
ঋতুভেদে সৌন্দর্যতানজিনা আক্তার দিপু |
সৌন্দর্য ও রূপ সচেতন নারী পুরুষ সকলেই চান তার সৌন্দর্য স্থায়ী হোক। অর্থাৎ বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে তার সৌন্দর্য যাতে নষ্ট না হয়। যে কারণে তারা চান এমনভাবে রূপচর্চা করতে যা তার আসল সৌন্দর্য ধরে রাখবে এবং তার সৌন্দর্যে কোন ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে না। এ কারণে তার সুন্দর মুখে ব্রণ উঠলে, চোখের নিচে কালো দাগ পড়লে, ঠোঁটের কোণে ঘাঁ হলে, ঘন কালো লম্বা চুল ঝরতে শুরু করলে তার ভাবনার যেন অন্ত থাকে না। তখন রূপচর্চার জন্য কেবল কেমিক্যাল জাতীয় প্রসাধনী আরও বেশি ক্ষতিকারক হতে পারে। তখন দরকার রূপচর্চার এমন সামগ্রী যা ক্ষতিকারক প্রভাব থেকে মুক্ত। তবে রূপচর্চার জন্য সব বিষয়ে সচেতন হতে হবে। সেক্ষেত্রে দিনেরাতে রূপচর্চার যেমন পার্থক্য হবে তেমনি গ্রীষ্মে ত্বকের যত্ন: ২. লাউয়ের রস ও তরমুজের রস বরফ করে মুখে ঘষুন। এতে ত্বক মোলায়েম ও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। তবে ত্বকে ব্রণের সমস্যা থাকলে কখনও বরফ ঘষবেন না। তাহলে ব্রণ ও ব্রণের দাগ মুখে বসে যাবে। ৩. রোদে পোড়া কালো দাগ দূর করতে কমলার খোসা বেটে মুখে ১০ মিনিট রেখে মুখ ধুয়ে ফেলতে হবে। ৪. সপ্তাহে দু’দিন কাঁচা হলুদ, মশুরীর ডাল, দুধ বা দুধের সর একসাথে বেটে পেস্ট তৈরি করে মুখে লাগিয়ে ২০ মিনিট পরে ধুয়ে ফেললে ত্বক উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। ৫. পানিতে কয়েক ফোটা গোলাপজল মিশিয়ে দিনে দু’বার গোসল করতে পারলে শরীরটা ফুরফুরে থাকে। এই গরমে মেকআপের প্রতিও আপনাকে সচেতন হতে হবে । অতিরিক্ত মেকআপের ফলে ত্বকে নানা সমস্যা হতে পারে । তাই মেকআপ ও অন্যান্য প্রসাধনী ব্যবহারে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে। ১. রোদে বাহিরে বের হবার সময় অবশ্যই সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে হবে । সানস্ক্রিনের এসপিএফ ৩০ হওয়া ভালো । তবে সানস্ক্রিন লোশন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সান প্রোটেকশন ফ্যাক্টর এসপিএফ অবশ্যই ১৫ হতে হবে। এসময়ে ওয়াটার প্রুফ সানস্ক্রিন ব্যবহার করা যেতে পারে। ২. গ্রীষ্মে হালকা মেকাআপ করা ভাল। অতিরিক্ত মেকআপের ফলে লোমকূপ বন্ধ হয়ে ত্বকের ক্ষতি হতে পারে । মেকআপ তোলার সময় অবশ্যই ভেজা টিস্যু দিয়ে ঘষে ঘষে তুলতে হবে। ৩. দাগহীন সুন্দর ত্বকে ফাউন্ডেশন এর পরিবর্তে ফ্রি ময়েশ্চারাইজার লাগাতে হবে। তবে ফউন্ডেশন লুজ পাউডারের সাথে ব্যবহার করা যেতে পারে। রক্ত চন্দন ময়েশ্চারাইজার সান প্রটেক্টিং ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। ৪. জামা কাপড়ে পারফিউম লাগাবেন না, কারণ তাতে ত্বকে দাগ পড়ে যেতে পারে। এছাড়াও ঘামের উপর সরাসরি পারফিউম ব্যবহারের ফলে উগ্র গন্ধ বের হতে পারে । ৬. কবজি, ঘাড়, গোড়ালি, বগল এবং হাটুর পিছনে পারফিউম লাগালে আপনি স্বাচ্ছন্ধ বোধ করবেন।
