আমার পরিবেশ হেলথ পলিটিক্স ফার্মাসিউটিক্যাল আমার বিনোদন হেলথ এনজিও বিউটি এন্ড ফিটনেস আমার ডাক্তার হসপিটাল মেডিকেল কলেজ

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে খাদ্য

০ লবণ কম খান

০ প্রচুর পরিমাণে ফল-মূল এবং শাক-সবজি খান

০ খাদ্য তালিকায় বিভিন্ন ধরনের শস্য জাতীয় খাদ্যদ্রব্য রাখুন

০ কম চর্বিযুক্ত এবং চর্বিবিহীন খাবার বেছে নিন

০ উদ্ভিদ জাতীয় তেল-যেমন-সানফ্লাওয়ার, কর্ণ অয়েল, অলিভ অয়েল খাদ্য তৈরিতে ব্যবহার করুন

০ মাছ, চামড়াবিহীন মুরগীর মাংস, সীম এবং ডালজাতীয় যে কোন খাবার ও চর্বিবিহীন মাংস গ্রহণ করুন

০ মগজ, কলিজা, ডিমের কুসুম, চিংড়ী মাছ, গরু এবং খাসীর মাংস পরিহার করুন

০ রক্তচাপকে স্বাভাবিক রাখার জন্য পরিমিত খাবার গ্রহণ, খেলাধূলা এবং ব্যায়াম করুন ।

হৃদরোগ,

স্ট্রোক এবং কিডনির অসুখের জন্য উচ্চ রক্তচাপ একটি মারাত্মক রিস্ক ফ্যাক্টর। বিশ্বের প্রায় ১৫০ কোটি লোক উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে। বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে শতকরা ২০-২৫ জন লোক উচ্চ রক্তচাপে ভুগে। উচ্চ রক্তচাপের পেছনে যে কারণগুলো রয়েছে তার মধ্যে অধিক ও অসম খাদ্য গ্রহণ অন্যতম। স্বাভাবিক রক্তচাপ বজায় রাখতে খাদ্য গ্রহণের একটা বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। আমাদের শরীরের জন্য কোন খাদ্য উপকারী এবং কোন খাদ্য সমস্যা সৃষ্টিকারী সেটা জানা একান- প্রয়োজন। সঠিক খাদ্য নির্বাচন রক্তচাপকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে সুষম খাদ্য গ্রহণের জন্য খাদ্য পিরামিড গাইড অনুসরণ করা উচিত। খাদ্য পিরামিড হলো প্রতিদিন কি খেতে হবে তার একটা রূপরেখা। এটা এমন না যে, এর মধ্যে সবকিছু রয়েছে। আসলে এটা একটা সাধারণ গাইড যার প্রতিস্বর থেকে মিলিয়ে পছন্দমাফিক স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নির্বাচন করে খাওয়া প্রয়োজন। পিরামিড গাইডে বিভিন্ন ধরনের খাদ্য খাওয়ার কথা বলা হয়েছে যেখান থেকে চাহিদা মাফিক পুষ্টি এবং ক্যালরি পাওয়া যাবে, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। খাদ্য পিরামিড মেনে চলে রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব: পিরামিডের স্ব-রগুলো প্রধান প্রধান খাদ্য শ্রেণীকে উপস্থাপন করে যা আমাদের পুরো খাদ্য তালিকাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। এই পিরামিডে তিনটি স-রে খাদ্যের প্রধান পাঁচটা গ্রুপকে দেখানো হয়েছে।

ভাত, রুটি, সিরিয়াল গ্রুপ: খাদ্য পিরামিডে ভিত্তি স-রে শর্করা জাতীয় খাবারকে দেখানো হয়েছে। যেমন-ভাত, রুটি, যব, সিরিয়াল অর্থাৎ যেগুলো শস্য জাতীয় খাবার থেকে এসেছে। আমাদের দেশের বেশিরভাগ লোকেরই প্রধান খাবার এগুলো। শারীরিকভাবে সুস' থাকার জন্য এই গ্রুপ থেকে পরিমিত খাবার গ্রহণ করতে হবে।

শাক-সবজি এবং ফলমূল গ্রুপ: এই খাবারগুলো উদ্ভিজ্জ। ভিটামিন, মিনারেল এবং ফাইবার এগুলোতে পাওয়া যায়। নিজেকে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী করার সর্বোত্তম উপায় হলো খাদ্য তালিকায় ফলমূল এবং শাক-সবজি বেশি পরিমাণে অনর্ভূক্ত করা । কারণ গবেষণায় দেখা গেছে শাক-সবজির আঁশ রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দিতে পারে। প্রচুর পরিমাণ শাক-সবজি ও ফলমূল হৃদরোগ, কয়েক ধরনের ক্যান্সার এবং অন্যান্য ক্রণিক ডিজিজের ঝুঁকি কমায়।

