ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রে নেই পর্যাপ্ত সরঞ্জাম । যা আছে তার অধিকাংশই অকার্যকর ও পুরোনো। অনুশীলন কেন্দ্রটি পরিচালনা ও ছাত্রদের মোটিভেট করার জন্য নেই পর্যাপ্ত লোকবল। অনিয়ম, অবহেলা, দায়িত্বহীনতা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ও নজরদারির অভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শারীরীক শিক্ষা কেন্দ্রটি জীর্নদশায় পরিণত হয়েছে। একই সাথে ছাত্রদের আগ্রহও কমে যাচ্ছে অনুশীলন কেন্দ্রটির উপর। এ জন্য ফিটনেসজনিত সমস্যায় ভুগছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, পড়াশোনায় ভালভাবে মনোনিবেশের জন্য সুস্থ শরীর গঠনের নিমিত্তে ১৯২৫ সালে শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রটি চালু হয়। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে এটি চালু করা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু আন্তঃবিভাগীয় খেলাধুলা ছাড়া ৯০% ছাত্রদের এটি কার্যত কোনো কাজেই আসে না। ছাত্রীদের ক্ষেত্রে এই হার আরো বেশি। অনুশীলন কেন্দ্রের তথ্য মতে, ১০% এর কম ছাত্র এখানে শারীরিক প্রশিক্ষণ বা ব্যায়াম করতে আসে। মেয়েদের ক্ষেত্রে এই হার আরোও কম।
এ ব্যাপারে শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক শওকতোর রহমান বলেন, জিমনেসিয়ামে ছাত্ররা আগের চেয়ে এখন অনেক কম আসে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ছাত্ররা এখন অন্যান্য বিনোদন যেমন, মোবাইল, কম্পিউটার, ইন্টারনেট প্রভৃতির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এছাড়া ছাত্রদের আবাসিক সমস্যাকেও তিনি এর কারণ হিসেবে দায়ী করেন।
অন্যদিকে মেয়েদের জন্য নেই কোনো পৃথক মহিলা ইন্সট্রাক্টর বা ট্রেইনার, যে কারণে উপযুক্ত পরিবেশ না পাওয়ার কারণে তারা আসতে পারছে না।
অনুসন্ধানের জানা যায়, ১৯৮৫ সালের পর এখন পর্যন্ত জিমনেসিয়ামের জন্য কোনো সরঞ্জাম কেনা হয়নি। ১৯৮৫ সালের জাপানী অনুদানের অর্থ দিয়ে কেনা হয়েছিল এসব সরঞ্জামাদি। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জিমনেসিয়ামে ব্যায়ামের যন্ত্রপাতিগুলো বিশৃঙ্খলভাবে পড়ে আছে। এগুলোর অধিকাংশই কাজের অযোগ্য। সেখানে কয়েকজন ব্যায়াম করছে। তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এদের মধ্যে দু’একজন বহিরাগত। তারা অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করে বলে জানায়। ব্যায়ামাগারে কোন যন্ত্র কিভাবে ব্যবহার করতে হবে এ ব্যাপারে কোনো দিক-নির্দেশনাও নেই। অনুশীলন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের সাথে কথা বললে তিনি জানান, এখানে ১ জন উপদেষ্টা, ১জন পরিচালক, ১জন উপ-পরিচালক, ৫জন সহকারী পরিচালক, ২জন ইন্সট্রাক্টর ও ১জন ট্রেইনার আছেন।
তিনি আরো বলেন, আমরা প্রতিবছর ১ম বর্ষ ছাত্রদের অরিয়েন্টশন অনুষ্ঠানে আমাদের গাইডলাইন তুলে ধরা এবং মোটিভেট করার চেষ্টা করি। ব্যায়ামাগারের এ জীর্নতার পেছনে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট স্বল্পতা। এছাড়াও এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরদারিরও অভাব রয়েছে বলে তিনি জানান।
এদিকে এখানে নিয়মিত ব্যায়াম করতে আসা পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ২য় বর্ষের ফজলুল হক হলের ছাত্র লেনিন বলেন, আমি ৭-৮ মাস ধরে এখানে নিয়মিত আসছি, কিন্তু' এখন পর্যন্ত কোনো ইন্সট্রাক্টর বা ট্রেইনারকে পাইনি। পর্যাপ্ত ইন্সট্রুমেন্ট নেই, যা আছে তার অধিকাংশই নষ্ট। এছাড়া এখানে কোনো ফ্যান নেই, আলাদা কোনো ড্রেসিং রুম নেই যেখানে ব্যায়ামের পর ফ্রেস হওয়া যায়। কাপড়-চোপড়সহ অন্যান্য জিনিসপত্র রাখার জন্য কোনো বক্স বা লকার নেই। জানালা ভাঙ্গা, বাথরুমগুলো নোংরা থাকে, প্রায় সময়ই পানি থাকে না।