২. বর্ষাকালে রোদ কম থাকলেও সূর্যরশ্মি প্রতিফলনের জন্য এ সময় অবশ্যই ওয়াটার প্রুফ সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে হবে। ৩. মুখে ব্রণ হলে নিমপাতা ও চন্দনবাটা লাগাতে হবে। যদি এ সময় ব্রণের দাগ বসে যায় তবে চন্দনবাটা, হলুদ ও লবঙ্গবাটা, জয়ফল গুঁড়োর সঙ্গে আপেল ও কমলালেবুর রস মিশিয়ে লাগাতে হবে এবং ২০ মিনিট পরে কাঁচা দুধ তুলোয় মিশিয়ে মুছে নিতে হবে। ৪. গোসলের সময় গোলাপের পাপড়ি ও কাঁচা হলুদবাটা, বেসন ও দই এক সঙ্গে মিশিয়ে ত্বকে উজ্জ্বলতা ফিরে আসবে। গোলাপের সুগন্ধ সারাটাদিন আপনাকে ঘিরে থাকবে এবং মন মেজাজ ফুরফুরে রাখবে। ৫. স্কিন টনিক হিসেবে ফুটন্ত পানিতে জুঁই এবং গোলাপের পাপড়ি সেদ্ধ করে ঠান্ডা করে ৬. বর্ষায় ময়েশ্চারাইজার হিসেবে দুধের সর ও গোলাপের পাপড়িবাটা ব্যবহার করা ভাল। ৭. বর্ষায় ক্লিনজিংয়ের জন্য ময়দা ও দুধের সর মুখে, গলা ও হাতে লাগিয়ে আধ শুকানোর পর আস্তে আস্তে ঘষে ধুয়ে ফেলতে হবে। হালকা গরম পানিতে কর্পূর মিশিয়ে তাতে তোয়ালে ভিজিয়ে মুখ, গলা, ঘাড় ও কানের পাশ পরিষ্কার করতে হবে।
গ্রীষ্মে চুলের যত্ন: ২. চুলে শ্যাম্পুর করার ১ ঘণ্টা আগে হালকা গরম নারিকেল তেল চুলের গোড়ায় ম্যাসেজ করতে হবে। ৩. চুল ঝরঝরে করতে মাথায় লেবুর রস ও পিঁয়াজের রস একসাথে মেখে এক ঘণ্টা পর শ্যাম্পু করে ফেলুন। ৪. চুল সুন্দর, নির্মল ও ঝরঝরে রাখতে মাসে অন্তত দু’বার মেহিদী বাটা, টক দই, ডিম, এক চামচ অলিভ অয়েল এক সাথে পেস্ট করে চুলে মেখে ১ ঘণ্টা পর শ্যাম্পু করতে হবে। ৫. ভেজাচুলে বাইরে গেলে চুলে ময়লা বসে যেতে পারে। তাই বাইরে বের হতে হলে অবশ্যই চুল শুকিয়ে নিতে হবে। বাইরে থেকে বাসায় ফিরে আঁচড়াতে হবে তাহলে চুলে ময়লা বসতে পারবে না। গ্রীষ্মকালে চুলের যত্নের জন্য অবশ্যই প্রোটিন, ভিটামিন ও স্নেহ পদার্থ জাতীয় খাবার খেতে হবে। তবে রোদে বের হতে হলে অবশ্যই ছাতা বা স্কার্ফ ব্যবহার করতে হবে । চুলে যাতে সহজে বাতাস চলাচল করতে পারে সে জন্য খুব আটোভাবে স্কার্ফ ব্যবহার করা ঠিক নয়। চুলে কখনই ময়লা বসতে দেয়া যাবে না। কারণ ময়লা বসে গেলেই চুলে খুসকি হবে। তাই চুল সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। তবে চুলে অতিরিক্ত পরিমাণে কোন সমস্যা দেখা দিলে বা চুল ঝরতে শুরু করলে, সেক্ষেত্রে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। বর্ষায় চুলের যত্ন: ২. তৈলাক্ত চুলে লাইট কনডিশনার এবং শুষ্ক চুলে ডিপ ময়শ্চারাইজিং কনডিশনার ব্যবহার করতে হবে। ৩.চুলে খুসকি থাকলে অ্যান্টিড্যানড্রাফ শ্যাম্পু ও নিয়মিত কনডিশনার ব্যবহার করতে হবে। ৪.এসময় চুল রুক্ষ হয়ে পড়লে স্ট্রবেরি ও বেলের ক্বাথ, মধু ও ডাবের পানি মিশিয়ে চুলে লাগিয়ে আধ ঘণ্টা পর শ্যাম্পু করতে হবে। ৫. জবা ফুল ,দূর্বা ঘাস, নারিকেল তেল ও নিম পাতাবাটা এ সময়ে চুলে লাগানো খুবই ভালো। ৬.