
দেশের চিকিৎসা খাতে নৈরাজ্য : সর্বত্র দুর্ণীতি |
সূত্র হতে জানা যায়, কোনো কোনো হাসপাতালে বেশি রোগীর মৃত্যুর অন্যতম কারণ দক্ষ ডাক্তার ও নাসের্র তীব্র সংকট এবং কর্তব্যে অবহেলা। স্বাস্থ্য অধিদফতরের স্বাস্থ্য বুলেটিন ২০০৮-এর তথ্যমতে ২০০৭ সালে সবচেয়ে বেশি রোগী মারা গেছে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। এই হাসপাতালে ওই বছর ৪৪ হাজার ৩৮৮ জন পুরুষ এবং ৪৫ হাজার ৬৩৮ জন মহিলা রোগী ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে চার হাজার ৩৭৭ জন রোগী মারা যায় (পুরুষ ২ হাজার ৪২৬ এবং মহিলা একহাজার ৯৫১ জন)। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে ২০০৭ সালে পুরুষ রোগী ভর্তি হয় ১৯ হাজার ৯১৬ জন এবং মহিলা রোগী ভর্তি হয় আট হাজার ৩১০ জন। এরমধ্যে ১ হাজার ৭৬০ জন পুরুষ রোগী এবং ৬৬০ জন মহিলা রোগী মারা গেছে। ডেথ রেট আট দশমিক ৪৩। আন্তর্জাতিক সাকসেস রেট দুই শতাংশ। রাজশাহী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ১৩২ জন পুরুষ ও ৪৮ জন মহিলা রোগী ভর্তি হয়। এরমধ্যে ১৪ জন পুরুষ এবং ১২ জন মহিলা রোগী মারা যায়। ডেথ রেট ১৫ দশমিক ১২ শতাংশ। একই বছর কোনো রোগী মারা যায়নি জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতাল, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউ হাসপাতাল, ফরিদুপর চেস্ট হাসপাতাল, নীলফামারি লেপ্রোসি হাসপাতালে। এদিকে প্রায়ই চিকিৎসা যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে হয়ে পড়ায় চরম ব্যাহত হচ্ছে রোগীর-পরীক্ষা নিরীক্ষা। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একটি সিটিস্ক্যান মেশিন গত এক মাস ধরে নষ্ট। নষ্ট রয়েছে আরো বেশি কিছু চিকিৎসা-সরঞ্জাম। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, কিডনি ও মিটফোর্ড হাসপাতালসহ রাজধানীর সরকারি হাসপাতালের শতাধিক যন্ত্র নষ্ট। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে নার্স ও ওয়ার্ডবয়ের অভাবে আইসিইউ চালু করা সম্ভব হচ্ছে না দীর্ঘদিন ধরে। অলস পড়ে আছে প্রায় এক কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম। হাসপাতালগুলোর বাথরুমের বেহাল অবস্থা । দরজায় নেই সিটকিনি। বিরাজ করছে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ। বেশিরভাগ হাসপাতালেই বর্জ্য পোড়ানোর ব্যবস্থা নেই। বেডে বেডে ছারপোকার উপদ্রব। চলছে ডায়াগনস্টিক টেস্টের নামে চিকিৎসা বাণিজ্য। হাসপাতালে ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে বাইরে থেকে টেস্ট করিয়ে কিছু ডাক্তার কামিয়ে নিচ্ছেন ৩০ থেকে ৩৫ ভাগ কমিশন। হাসপাতালের ওষুধ বাইরের ফার্মেসিতে বিক্রি হচ্ছে অবাধে। অপারেশনের সময় রোগীদের দিয়ে বাড়তি ওষুধ কেনার অভিযোগ রয়েছে ডাক্তার, নার্স ও ওটিবয়দের বিরুদ্ধে। এদের কারো কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে খারাপ ব্যবহারের। স্বাস্থ্য সেক্টরের অগ্রগতির আরেকটি বড় বাধা দলীয়করণের মাধ্যমে ডাক্তারদের বদলি, পদোন্নতি ও পদায়ন। যখন যে সরকার ক্ষমতায় যায় তখনই শুরু হয় দলীয়করণ। কেবল দলীয়করণের মাধ্যমে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালের বিএনপি ও জামায়াত সমর্থক দুজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ ডাক্তারকে বদলি করে এ হাসপাতালে আওয়ামী লীগ সমর্থক তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ ডাক্তারকে পদোন্নতি দিয়ে ইউনিট প্রধান করায় প্রতি মাসে অপারেশন কমেছে ১৫টি। মৃত্যুহারও