দেশের সব খবর আমার পরিবেশ হেলথ পলিটিক্স ফার্মাসিউটিক্যলস আমার বিনোদন হেলথ এনজিও বিউটি এন্ড ফিটনে আমার ডাক্তার

শহীদ ডা. মিলনের মায়ের কথা


আজ ২৭ নভেম্বর মিলন দিবস। প্রতিবছর এই দিনের জন্য লিখতে বসি ক্ষতবিক্ষত এক হূদয় নিয়ে; আর নীরব অশ্রুজলে ভাসি। মিলনের সমাধিস্থল হয়তো আজ ফুলে ফুলে ছেয়ে যাবে। নানা সংগঠন থেকে এই ফুল দেওয়া হবে শ্রদ্ধাঞ্জলিরূপে। বছরের এই বিশেষ দিনটিতে মিলনের সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করবে চিকিৎসকসমাজ, মিলন সংসদ, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ছাত্রসংগঠন। প্রতিবছর এই ফুলে ফুলে ঢাকা মিলনের সমাধির দিকে তাকিয়ে মনে প্রশ্ন জাগে, মিলন জীবনে কী চেয়েছিল? মিলনের সমাধিতে সবাই পুষ্কপস্তবক অর্পণ করবে−এ স্বপ্ন নিয়েই কি মিলন আত্মাহুতি দিয়েছিল? না, মিলন স্বপ্ন দেখেছিল ঘুণে ধরা সমাজব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির; চেয়েছিল সমাজে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। যাদের মিলন বিশ্বাস করেছিল আন্দোলনে-মিছিলে, যাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সে সমাজ বদলের সংগ্রামে ব্রতী হয়েছিল, আজ তারা অনেকেই ব্যক্তিগত জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। মিলনের লাশ ছুয়ে যে শপথ তারা নিয়েছিল, আজ তা বিস্তৃতপ্রায়। তাদের এই আত্মবিস্নৃতির সুযোগে সুবিধাবাদীরা বিগত ১৮ বছরে তার সদব্যবহার করেছে। তারা ভুলে গেছে মিলনের অসমাপ্ত কাজের দায়িত্বভার এখন তাদের ওপরই ন্যস্ত। মিলনের অন্তর্ধানের দেড় যুগ পর তার লালিত স্বপ্ন কতটুকু বাস্তব রূপ লাভ করেছে এবং মিলনের উত্তরসুরিরা তা বাস্তবায়নে কতটুকু ভুমিকা রেখেছে, আজ তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। স্বাধীনতার ৩৭ বছরে দেশের রাজনীতির অঙ্গনে অনেক বিচিত্র ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। স্বাধীন মাতৃভুমিতে বৃদ্ধি পেয়েছে মৌলবাদীদের আস্কালন। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে নিষ্ঠুরভাবে। চলেছে ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র। বারবার। ১৯৮২ সালে জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা দখল করলেন। দীর্ঘ নয় বছর চলে তাঁর সামরিক শাসন। এই স্বৈরশাসকের আমলে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের নানা আন্দোলনে জীবন দিতে হয়েছে জেহাদ, তাজুল, জয়নাল, নুর হোসেনসহ আরও নাম-না-জানা অনেক সন্তানকে। অবশেষে আসে নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন। সমাজের প্রতিটি স্তরে মানুষের মনে দীর্ঘ স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে যে বঞ্চনার ক্ষোভ জমা হয়েছিল, তা এক গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়। মিলন তৎকালীন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক ছিল। এরশাদ সরকারের প্রণীত গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি বাতিলের দাবিতে সে সময় বিএমএ আন্দোলন করছিল। যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই মিলন এ আন্দোলনের নেতৃত্বের পুরোভাগে ছিল। এই আন্দোলনে আপসহীন ভুমিকা রাখায় তৎকালীন সরকারের রোষানলে পড়তে হয় মিলনকে। চাকরিচ্যুত করা হয় তাকে। চিকিৎসকসমাজের আন্দোলনের মুখে সরকার সে আদেশ বাতিল করতে বাধ্য হয়। চাকরিক্ষেত্রে নানা হয়রানিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় তার বিরুদ্ধে। কিন্তু মিলন ছিল নীতির প্রশ্নে অনড়, অটল। এরশাদ সরকারের গুন্ডাবাহিনী মিলনকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়েছিল ১৯৯০ সালের এই দিনে। হত্যাকারীরা ভেবেছিল, মিলনকে নিশ্চিহ্ন করলেই বুঝি আন্দোলন থেমে যাবে। কিন্তু এক মিলনের রক্ত যে লাখো মিলনের জন্ন দিতে পারে, তা তাদের ধারণার বাইরে ছিল। তাই মিলনের অন্তর্ধানের পর গণ-আন্দোলন রূপ নেয় গণ-অভ্যুত্থানে। সব শ্রেণী-পেশার মানুষ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর তা সামাল দিতে অপরাগ হয়ে এর মাত্র কয়েক দিন পর ৪ ডিসেম্বর ১৯৯০ জেনারেল এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন। দেশ গণতন্ত্র অর্জনের পথে একধাপ এগিয়ে যায়। কিন্তু আজ দুঃখভারাক্রান্ত হূদয় নিয়ে অবাক হয়ে দেখি, সে সময় যাঁরা সামরিক স্বৈরাচার সরকারের বিরোধিতা করে আন্দোলন-বিক্ষোভে সামিল ছিলেন, তাঁরাই আজ আবার ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য এরশাদকে নিয়ে জোট গঠনে ব্যস্ত। তাঁদের এ রকম আচরণ কি শহীদদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল নয়? এটা অব্যশ্যই নীতিবিবর্জিত রাজনীতি। এই রাজনীতি মিলন চায়নি। আমরা দেখেছি, গত প্রায় ১৮ বছর দেশে চলেছে কেবল ক্ষমতা দখলের রাজনীতি। দলীয় লোকদের ক্ষমতায়ন, সীমাহীন দুর্নীতি আর দুঃশাসন। প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। দেশে বর্তমানে সাধারণ নির্বাচনের হাওয়া বইছে। আগামী ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ অনেক ভোগান্তির পরও সাধারণ মানুষ চায়, দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। সাধারণ মানুষ আশা করে, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে আবার গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসবে। তার পরও প্রশ্ন থেকে যায়, এরপর সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে তো? বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মায়েদের উদ্দেশে কয়েকটি কথা বলতে চাই। সন্তানকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে মা-বাবা দুজনের ওপরই সমান দায়িত্ব। তবে মায়েদের দায়িত্ব একটু বেশি বলে আমার বিশ্বাস। কারণ, সন্তানেরা সাধারণত মায়ের সান্নিধ্য বেশি পছন্দ করে। আজ আমাদের তরুণসমাজের মধ্যে যে অস্িথরতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় দেখা যাচ্ছে, তা রোধ করতে একজন স্েমহময়ী মায়ের ভুমিকা অনেকখানি। তিনি তাঁর আদর্শ দিয়ে, স্েমহ দিয়ে এক সুন্দর জীবনের স্বপ্ন সন্তানের হূদয়ে অঙ্কন করে তাকে সুন্দর সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবেন বলে আমি মনে করি। কারণ, আদর্শবান মা-বাবার সন্তান কখনো জীবনবোধ হারিয়ে ফেলে আদর্শবিচ্যুত হতে পারে না। শহীদ রুমীর মা, আজাদের মা, আসাদের মা, জেহাদের মা−সবাই তাঁদের সন্তানদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, জীবনাদর্শের কথা শিখিয়েছিলেন। তাঁদেরই অনুপ্রেরণায় তারা সাহসী হয়েছিল, জীবন উৎসর্গ করেছিল এ দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য। সবশেষে আমাদের নতুন প্রজন্মের উদ্দেশে বলতে চাই, লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এ দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী হতে হবে তোমাদের। এ দেশকে তোমাদের বাসযোগ্য করার জন্য যারা অকাতরে জীবন দিয়ে গেছে, তাদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে দেশের জন্য যেকোনো আত্মত্যাগে ব্রতী হতে হবে তোমাদের−এটাই হোক মিলন দিবসে একমাত্র প্রত্যয়। সেলিনা আখতার: শহীদ ডা. মিলনের মা।

আমার চাকরি