মাংস, মাছ, ডিম, ডাল জাতীয় খাদ্য এবং বাদাম গ্রুপ: এটা মূলত: প্রোটিন গ্রুপ এবং প্রাণীজ খাবারগুলোকে নির্দেশ করে। টিস্যুকে ভাল রাখতে এবং দেহের কর্মকান্ডকে সচল রাখতে প্রত্যেকের খাদ্য তালিকায় পরিমাণমতো প্রোটিন রাখা প্রয়োজন। এই স্ব-রে আরো অনর্ভূক্ত করা হয়েছে-

দুধ, দই ও পনির গ্রুপ: এই খাবারগুলো থেকে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, আয়রণ এবং জিংক পাওয়া যায়। হাড়ের গঠনে ক্যালসিয়াম খুবই প্রয়োজনীয় যা এই দুগ্ধজাতীয় খাবার থেকে পাওয়া সম্ভব শরীরের সামগ্রিক সুস'তার জন্য এই খাবারগুলো পরিমাণমতো খেতে হবে।

চর্বি, তেল এবং মিষ্টি গ্রুপ: পিরামিড ছোট ছোট বিন্দুগুলোকে চর্বি, তেল এবং মিষ্টিজাতীয় খাদ্যকে বোঝানো হয়েছে। এই খাবারগুলো যেমন-তেল, ক্রিম, মাখন, মার্জারিন, চিনি, কোমল পানীয়, চকলেট, মিষ্টান্ন এগুলোতে রয়েছে অধিক ক্যালরি কিন' পুষ্টিমান সামান্য। এগুলো খাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ ক্ষতিকারক কোলেস্টেরল এবং সম্পৃক্ত চর্বি এ সমস- খাদ্যের মাধ্যমে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে এবং করোনারী ধমনীর ভেতরে প্লাক তৈরি করে হৃদপিন্ডের রক্ত প্রবাহ কমাতে কমাতে একেবারে বন্ধ করে দিয়ে মৃত্যু ঘটাতে পারে। সুতরাং চর্বিযুক্ত খাবার কম গ্রহণ করা উচিত।

সুস্বাস্থ্যের জন্য কোন একক খাদ্য শ্রেণী অন্যটার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়, সবগুলোই দরকার। খাদ্য পিরামিডে স্বাস্থ্যসম্মত খাবারকে অন-র্ভূক্ত করা হয়েছে। এটা থেকে আমরা বুঝতে পারি কিছু খাদ্য স্বাস্থ্যের জন্য ভাল। যা প্রায়শ:ই খাওয়া উচিত। আবার কিছু খাবার শরীরের জন্য ভাল নয়। সেটা যথাসম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত। এই পিরামিডে চর্বিজাতীয় খাবারকে আলাদাভাবে দেখানো হয়েছে। কারণ চর্বি বেশি খেলে হার্টের অসুখসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়। তাই রক্তচাপকে স্বাভাবিক রাখার জন্য খাদ্য পিরামিড গাইড মেনে চলা প্রয়োজন।

আমাদের দেশে দরিদ্ররা সুষম খাবারের অভাবে অনেক সময় অপুষ্টিতে ভোগে। অপরদিকে ধনীরা সুষম খাবারের কথা না জেনে ফাস্ট ফুড জাতীয় খাবার খেয়ে সঠিক পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হন। বর্তমান প্রজন্মের কাছে ফাস্ট ফুড জাতীয় খাবার অত্যধিক পছন্দের। এরা কায়িক পরিশ্রম করতে চায় না। কম্পিউটার গেমস তাদের প্রিয় খেলা। ফাস্ট ফুড খাওয়ার দরুণ এবং কায়িক পরিশ্রমের অভাবে নারী, শিশু, উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীরা নানাবিধ জটিল রোগে আক্রান- হচ্ছে যেমন-উচ্চ রক্তচাপ, শারীরিক স্থুলতা, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, কিডনির রোগ, ক্যান্সার, বন্ধ্যাত্ব, দীর্ঘ মেয়াদী পেটের পীড়ার মত জটিল সমস্যা। অথচ আমাদের চারিদিকে নানান ধরনের শাক-সবজি রয়েছে। দেশীয় ফল যেমন-কলা, কামরাঙ্গা, আমলকী, আনারস, পেয়ারা, পেঁপে, বড়ই, আমড়া, জলপাই, আম, জাম, কাঁঠাল, বেল, ডালিম, লেবু ইত্যাদি রয়েছে। এগুলো যেমন সস্তা তেমন সহজলভ্য। এই সব ফলমূল খাওয়ার মাধ্যমে সুস' থাকা সম্ভব। সুষম খাদ্য গ্রহণ জীবনকে সুন্দর করে তুলবে। অন্যদিকে অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ জীবনের আনন্দটুকু কেড়ে নিবে। সুতরাং বাড়ি, স্কুল-কলেজ, কর্মস'ল এবং দোকানে যাতে মানসম্মত স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা থাকে সেজন্য সামাজিক নেতৃবৃন্দ, সরকার সর্বোপরি পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। স্কুল-কলেজের ছাত্রদের জন্য খেলাধূলা এবং ব্যায়ামের ব্যবস্থা থাকা উচিত। তবেই উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিমুক্ত হয়ে সুস' জীবন-যাপন সম্ভব হবে।

লেখক: প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও

জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার (অব:) আব্দুল মালিক