বেড়েছে। এরকম দলীয়করণের মাধ্যমে সাবেক ৪ দলীয় জোট সরকারের আমলেও বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতি হতো। মেধা-যাচাইয়ের বাছ-বিচার করা হতো না। তীব্র সিট সংকটে রাজধানীর প্রায় সবগুলো সরকারি হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসা মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালে একটি সিট পেতে রোগীদের মাসের পর মাস ঘুরতে হচ্ছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে একসিটে রাখা হচ্ছে দুজন রোগী। নিউরো সার্জারি ওয়ার্ডে ২২ সিটের বিপরীতে রোগী থাকে প্রায় ১০০। অতিরিক্ত রোগীর ভিড়ের কারণে একজন থেকে আরেকজনের দেহে ছড়িয়ে পড়ছে জীবাণু। অনেকই ভুগছেন ইনফেকশনে। স্বাস্থ্য সেবার মানোন্নয়নে আরেকটি বাধা হচ্ছে লুটপাট ও দুর্নীতি। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি দুর্নীতির ঘটনায় অভিযুক্তদের বিচার হচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা শাখায়। এরমধ্যে জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও কম্পিউটার ক্রয়ের দুর্নীতির অভিযোগে একজন ডাক্তারকে সাময়িক বরখাস- করা হয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. একেএম জাহাঙ্গীর চৌধুরীকেও দুর্নীতির দায়ে বদলি করে সেই পদে দেয়া হয়েছে ডা. কাজী শাহাদত হোসেনকে। শুধু জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট হাসপাতালই নয়, কমবেশি দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও এর অধীনস- প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই। সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনার সুযোগ কাজে লাগিয়ে চিকিৎসা বাণিজ্য চলছে বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। নানা কৌশলে চিকিৎসা ফি বাবদ হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। বিশেষ করে ডায়াগনস্টিক টেস্ট ও রোগী ভর্তি বাবদ ডাক্তার ও দালালদের কমিশন এখন ওপেন সিক্রেট। অভিযোগ রয়েছে, একটি টেস্টে ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন- কমিশন দেয়া হচ্ছে। ১০০ টাকার একেকটি পরীক্ষায় আদায় হচ্ছে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। কোনো কোনো ডাক্তারের পরামর্শে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ খেয়ে নিঃস্ব হচ্ছে রোগীরা। গবেষণায় দেখা গেছে, অপ্রয়োজনীয় এন্টিবায়োটিক ওষুধ খাওয়া বন্ধ হলে বছরে রোগীদের সাশ্রয় হতো প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ওষুধ বিজ্ঞানী জানান, দেশের আড়াইশ কোম্পানি বছরে কমপক্ষে সাত হাজার কোটি টাকার ভিটামিন ওষুধ বিক্রি করছে। এরমধ্যে ডাক্তাররা ১৭ থেকে ২০ শতাংশ ভিটামিন রোগীদের গেলাচ্ছেন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি ও রোগীদের অনুরোধে কিংবা না বুঝে। কোনো কোনো ফার্মেসিতে বিক্রি হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ ও ভেজাল ওষুধ। বিক্রি হচ্ছে অনুমোদনহীন দেশি-বিদেশি ওষুধও। জনবলের অভাবে ওষুধ প্রশাসন পরিদফতরের পক্ষে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। পরিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ২৪৬টি এ্যালোপেথিক ওষুধ কোম্পানি, ২৬১টি ইউনানি, ১৬১টি আয়ুর্বেদিক ও ৭৭টি হোমিওপ্যাথিক ওষুধ কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ ও দেখভাল করার জন্য প্রতিষ্ঠানটির ২২০ জনবলের ৬৯টি পদই শূন্য। ৬৪ জেলায় ড্রাগ সুপার রয়েছেন মাত্র ২৯ জন। |
Copyright © 2009 |Amarhealth|