দেশের সব খবর আমার পরিবেশ হেলথ পলিটিক্স ফার্মাসিউটিক্যলস আমার বিনোদন হেলথ এনজিও বিউটি এন্ড ফিটনে আমার ডাক্তার

প্রথম শহীদ মিনারের কথা

প্রথম শহীদ মিনার

বায়ান্নর ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সবাই জানেন। কিন্তু এখনকার প্রজন্মের অনেকের কাছেই প্রথম শহীদ মিনার সম্পর্কে ধারনা সুস্পষ্ট নয়। কিন্তু আমরা যারা সেই সময়কার প্রত্যক্ষদর্শী, তাদের কাছে সেই সময়ের স্মৃতি আজও উজ্জল। ২১ ফেব্রুয়ারী এবং তার পরবর্তী দিনগুলোর ঘটনা আমাদের সামনেই ঘটেছিল। আমি তখন ঢাকা মেডিক্যালের দ্বিতীয় বর্ষে ছাত্রী। সে দিন মেডিক্যাল কলেজের সামনের রাস্তা ছিল মূর্হমূহ মিছিল আর স্লোগানে প্রকম্পিত। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রছাত্রী অনেকই ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেছিল। আন্দোলনের একপর্যায়ে আনুমানিক বিকেল তিনটার দিকে গুলির শব্দ শুনা গেল। চারদিকে কাঁদানে গ্যাস। আতম্ক, ভয়! শুনলাম কয়েকজন মারা গেছে। আহত অসংখ্য। আমরা ছাত্রীরা ভয়, আতম্ক নিয়ে হোস্টেলে অবস্থান করছিলাম। ছাত্রীদের হোস্টেল থেকে বের হতে দেয়া হচ্ছিল না। দূর থেকে দেখলাম লাশকাটা ঘরের পেছনে ছেলেরা লাশ নিয়ে এসেছে। একজন সাদা কাপড় পরা বৃদ্ধা এবং অল্প বয়সী বউ কাঁদতে কাঁদতে ঘরের পেছনে দৌঁড়ে যাচ্ছেন। আমরা শোকে পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। বঞ্চিত পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র ছাত্র জনতার উপর গুলি চালাল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে আমাদের মন ঘৃণায় ভরে উঠল। ২২ ফেব্রুয়ারী সারা দেশে উত্তেজনা। ঢাকার সব দোকান পাট বন্ধ। ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে দেশজুরে আন্দোলন শুরু হলো। ২২ ফেব্রুয়ারী রাতেই নির্মিত হলো দেশের প্রথম শহীদ মিনার। ২৩ ফেব্রুয়ারী সকালে দেখি, যেখানে একুশে ফেব্রুয়ারীতে মানুষ শহীদ হয়েছিল (বর্তমান ঢাকা মেডক্যাল কলেজ আউট ডোর ডিসপেনসারি) সেখানে সুন্দর একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়েছিল। সবাই ফুল দিচ্ছে। আমরাও ফুল দিচ্ছি। একজন গলার হার খুলেদিয়ে শ্রদ্ধা জানাল। সে কী দারুন উত্তেজনা! একজন শহীদের বাবা ২৩ তারিখে শহীদ মিনারটি উদ্বোধন করেন। ২৪ তারিখে সাংবাদিক আবুল কালাম সামসুদ্দিন সাহেব সেটা আবার উদ্বোধন করেন। ছেলেদের হোস্টেল থেকে গাছের আরালে মাইকে জ্বালাময়ী বক্তৃতা চলল সাড়া দিন। পর দিন মাইক কেড়ে নেয়া হলো। শহীদ মিনারের চার ধারে লাল সালু দিয়ে ঘিরে রাখা হলো। ২৬ তারিখ পুলিশ বুলডোজার দিয়ে ভেঙ্গে দিল প্রথম শহীদ মিনার। তারপরও আন্দোলন দমিয়ে রাখা গেল না।

পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে জানলাম এই শহীদ মিনারের নকশা করেছিল বদরুল আলম; আমাদের বন্ধু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজরই ছাত্র। বদরুলের কাছে শুনেছি শহীদ মিনারের নির্মানের বিস্তারিত ঘটনা। বদরুল জানাল "‍‍‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌২২ ফেব্রুয়ারীতে মিছিল সভা আর পোস্টার আকা নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিলাম। রাতের ক্লান্তিতে ঘুমে বিভোর ছিলাম হোস্টেলে। হঠাৎ মধ্যরাতে কয়েকজন বন্ধু আমাকে টেনে তুলল। বলল, ‌‌‌তোমাকে মাওলা ভাই(তৎকালীন ভিপি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদ) ডাকছেন। আমার আঁকার হাত ভালোই ছিল।তাই মাওলা ভাই ও আরো কিছু ছাত্র আমাকে বললেন, ভাষার জন্য ছেলেরা রক্ত দিল, এটা ধরে রাখার জন্য একটা স্মৃতিস্তম্ভের নকশা বানিয়ে দাও। তখন এত রাতে আমার মাথায় কিছুই আসছিল না। হঠাৎ মনে হলো, ছেলে বেলায় বাবার সঙ্গে একবার বেড়াতে গিয়েছিলাম, ওখানে খুব সুন্দর ইটবাধানো একটা স্তূপ ছিল। বাবা বললেন এটা একটা স্মৃতিস্তম্ভ। কেউ মারা গেলে তার স্মৃতি ধরে রাখার জন্য এটা বানানো হয়। সেই স্তূপ কল্পনা করে একটি নকশা তৈরি করলাম। কারও তেমন পছন্দ হলো না। পরে ভিক্টোরিয়া পার্কে সিপাহী বিদ্রোহের যে স্মৃতিস্তম্ভ আছে, সেটার আদলে একটি নকশা তৈরি করলাম। অধ্যাপক মির্জা মাজহারুল ইসলামের ঘরে বসে বানাই সেটা। সবার পছন্দ হলো। রাতেই ইট, সিমেন্ট, বালু ও রাজমিস্ত্রি জোগার হয়ে গেল। ভোর পাঁচটার মধ্যে ৫ ফুট উচু ও ৬ ফুট প্রস্থের শহীদ মিনার তৈরি হলো। ২২ ফেব্রুয়ারির সেই রাতে হোস্টেলের সবাই অংশ গ্রহণ করেছিল শহীদ মিনারটি তৈরি করতে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া কিছুতেই সম্ভব হতো না।"

প্রথম শহীদ মিনারের স্মৃতি স্তম্ভে দুটি পোস্টার ছিল। ১. স্মৃতিস্তম্ভ ২. রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই । দুটিই আমার স্বামীর আঁকা পোস্টার, সাংবাদিক আবুল মনসুর নামকরণ করেন ‍‍‍‍‍‍‍‍‍'শহীদ মিনার'। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলা ভাষা অন্যতম রাষ্ট্র ভাষার মর্যদা পেল। এর পর থেকে পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন ধীরে ধীরে জোরদার হতে থাকল। ৫ বছর পর ১৯৫৭ সালে আমরা দেশে বাইরে চলে যাই। দেশে ফিরলাম দশ বছর পর। দেশে এসে দেখলাম ভাষা আন্দোলন রূপ নিয়েছে স্বাধিকার আন্দোলনে। পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন অনেক বেগবান হয়েছে। এরপর অনেক রক্তের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হলো। ভাষা আন্দোলন ও বাঙ্গালীর স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের কথা স্বার্ণাক্ষরে লিখা থাকবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রথম শহীদ মিনারের রূপকার ডা: বদরুল আলমের যথার্থ মূল্যায়ন হয়নি। সিটি করপোরেশন অনেক বার বলেছে, কিন্তু তার নামে কোন সড়কের নামকরণ এখনও বাস্তবায়ন করেনি। আমি ৫২-এর ভাষা আন্দোলনের একজন প্রত্যক্ষদর্শী এবং প্রথম শহীদ মিনারের রূপকার ডা: বদরুল আলমের সহধর্মিনী হিসেবে সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, তার নামে অন্তত একটি সড়কের নামকরণ করা হোক।
ডা: আফজালুন নেসা, ভাষাসৈনিক ডা: বদরুল আলমের সহধর্মিনী

 

আমার চাকরি