গর্ভাবস্থায় একটি স্বাভাবিক শরীরবৃত্তীয় অবস্থা । যখন শরীরে অনিবার্য কতগুলো পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। যেমন- ভ্রূণ ধীরে ধীরে বড় হয়, ফলে জরায়ু বড় হতে থাকে। পেট উঁচু হতে থাকে। রক্তের পরিমাণ বাড়ে। কিন্তু হিমোগ্লোবিন কমে। শরীরের ওজন বাড়ে। চর্বিও জমা হয় দেহে। পেটের ত্বকেও স্ট্রেচ পড়ে; তাই ফাটা ফাটা দাগ হয়। এটাকে বলে স্ট্রিয়া গ্রাভিডেরাম এই ফাটা কারো কারো কম হয় বা হয় না একেবারেই। আবার কারো খুব বেশি হয়। গর্ভাবস্থায় কেউ কেউ পুরোপুরি সুস্থ স্বাভাবিক থাকে। কেউ কেউ গর্ভাবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন, যা কখনো কখনো মৃত্যু পর্যন- ঘটায়। ঝুঁকিপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করা ও যথাযথ চিকিৎসা নেয়ার জন্য গর্ভবতীকে নিয়মিত স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ দ্বারা মেডিক্যাল চেকআপ করানো উচিত।
প্রথম ভিজিট অর্থাৎ প্রথম তিন মাসে একবার চেকআপ করানো উচিত।
রোগীকে কিছু কাউন্সেলিং করা হয় । গর্ভাবস্থায় ও পরবর্তী দুগ্ধদান সম্পর্কে। রোগীর খাবার ও বিশ্রাম সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়।
নিয়মিত, পরিমিত, পুষ্টিকর খাবার্ল যার পরিমাণ গর্ভাবস্থায়র আগের থেকে ৩০০ কিলোক্যালরি বেশি হবে। দিনে পাঁচ থেকে ছয়বার খেতে হবে। তিনটি প্রধান খাবার (ভালো খাবার), তিনটি স্ন্যাকস (হালকা) জাতীয় খাবার খেতে হবে।
সকালেঃ রুটি বা ভাত, সবজি, ডাল,
ডিম একটি, দুধ এক গ্লাস
ফল-মৌসুমি ফল- যেকোনো একটি
১১টায়ঃ ফল একটি,
মুড়ি/ চিঁড়া/ বিস্কুট
২টায়ঃ ভাত, ডাল, সবজি, মাছ বা গোশত- দুটুকরা
বিকেলেঃ চা, বিস্কুট/ মুড়ি/ চিঁড়া
দই বা দুধ ১ গ্লাস
রাতেঃ ভাত/রুটি+সবজি+ডাল+ মাছ বা গোশত
শোয়ার আগেঃ হরলিকস/ দুধ ১ গ্লাস
স্যান্ডউইচ বা ফল
বিশ্রামের ব্যাপারেও তাকে সতর্ক থাকতে হবে। দিনে ২-৩ ঘণ্টা বা কাত হয়ে বিশ্রাম নিতে হবে। রাতে ৮-১০ ঘণ্টা ঘুমাতে হবে।
যাবতীয় সাংসারিক কাজ, রান্না করা যাবে। তবে ভারী বস-ু তোলা নিষেধ। চাপকল চাপা যাবে না। যাদের একেবারেই কাজ করা হয় না, তারা সকালে বা বিকেলে হালকা ব্যায়াম বা হাঁটাহাঁটি করতে পারবেন, চিকিৎসকের পরামর্শ মতো।
ত্বকের যত্নঃ শীতকালে বেশি ত্বকের যত্ন দরকার হয়। কুসুম গরম পানিতে সাবান দিয়ে গোসল করবেন। গোসলের পর অলিভ অয়েল বা ভালো কোনো লোশন দিয়ে পুরো শরীর ম্যাসাজ করবেন। পেট ত্বক ফাটা রোধ করতে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো আধুনিক ক্রিম ব্যবহার করতে পারেন। তা ছাড়া দিনে দু-তিনবার অলিভ অয়েল ম্যাসাজ করতে পারেন। তাতে পেটে ফাটা দাগ কম পড়ে। পরিশেষে বলতে চাই, পরিবারে কেউ গর্ভবতী হলে তাকে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে নিয়মিত নিয়ে যাবেন (গাইনোকলোজিস্ট) চেকআপের জন্য। তাকে সুষম ও পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত তাকে বিশ্রাম নিতে দিন। তাহলেই একটি সুস্থ্য মা ও সুস্থ্য সবল শিশুর জন্মদান সম্ভব। একটি হাবাগোবা, রোগাপটকা, অসুস্থ্য বা ত্রুটিপূর্ণ শিশু যে কী বোঝা, তা শুধু যার শিশু ওই রকম তিনিই বলতে পারবেন। যেমন সাপে কাটলে বিষের যে কী যন্ত্রণা, তা শুধু যাকে সাপে কেটেছে সে-ই বলতে পারে। তেমনি অসুস্থ্য রুগ্ন মা বা শিশুর জন্ম দিয়ে যে মা মারা যায়, উপযুক্ত পুষ্টি, ওষুধ ও চিকিৎসার অভাবে, সে-ই শিশু বা তার পরিবার, জানে যে মা হারা পরিবার কত অসহায়; জনম দুঃখী। তাই আসুন আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি, যেন গর্ভাবস্থায় সব মাকে আমরা পুষ্টিকর, সুষম, পরিমিত, নিয়মিত, আহার দেবো। তাকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেবো, তাকে প্রয়োজনীয় ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, আয়রন ও টিকা দেবো। অসুখ-বিসুখে তাকে উপযুক্ত চিকিৎসা দেবো। তাকে সবসময় হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করব, যার ফলে একটি সুস' সবল শিশু ও মা দুয়েরই প্রাপ্তি হবে।
ডা. সায়লা পারভীন (মিলি)
লেখকঃ স্ত্রীরোগ, প্রসূতি বিশেষজ্ঞ ও সার্জন, যুবক মেডিক্যাল সার্ভিসেস, রোড -২৮, বাড়ি -১৬, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা। মোবাইল -০১৭১১৫৬৩৫১৭ |