হেপাটাইটিস -সি এমন একটি ভইরাস যা বিশ্বব্যাপী মারাত্মক সংক্রামক রোগের জীবাণু হিসেবে পরিচিত। এ ভাইরাসের ফলে জন্ডিস থেকে শুরু করে লিভার সিরোসিস এমনকি লিভার ক্যান্সারও হতে পারে । ১৯৮৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ ভাইরাস শনাক্ত করা হয়। হেপাটাইটিস সি নামক ভাইরাসটি লিভার কোষ ধ্বংস করে ফেলে লিভার প্রদাহের সৃষ্টি হয় ও লিভারের কোষ ধ্বংস অব্যাহত থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর মতে, বিশ্বের প্রায় ১৭ কোটি মানুষ এ ভাইরাসে আক্রান- এবং প্রতি বছর ৩০-৪০ লাখ মানুষ এ ভাইরাসে আক্রান- হচ্ছে।
অনুরূপভাবে বাংলাদেশেও শতকরা ৩/৬ ভাগ লোক হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের বাহক। বর্তমানে বাংলাদেশে পেশাদার রক্তদাতাদের মধ্যে শতকরা ১.২ ভাগ লোক এই ভাইরাস বহন করে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি লিভার রোগীদের মধ্যে শতকরা ২৪.১ ভাগ, লিভার ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে শতকরা ৯.৬ ভাগ, রক্ত গ্রহণের পর জন্ডিসে আক্রান- ব্যক্তিদের মধ্যে ৬.৮ ভাগ, স্বল্পস্থায়ী জন্ডিসে আক্রান- ব্যক্তিদের মধ্যে ১.৭ ভাগ রোগী হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত। এইচআইভি বা এইডস রোগের চেয়ে ১০ গুণ বেশি সংক্রামক হলো হেপাটাইটিস সি।
হেপাটাইটিস সি কীভাবে ছড়ায়
হেপাটাইটিস সি পরিসঞ্চালনের মাধ্যমে ছড়ায়। তাই সেভিং রেজার, ক্ষুর, ব্লেড, টুথব্রাশ ও ইনজেকশনের সিরিঞ্জ একাধিক ব্যবহার করলেও হেপাটাইটিস সি ভাইরাস ছড়াতে পারে।
হেপাটাইটিস সি এর ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা না নিলে
হেপাটাইটিস সি এর ভাইরাস ধীরে ধীরে লিভারকে ধ্বংস করে। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি বুঝতে পারে না যে সে হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত । এবং আজ পর্যন্ত এ রোগের কোন কার্যকরি ঔষুধ ও প্রতিষেধক আবিষ্কার হয় নি, যা হয়েছে তা অনেক ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত । তাই এ রোগ থেকে বাচঁতে হলে নিম্নোক্ত বিষয়ে জোর দেওয়া উচিত।
রক্ত পরিসঞ্চালনের আগে হেপাটাইটিস সি এর উপস্থিতি নির্ণয় করার জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে রক্তদানকেন্দ্রগুলোতে নির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা বাড়াতে হবে।
সেলুনে সেভ করা পরিহার করতে হবে এবং প্রতিজনের জন্য আলাদা আলাদা ব্লেড ব্যবহার বাধ্যতামুলক করা উচিত।
সর্বক্ষেত্রে ডিসপোজিবল সিরিঞ্জ ব্যবহার করতে হবে।
রক্ত নেয়া বা রক্ত জাতীয় পদার্থ (প্লাটিলেট, প্লাজমা) তৈরির ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস সি ভাইরাস মুক্ত রক্ত ব্যবহার করতে হবে।
অঙ্গ সংস্থাপনের ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস সি পরীক্ষা বাধ্যতামুলক করা উচিত।
ইনজেকশনের যন্ত্রপাতি পরস্পর ব্যবহার না করা।
ব্যক্তিগত টয়লেট দ্রব্য-যেমন রেজার, টুথব্রাশ, নেল ক্লিপার এবং ত্বক ফোটানো ও রক্ত গ্রহণের যন্ত্রপাতি অন্য কেউ ব্যবহার না করা।
হাতের কাছে ফার্স্ট এইড কিট রাখা।
ত্বকে কাটাছেঁড়া, ক্ষত পরিষ্কার রাখা ও ওয়াটারপ্রুফ ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে রাখা।
হেপাটাইটিস সি আক্রান্তদের করণীয়
নিয়মিত চিকিৎসা নেবেন, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জীবনযাপন করবেন।
মনকে প্রফুল্ল রাখবেন ও ভাইরাস নিয়ে চিন্তা করবেন না।
বাইরের সেলুনে সেভ করবেন না, এমনকি বাসায় আপনার রেজার অত্যন্ত নিরাপদ স্থানে রাখবেন।
কাউকে রক্ত বা কিডনি দেবেন না।
হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের লক্ষণগুলো
সাধারণত এ ভাইরাসে আক্রান-দের ৫/১০ বছরের মধ্যে কোনো লক্ষণ থাকে না। অধিকাংশ ভাইরাস আক্রান্ত রোগীর শরীর ম্যাজম্যাজ করে, অনেকের হাত-পায়ের পাতা গরম থাকে এবং চোখ জ্বালা করে। আহারে রুচি কম থাকে এবং পেটের পীড়ায় ভুগতে থাকে। অনেকে সাদা আমযুক্ত মলত্যাগও করে। তবে এ রোগের দীর্ঘ মেয়াদী ফলশ্রুতি হল লিভার সিরোসিস, লিভার ফেলিউর, রক্ত বমি, পেটে পানি জমা এবং লিভার ক্যান্সার ।
হেপাটাইটিস সি রোগের চিকিৎসা:
এ ভাইরাসের এখন পর্যন- খুব কার্যকরি কোনো টিকা বা ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত না হওয়ায় এর প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ। প্রাথমিক অবস্থায় এ ভাইরাস শনাক্ত করা গেলে এর চিকিৎসা সম্ভব। নব্বই দশকের প্রথম দিকে স্টান্ডার্ড ইন্টারফেরন ইনজেকশন দিয়ে শুরু হয় এ রোগের চিকিৎসা। এসময়ে শতকরা ৫-১৫ ভাগ রোগী চিকিৎসায় দীর্ঘমেয়াদী ভাইরাস মুক্ত হত। আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত প্রতিষেধকের মধ্যে রাইবাভাইরিন ক্যাপসুল ও পেগ ইন্টারফেরন
আক্রান্ত রোগীদের ভাল হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতেছে । এই চিকিৎসার ফলে ৮০ ভাগ ও তদুর্ধ্ব রোগী দীর্ঘ মেয়াদী ভাবে ভাইরাস মুক্ত হতে পারেন। তবে ইন্টাফেরন চিকিৎসা কার্যকর হওয়া নির্ভর করে চিকিৎসা পদ্ধতি, সি ভাইরাসের জেনোটাইপ, রক্তে সি ভাইরাসের মাত্রা, আক্রান্ত লিভারের ফাইর্রাস টিস্যু জমার স্তর, মদ্যপানে ও অন্যান্য ভাইরাসের উপস্থিতি, লিভারে চর্বি ও আয়রন জমাসহ বিভিন্ন কারণের উপর। বর্তমানে বাংলাদেশে হেপাটাইটিস সি রোগ চিকিৎসার প্রচলিত সব ঔষধ পাওয়া যাচ্ছে।
নীরব ঘাতক এ সংক্রামক ব্যাধিটি এইডস, জন্ডিসের চেয়ে ভয়ংকর । তাই এ রোগ থেকে মুক্ত থাকতে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
|