চুল ঝরঝরে ও খুসকিমুক্ত রাখতে মেথিদানা ও জিরে দুধে ভিজিয়ে সারারাত রেখে দিতে হবে। পরদিন বেটে এতে নারিকেল তেল জবা ফুল, তুলসীপাতা ও বেল পাতাবাটা মেশাতে হবে এবং চুলে লাগাতে হবে। ৭.চুল খুব পাতলা হলে শ্যাম্পুর সঙ্গে ডিম ও পাউডার জিলেটিন মিশিয়ে চুল ধুয়ে নিতে হবে। ৮.চুলের মসৃণতা ফিরে পেতে হলে কচি আমলকীর রস ক্যাস্টর অয়েলে মিশিয়ে চুলে লাগিয়ে এক ঘণ্টা রাখতে হবে এবং পরে চুল ধুয়ে শ্যাম্পু করতে হবে। ৯.এছাড়াও এ সময় চুলে নারকেল তেল নিশিন্দাপাতা, আনারস, তুলসীপাতা ও পাতিলেবুর রস মিশিয়ে লাগানো ভাল। ১০. চুলের রুক্ষতা কাটাতে ডিম, টকদই, পাকা পেঁপের ক্বাথ, মধু, নারিকেল তেল, কেশুত পাতা ও আদার রস, আমলা, শিকাকাই পাউডার ও পাতি লেবুর বীজ এক সঙ্গে মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করে পুরো চুলে লাগিয়ে ৪০ মিনিট পরে ধুয়ে ফেলতে হবে। বর্ষাকালে চুলের যত্নের জন্য আরও কিছু বিষয়ের প্রতি সতর্ক হতে হবে। বর্ষাকালে বাইরে বের হতে হলে অবশ্যই ছাতা নিয়ে বের হতে হবে। চুল কখনই ভেজা রাখা যাবে না। কারণ চুল ভেজা রাখলে চুলের গোড়া দুর্বল হয়ে পড়ে এবং চুলে ফাঙ্গাশ পড়তে পারে। ভেজা চুল কখনও আচড়াবেন না। ফ্যানের বাতাস কিংবা চুল শুকানোর মেশিন দিয়ে চুল শুকিয়ে নিতে হবে। ঘাম জমে মাথায় ফোড়া বা ফুসকুড়ি হলে প্রতিদিন গোসলের আগে বিচিছাড়া বেলের শাঁস চটকে মাথার তালুতে লাগাতে হবে। এভাবে এক ঘন্টা রেখে রিঠা ও আমলা ভেজানো পানিতে শ্যাম্পু করতে হবে ।
এছাড়াও নখের বাড়তি যত্নের জন্য : ১. দিনে দু’বার সাবান পানিতে কবজি থেকে নখ পর্যন্ত হাত ধোয়া এবং পায়ের নখ থেকে পাতা পর্যন্ত ধোয়া উচিত। ২. হাত-পা ধোয়ার পর তেল, ক্রিম বা লোশন মাখতে হবে। ৩. হাত-পা সব সময় শুকনো রাখতে হবে। ৪. নখের যত্নের জন্য অতিরিক্ত পানি, অতিরিক্ত ঠান্ডা বা গরম, ক্ষার জাতীয় পানি খুব ক্ষতিকারক। ৫. নখের যত্নের জন্য নেল এনামেল ব্যবহার খুবই উপকারী। কারণ এগুলো নখের উজ্জ্বলতার সাথে সাথে নখকে মোটা করে, ফলে নখ খুব সহজেই ভেঙ্গে যায় না। |
ঋতুভেদে ও উপলক্ষ্য গুলোতেও রূপচর্চার তারতম্য হবে। খুব চমৎকার পোশাকের সাথে যেমন স্যান্ডেল মানানসই নয়, কোন উপলক্ষ্যে সাধারণ পোশাক যেমন দেখতে খারাপ লাগে তেমনি রুপচর্চায় কেমিক্যাল জাতীয় প্রসাধনী ক্ষতিকারক হলেও হারবাল এবং কেমিক্যাল উপাদানের সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবহার আপনার উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে সহায়তা করবে। অর্থাৎ প্রাকৃতিক উপাদান ও কেমিক্যাল প্রসাধনীর এমন ব্যবহার করতে হবে যাতে আপনার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সৌন্দর্যে কোন ক্ষতিকর প্রভাব না ফেলে ।
Copyright © 2009 |Amarhealth|