
জাফর সাদেক শিবলী/সাইফ নাসির
আমারহেলথ (২৯ সেপ্টেম্বর, বুধবার): সারাদেশে অ্যানথ্রাক্স পরিস্থিতি মারাত্নক আকার ধারণ করায় বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্হ হচ্ছেন সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা। গরু আমদানী-রপ্তানী, মাংস সরবরাহ, খামারী, দুধবিক্রেতা, চামড়া ব্যবসায়ীরা বেশ সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।
আক্রান্ত গরুর মাংসে সমস্যার কারনে ব্যাপকভাবে কমে গেছে গরুর মাংস বিক্রি। কারওয়ান বাজারে আগে দৈনিক প্রায় ৫০টি গরু জবাই হতো; এখন তা তিন থেকে চারটিতে নেমে এসেছে।
তবে অ্যানথ্রাক্সের কারনে সবমিলিয়ে দেশের অর্থনৈতি কি পরিমানে ক্ষতিগ্রস্হ হতে পারে তার যথার্থ কোন পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। নানা দিক বিবেচনা করে সংশ্লিষ্টরা বিষয়টিকে গোপন রেখেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশের মতে, অ্যানথ্রাক্সের প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা যাবে দুধ, মাংস, চামড়া ইত্যাদির চাহিদা কমে যাওয়া। কারন জনগন ক্ষতিগ্রস্হ হওয়ার ভয়ে মাংস খাওয়া এবং দুধ কেনাবেচা বন্ধ রাখছে।
তিনি বলেন, সাধারন পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে শতকরা ৪০ ভাগ মাংস বিক্রি এবং সংশ্লিষ্টদের ৮৫ আয় কমে গেছে। তবে বাজারদর হিসেব করে তিনি বলেন যে গরুর মাংসের মূল্য মাত্র শতকরা ৩০ ভাগ কমেছে।
তিনি আরো বলেন, সরকার যদি প্রতিটি গরু জবাই করার আগে তার সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে সেক্ষেত্রে এ সমস্যা অনেকাংশে নির্মূল করা সম্ভব হবে। তবে আরো লক্ষ রাখতে হবে যে কসাইরা যেন সুস্থতা নিশ্চিত করা হয়েছে এরকম পশু ছাড়া অন্যকোন পশু জবেহ করতে না পারে।
অ্যানথ্রাক্স আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার পর প্রায় এক মাস ধরে রাজধানীর মাংসের দোকানে এই দুরবস্থা বিরাজ করছে। হাজার হাজার কসাই বেকার হয়ে আছেন। জাত কসাইরা অন্য কোনো কাজ জানেন না। অন্য পেশায় তাঁরা যেতেও চান না। দিনের পর দিন আয়ের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় পরিবার নিয়ে তাঁরা দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন।
শুধুমাত্র কাওরান বাজারের মোট ১২টি দোকানে কসাইয়ের সংখ্যা প্রায় ১০০ জন। বেকার হয়ে তাঁরা এখন সুদিনের অপেক্ষায় আছেন।
বহুদিন ধরে কাওরান বাজারে কসাইয়ের কাজ করেন আলাল। তিনি জানান, জাত কসাইরা অন্য কোনো পেশায় যেতে চান না। যত কষ্টই হোক, তাঁরা পূর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে যান না। তিনি বলেন, ‘জান গেলেও পেশা পরিবর্তন করতে পারুম না’
যথার্থ পরিসংখ্যান না থাকলেও রাজধানীর কসাইদের মতে, দেশে মাংস বিক্রির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত মানুষের সংখ্যা ৫০ হাজারের বেশি। নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থে কসাই সমিতির নেতারা গাবতলীতে সমাবেশ করে অ্যানথ্রাক্স আতঙ্ক দূর করার জন্য পদক্ষেপ নিতে সরকারকে ইতিমধ্যে ১৫ দিনের সময় বেঁধে দিয়েছেন।
মাংস বিক্রি, কসাইদের করুন অবস্থার পাশাপাশি দুধের উৎপাদন ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা।
তবে বাংলাদেশ ভেটেনারী কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ড. আব্দুর রউফ মোল্লা জানান, অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত গরুর মাংসে সমস্যা থাকলেও এর দুধে কোন সমস্যা নেই বলে । তিনি বলেন, ‘অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত গাভীর দুধ পান করতে কোন সমস্যা নেই।’ এতে করে কারো অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
তিনি আরো বলেন জবাই করার যে আইন আছে তা মানলে বর্তমানে যে হারে মানুষ অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হচ্ছে তার প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ পর্যন্ত সংক্রমণ কমে যাবে।
তিনি বলেন, ১৯৫৭সালে জবেহ আইন পাশ হলেও তা কঠোরভাবে না মানার কারনে ধীরে ধীরে অ্যানথ্রাক্স সমস্যা দিন দিন বাড়ছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ২৫ সদস্যের একটি জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি এবং পাঁচ সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। জাতীয় কমিটির প্রধান করা হয়েছে প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাসকে আর কারিগরি কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব।
সচিবালয়ে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে মঙ্গলবার অ্যানথ্রাক্স নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত এক আন্তমন্ত্রণালয় সভা শেষে প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাস সাংবাদিকদের এ কথা জানান।
মন্ত্রী বলেন, ‘কোরবানির ঈদের আগে অ্যানথ্রাক্স পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্যেই এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। আশা করছি, যেসব কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, তাতে রোগটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।’
প্রাণিসম্পদমন্ত্রী জানান, ঈদের আগে দেশব্যাপী ব্যাপকভাবে প্রতিষেধক কার্যক্রম শেষ করা সম্ভব নয়। তাই সরকার আপাতত আক্রান্ত আটটি জেলার ১৮টি উপজেলায় গরু, ছাগল, মহিষ ও ভেড়াকে ভ্যাকসিন দেবে।
সবমিলিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, ঠিক এ মূহুর্তে ক্ষতির পুরো পারিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও আগামী কয়েকদিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান হাতে পাওয়া যাবে। এবং যে কোন মূল্যে কোরবানীর ঈদের আগে সরকার অ্যানথ্রাক্স নির্মূলে ব্যর্থ হলে অর্থনীতির অবস্থা খুব নাজুক হয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
|