রাষ্ট্র বিজ্ঞান ৪র্থ বষের্র জহুরুল হক হলের আবাসিক ছাত্র আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ১৫-২০ দিন ধরে এখানে ব্যায়াম করতে আসছি, কিন্তু কোনো ইন্সট্রাক্টর বা ট্রেইনার পাইনি, শুধু একজন লোক থাকে যিনি গেট খুলে দিয়ে যায়। এর সরঞ্জাম যথেষ্ট নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে এটি আরও মানসম্মত হওয়া উচিৎ।
এক প্রশ্নের জবাবে শওকতোর রহমান বলেন, ট্রেইনার খুজলেই পাওয়া যাবে। মহিলা প্রশিক্ষক নিয়োগ দেয়া হবে, তবে কবে হবে তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারেন নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ০৯-১০ অর্থবছরে বাজেটে শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় ক্রীড়া খাতের বরাদ্দ রাখা রয়েছে ১৩ লাখ টাকা যা ০৮-০৯ এর বাজেটে ছিল ১০ লক্ষ টাকা এবং ব্যায়ামাগার মেইন্টেনেন্সের জন্য রাখা হয়েছে ১ লাখ টাকা যা গত বাজেটে ছিল ১৫,০০০/- টাকা যেটি এই শারীরীক শিক্ষা কেন্দ্রের মানোন্নয়নের জন্য খুবই অপর্যাপ্ত বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রটির ভারপ্রাপ্ত পরিচালক। তিনি বলেন, আমরা গত বছর সরকার থেকে ৫৩ লাখ টাকার একটি অনুদান পেয়েছি, যেটি দিয়ে কিছু উন্নতমানে সরঞ্জাম কেনা হবে এবং আশা করছি তা এ মাসের (জুলাই) মধ্যেই পেয়ে যাব, তখন সমস্যা কিছুটা দূর হবে। অন্যদিকে একটি নতুন জিমনেসিয়াম ভবন নির্মাণাধীন। এটি সম্পূর্ণ হলে সমস্যা অনেকাংশেই কমে যাবে।
একটি অংশ বহিরাগতদের দখলে: শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রের এক পাশে কোন সীমানা বেস্টনি না থাকায় একটি বিশাল জায়গা বহিরাগতদের দখলে রয়েছে যার কারণে ৪০০ মিটার ট্র্যাক এর ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না, অন্যদিকে বহিরাগতরা অনায়াসে ঢুকে পড়ছে শারীরিক শিক্ষার কেন্দ্রের অভ্যন্তরে। সিটি কর্পোরেশনের জটিলতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের এ জায়গা দখল করা যাচ্ছে না বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী মো: আমীর হোসেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুবিধা বৃদ্ধি করতে মেডিকেল সেন্টারটিকে ১০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে রূপান্তরের পরিকল্পনা আছে। তিনি আরও বলেন, শিক্ষা ও গবেষনা কর্ম সঠিকভাবে করার জন্য সুস্বাস্থ্যের প্রয়োজন আছে, আর মানসিক উৎকর্ষ ছাড়া স্বাস্থ্যের উন্নতি সম্ভব নয়। সেজন্য আমাদের জিমনেসিয়াম, সুইমিংপুল, খেলার মাঠ রয়েছে।
ছাত্রদের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে তবে যা আছে তারও সঠিক সদ্বব্যবহার হয় না। তিনি আরও বলেন, আমরা সবসময় ছাত্রদের উৎসাহিত করি যাতে তারা মাঠে যায়। ছাত্রদের প্রতি আমার উপদেশ থাকবে তারা যেন পড়াশুনার পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়াম করে এবং খেলাধুলা করে।
শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রের সীমানা দেয়ালের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশনের সাথে একটি জটিলতা আছে, তবে এ সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী ভাল বলতে পারবেন।
বিশ্বদ্যিালয়ের প্রধান প্রকৌশলী মো: আমীর হোসেন বলেন, সিটি কর্পোরেশন বলেছে তারা নিজ উদ্যোগে এই দেয়াল করে দেবে। আমরা গত দুই মাস আগে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠিয়েছি, তবে তারা এখন পর্যন্ত কোন উত্তর দেয় নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এ জায়গাটিতে স্থানীয় প্রভাবশালীদের হাত রয়েছে এবং সিটি কর্পোরেশনের সাথে তাদের যোগসাযশের কারনে বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গা হওয়া সত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় এটি উদ্ধার করতে পারছে না। গত বছর তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জরুরী অবস্থা থাকাকালে দেয়াল নির্মানের কাজ শুরু হলেও মাঝপথে এসে থেমে যায়। |