বিশুদ্ধ পানির অভাবে অসুখে ভুগছে ঢাবির ২ টি হলের মেয়েরা, অন্য হলগুলোর অবস্থাও আশংকাজনক

১৭ মার্চ ২০১০
তানজিনা আক্তার দিপু

প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী বিশিষ্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ মেয়ে শিক্ষার্থী। কিন্তু এ বিপুল পরিমান ছাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সুবিধা প্রদানে অনেকটাই ব্যর্থ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আবাসন সংকট, চিকিৎসক সংকট, ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা, অপর্যাপ্ত এ্যম্বুলেন্স সার্ভিস, অপরিচ্ছন্নতা, ময়লা-দুগন্ধ যুক্ত পানি, নিন্মমানের খাবার, বিদ্যুৎ সমস্যা,  প্রভৃতি ছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রী হলে থাকে। মেয়েদের সাধারণত ঢাকার বাইরে থেকে এসে নিরাপত্তার জন্য হলে একটি সীট পেতে অনেক ভোগান্তির স্বীকার হতে হয়। বিশেষ করে ফজিলাতুন্নেসা ও কুয়েত মৈত্রী হলে সীট পাওয়াটা অনেক জটিল ব্যাপার। এছাড়াও রয়েছে অনেক সমস্যা। পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সুবিধা না পাওয়া সেগুলোর মধ্যে অন্যতম।

হলে থাকা কিছু ছাত্রীর সাথে কথা বলে জানা যায় হলে পানির সমস্যাটা অনেক বেশী জটিল। বেশিরভাগ সময় দুপুরের দিকে পানি থাকে না। যদিও রোকেয়া হলে দুটি, শামসুন্নাহারে তিনটি, ফজিলাতুন্নেসা হলে দুটি ফিল্টার রয়েছে, তবে সেগুলো এত অধিক সংখ্যক ছাত্রীর জন্য পর্যাপ্ত নয়। আবার ফিল্টার গুলো বেশিরভাগ সময় নষ্ট থাকে। বিশেষ করে বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হলে ৫০০ জনের জন্য ২০ লিটারের মাত্র দুটি ফিল্টার রয়েছে, যার একটি বর্তমানে নষ্ট। তখন ছাত্রীদের বেসিন কিংবা বাথরুমের পানি ব্যবহার করতে হয়। তাছাড়া ফজিলাতুন্নেসা ও কুয়েত মৈত্রী হলে বুড়িগঙ্গার পানি রিফাইন করে দেয়া হয়। কিন্তু এই পানিতে এত পরিমাণ সীসা থাকে যা পুরোপুরি রিফাইন হয় না। এই পানি কোন পাত্রে নিলে তা কালো দেখায় এবং পানিতে অনেক দুর্গন্ধ থাকে। তাছাড়া কখনও কখনও ফিল্টার, বেসিন কিংবা বাথরুমসহ সকল পানিতে কেঁচো, পোকা, পাথর, গাছের গুড়ি ইত্যাদি ময়লা পাওয়া যায়। আবার অনেক ছাত্রী মিনারেল ওয়াটার কিনে খায়।  বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা বেশীরভাগ ছাত্রী মধ্যবৃত্ত পরিবার হতে আসায় নিজের অর্থ খরচ করে নাগরিক এইসব সুযোগ গ্রহনের সামর্থ নেই অনেকের। এই সব নোংরা পানি থেকে মেয়েদের নানা রকম রোগ যেমন ডায়রিয়া, টাইফয়েড, আমাশয়, কলেরা, জন্ডিস, ভাইরাস জ্বর ইত্যাদি হয়ে থাকে। এছাড়াও খাবারের নিম্ন মান ও পানির সমস্যার কারণে তাদের অনেকের চুল পড়ে যাওয়া, চুল রুক্ষ হয়ে যাওয়া, মুখে ব্রণ উঠা ইত্যাদি সমস্যাও দেখা যায়।

কুয়েত মৈত্রী হলের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী শিউলী জানায়-কখনও কখনও এই নোংরা পানিও পাওয়া যায় না। ভোর ছয়টা থেকে পানির জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

ফজিলাতুন্নেসা ও কুয়েত মৈত্রী হলে ঘন্টায় ঘন্টায় লোডশিডিং দেখতে পাওয়া যায় এবং আবাসন সমস্যার জন্য গরমের দিনে তাদের শরীরে বিভিন্ন ফোসকা বের। এছাড়া খাবারের নিম্ন মান এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার অভাবে মেয়েদেরে অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকে।

কিন্তু এসব সমস্যার সময়ও কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ খুব কম। হলে মেয়েরা মুদীর দোকান থেকে সামান্য কিছু ওষুধ পেলেও তা পর্যাপ্ত নয়। তাই নিজ উদ্যোগেই তাদের ডাক্তারের কাছে যেতে হয়। এছাড়াও ডাক্তার যা ওষুধ লিখেন তা অধিকাংশ সেখানে পাওয়া যায় না। তাছাড়া ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের হলে এম্বুলেন্স সার্ভিস সুবিধা খুব কম।

যদিও কর্তৃপক্ষ হল গুলোতে নিয়মিত মেয়েদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে থাকে, কিন্তু তবুও মেয়েদের এসব সমস্যা গুলোর সমাধান এখনও হচ্ছে না। তাই মেয়েদের দাবী অসুস্থতার সময় মা-বাবা এবং হলে নিজেদের রুমমেটরা যেভাবে পাশে এসে দাড়ায়, তেমনিভাবে হল কর্তৃপক্ষও তাদের সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করবে। হলের যেসব সমস্যা থেকে মেয়েদের শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হয় সেগুলোর ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। আর তাই প্রতিটি হলের মেয়েদের দাবী দুইজন মেয়ে ডাক্তার, দুই জন নার্স, একটি ওষুধের ডিসপেনসারি, খাবারের মান উন্নত করা, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, নিরাপত্তা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা।