের বাংলাদেশে পরিচালিত এই গবেষণার ফলাফল বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান জার্নাল ন্যাচার-এ প্রকাশিত হয়েছে।
এই জার্নাল যুগান্তকারী আবিষ্কারের কাহিনী ও গবেষণালব্ধ নিবন্ধ প্রকাশের জন্য বিশ্বব্যাপী সুখ্যাত।

 

সংসদে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ বিল-২০১০ পাস

২০১০ সালে দেশের পরিবেশ বিপর্যয় রোধে পরিবেশ সংরক্ষন বিল-২০১০ বিল পাস হয়। পাহাড় কাটা, ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য উৎপাদন, জলাধর ভরাট এবং জাহাজ ভাঙার কারণে পরিবেশ দূষণ হলে ২ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড ও ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রেখে জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ (সংশোধন) বিল-২০১০ পাস করা হয়।
পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বিলটি পাসের প্রস্তাব করলে সংসদে তা কণ্ঠ ভোটে পাস হয়। বিলে শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনে পরিবেশ ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক এবং পরিবেশ দূষণের ফলে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের দাবিতে মামলা করার বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া জলাধার, ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য, পাহাড়, টিলা এবং প্রতিবেশগত সংঙ্কটাপন্ন এলাকার সংজ্ঞা সংযুক্তসহ পাহাড় কাটা, ঝুকিপূর্ণ বর্জ্য উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত, জাহাজ কাটা ও ভাঙার কারণে পরিবেশ দূষণ এবং জলাধার সংক্রান্ত বাধা নিষেধের বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
পরিবেশ সংরক্ষণ (সংশোধন) বিল-২০১০ এ বিভিন্ন পরিবেশ সম্পর্কিত আইন ভঙ্গের দায়ে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তির বিধান করা হয়েছে। এছাড়া সরকার ইচ্ছা করলে পরিবেশ অবক্ষয়ের কারণে কোন এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করতে পারবে। এমন সংকটাপন্ন এলাকার উন্নয়নে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। প্রস্তাবিত বিলে আইন লংঘনের ফলে কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী, জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হলে, উক্ত ব্যক্তি, গোষ্ঠী, ক্ষতিগ্রস্ত জনগণ অথবা তাদের পক্ষে মহাপরিচালক ক্ষতিপূরণের দাবিতে মামলা করতে পারবেন। আর কোন অপরাধ সংগঠনের যন্ত্রপাতি বা তার অংশ বিশেষ, যানবাহন বা অপরাধ সংশ্লিষ্ট পণ্যসামগ্রী বাজেয়াপ্ত অথবা বিনষ্টের জন্যও আদালত আদেশ দিতে পারবে। বিলে সকল শিল্প প্রতিষ্ঠানে এক বছরের মধ্যে পরিবেশ ছাড়পত্র গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া শিল্প প্রতিষ্ঠান বা প্রকল্প সম্প্রসারণেও পরিবেশ ছাড়পত্র নিতে হবে। 

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পুরস্কার পেলেন অধ্যাপক মোদাচ্ছের আলী

২০১০ সালের আরও একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য হলো অধ্যাপক মোদাচ্ছের আলীর বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার পুরস্কার লাভ। ধূমপানমুক্ত সমাজ তৈরী ও এ ব্যাপারে গণসচেতনতা তৈরীতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সমাজকল্যাণ বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার পুরস্কারে ভূষিত হন।
অধ্যাপক সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী সহ সারা বিশ্বের তিনজন ‘ধূমপানমুক্ত দিবস ২০১০’ এর জন্য বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। অধ্যাপক সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী ছাড়া অন্য দু’জন হলেন কম্বোডিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী এবং মিসরের স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
৩১ মে ২০১০ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদর দপ্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরস্কার দেয়া হয়।
পুরস্কার পাওয়ার পর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় অধ্যাপক সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী  গণমাধ্যমকে জানান, ‘সরকার ধূমপান ও মাদকমুক্ত একটি সুস্থ, স্বাস্থ্যসম্মত, পরিবেশবান্ধব সমাজ বিনির্মাণে কাজ করেছে, সেজন্যই এই স্বীকৃতি।'

 

২০১০ সালেও চুরান্ত হয়নি জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি

২০১০ সালে স্বাস্থ্যসেবা খাতে সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতাও রয়েছে। এ বছর স্বাস্থ্যসেবা খাতে বর্তমান সরকারের উল্লেখযোগ্য ব্যর্থতা হলো জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি চূড়ান্ত না করা। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, স্বাস্থ্যনীতি চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। তবে কবে নাগাদ শেষ হবে, তা কেউ বলতে পারছেন না।
০৭ ডিসেম্বর মঙ্গলবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী সাংবাদিকদের বলেন, স্বাস্থ্যনীতির খসড়া চূড়ান্ত হয়ে গেছে। শিগগিরই তা অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে। জানুয়ারি, ২০১১ সালে এটি সংসদে পাস হতে পারে।